জাতীয় পার্টি (জাপা) আবারও গোলমেলে অবস্থায়। একদিকে চেয়ারম্যান জি এম কাদের, অন্যদিকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদ। দুপক্ষই গত জানুয়ারিতে ঐক্যবদ্ধভাবে দল পরিচালনার কথা বললেও হয়নি দৃশ্যমান কোনো উন্নতি। কেউ কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বা যোগাযোগ করছেন না। দুই অংশের দুই শীর্ষ নেতা দলীয় কোনো প্রোগ্রামে অংশও নেননি একসঙ্গে। বাস্তবায়ন হয়নি ঐক্য প্রক্রিয়ার কোনো প্রতিশ্রুতিও। দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি বহিষ্কৃত ও পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাদের। মুখে ঐক্যের কথা বললেও দুজনই ভেতরে জিইয়ে রেখেছেন সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব-বিরোধ। এরই রেশ ধরে রওশন এরশাদ ঘোষিত পুরোনো জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতির কমিটির বৈঠক ডেকেছেন। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে ডাক দিতে পারেন পার্টির জাতীয় সম্মেলন করারও। জিএম কাদেরও বসে নেই। তৃণমূলে জেলার জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন তিনি। সেখানেও রয়েছে তৎপর রওশনপন্থি ও কাদেরপন্থি বলয়। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রের দাবি, রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের দুজনই সমঝোতা চান না। তারা চেয়ারম্যান পদ চান। এ জন্য দুপক্ষই জাতীয় সম্মেলনের জন্য অগ্রসর হচ্ছে। জি এম কাদের তার মতো করে বিভিন্ন জেলা সম্মেলন করছেন, আবারও চেয়ারম্যান হতে চান। তবে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মূলধারার জাতীয় পার্টি এ জেলা সম্মেলন থেকে বিরত আছে। তারা রওশন এরশাদের সিদ্ধান্তে দিকে তাকিয়ে। ফলে রওশন এরশাদ সম্মেলন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পুরোনো জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি আবারও চালু করা হচ্ছে। আজ সোমবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর গুলশান-২ এ কমিটির একটা বৈঠক আছে। ওই বৈঠকে দলের সিনিয়র ও জুনিয়র নেতারা অংশ নেবেন। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দল পরিচালনা হবে।
বৈঠকে থেকে ঘোষণা আসতে পারে— জাতীয় পার্টি এখন পরিচালনা করবে রওশন এরশাদ। দলের নেতৃত্ব দেবেন। রমজানের পরপরই জাতীয় সম্মেলন করার ঘোষণাও আসতে পারে। দেবর-ভাবি, চাচা-ভাতিজার চলছে নীরব দ্বন্দ্ব। পার্টির ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজন ‘জাতীয় সম্মেলন’। এর মাধ্যমে পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান নির্ধারণ করতে হবে। জানা গেছে, এ পদে জি এম কাদেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন রওশন এরশাদ।
জানা যায়, রওশন এরশাদের নেতৃত্বে আসলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ (জেপি), জাতীয় পার্টি থেকে বেরিয়ে যাওয়া দলগুলো পুরোনোয় দলে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেবেন। এরই মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। অনেকে দল মিলে একটা জোট গঠন করার চিন্তা রয়েছে। এবং জোটবদ্ধভাবে ভোটে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ঐক্য প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে কোণঠাসায় জি এম কাদের। ঐক্য প্রক্রিয়ায় কয়েকটি কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মূলত নির্বাচনে এমপি মনোনয়ন ও জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ও জেলার সম্মেলন কমিটি পদ বাণিজ্য কেন্দ্র করে। এরই মধ্যে দুপক্ষের কয়েক নেতা আশ্বাস দিচ্ছে, ইতোমধ্যে কেউ কেউ টাকা হাতিয়েও নিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার মধ্যম সারির দুই নেতা বলেন, রওশন এরশাদ এ বয়সে এসে জাতীয় পার্টির ঐক্য চান। সমঝোতার উভয় পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। নিজেদের মধ্যে ভুল সংশোধন করে পার্টিকে শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিতে হবে। যদি তৃতীয় পক্ষ সমঝোতা করে দেয় তাহলে একটা জাতীয় সম্মেলন হবে। প্রতিষ্ঠাতাকালীন জাতীয় পার্টির নেতা ও এরশাদের অনুসারী তাদের দলে রাখতে চাইছে না জি এম কাদের। বাবা এরশাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তাদের ছেলেমেয়েদেরও নিতে চাইছে না। আরেক সূত্রের দাবি, গত বছর রওশন এরশাদ, জি এম কাদের ও পার্টির মহাসচিব মো. মজিবুল হক চুন্নু মিলে একটা মিটিং করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একত্রে পালন করা হয়। সেখানে ঐক্য প্রক্রিয়া অনেক নেতাকর্মীদের জায়গা হয়নি। ঐক্যবদ্ধভাবে দল পরিচালনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সেদিন মঞ্চে একত্রে উঠেছিলেন তারা। কিন্তু আজও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে? সেদিন রওশন এরশাদের কাছে যারা আশ্রয় চেয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে দলে জায়গা পাননি, দলে যোগ্য সম্মান চেয়েছেন তারা কিন্তু ছিল না। এর পেছনেও অন্যকিছু রয়েছে। এমন প্রশ্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের।
অন্যদিকে, জিএম কাদেরের মামলা এখনো ঝুলে আছে। এর পেছনেও রওশন এরশাদের বলয়ের কারও কারও হাত রয়েছে। কারণ যারা মামলা করেছেন তারা এখনো রওশন এরশাদের সঙ্গে রয়েছেন। জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, প্রত্যাহারের বিষয়ে রওশন এরশাদের সঙ্গে কোনোকিছু হয়নি। কারণ উনি তো মামলা করেনি। কাউকে তো মামলাও করতে বলেননি। তবে গ্রুপ তো যে কেউ করতে পারে। রওশনপন্থি ও জি এম কাদেরপন্থিদের মধ্যেকার ঐক্য প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান ছাপ দেখা যাচ্ছে না। সবাই একত্রে সভা-সমাবেশ-মিটিং করেননি। বিভিন্ন সময়ে যারা পদ থেকে বহিষ্কার-অব্যাহতি পেয়েছে, তাদেরও দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি। শুধু এরশাদপুত্র রাহগীর আলম মাহী সাদ এরশাদকে প্রেসিডিয়াম ও এমপিদের বৈঠক দুই একবার, চেয়ারম্যান কার্যালয়ে কয়েকবার যাতায়াত করতে দেখা গেছে। মহান শহিদ ভাষা দিবস উপলক্ষে বনানী কার্যালয়ে দলীয়ভাবে ও জাতীয় প্রেসক্লাবে পদবঞ্চিত রওশন গ্রুপ পালন করেন। সেখানে রওশর এরশাদের পক্ষ থেকে সাদ এরশাদ যোগ দেন। পরে পার্টির প্রেসিডিয়াম বৈঠকে অংশ নিলেন সাদ এরশাদ। সব মিলিয়ে গোলমেলে জাপা। খুব দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান হবে, এমন কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই। তবে ইফতার রাজনীতিতে নতুন মোড় নিতে পারে। এমনকি রওশন এরশাদের বাসায় জি এম কাদের বা দলের মহাসচিব আর যায়নি। তবে জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্যের দাবি, রওশন এরশাদের বাসায় জি এম কাদের যাওয়া-আসা আগের থেকেও বেশি। ম্যাডাম শারীরিকভাবে অসুস্থ। প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মিটিংয়েও আসার কথা ছিল কিন্তু অসুস্থতার কারণে যোগ দিতে পারেনি। দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, পল্লীবন্ধু এরশাদ ও রওশন এরশাদের অনুসারী বা দলের অসংখ্যক নেতাকর্মীরা বেঁকে বসায় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদের কোণঠাসায় আছেন। তবে রওশন এরশাদ কখনোই চান না জাতীয় পার্টি দুই ভাগ হোক। যদি চাইতেন তাহলে অনেক আগেই তিন-চার টুকরা করতে পারতেন। কাজী জাফর, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ অনেকে দাবি করতেন— আমরা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের খাঁটি সৈনিক। তারা কিন্তু দল ছেড়ে, নতুন দল গঠন করেছে। এখন যারা দলে আছে তাদের কেউ কেউও এক সময় দলে ছেড়েছিলেন। রওশন এরশাদের কখনো দল ভাঙার কোনো প্রক্রিয়া করেননি।
তারা আরও বলেন, পার্টির অভিভাবক হিসেবে তার কাছে কেউ বিচার নিয়ে গেলে সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কাউকে বাদ দেয়া হলে তাকে দলে রাখতে চেষ্টা করেছেন। কারণ যারা পল্লীবন্ধুর সৈনিক, দলের জন্য শ্রম দিয়েছেন, পুরোনো নিবেদিত প্রাণ তাদের নিয়ে দলকে সংগঠিত করতে চেয়েছেন। নতুনরা দলে আসবে, কিন্তু পুরোনো নেতারা যেন বাদ না পড়েন, সে চেষ্টা করছেন। এ জন্য দলের বর্তমান প্রেক্ষাপটকে কেউ কেউ ঐক্য প্রক্রিয়া বা গ্রুপিং বলে আখ্যায়িত করছেন। তবে ম্যাডাম এটাকে কখনো গ্রুপিং বলেননি।
জানতে চাইলে রওশন এরশাদের রাজনৈতিক মুখপাত্র কাজী মামুনুর রশীদ নয়া শতাব্দীকে বলেন, ‘সমঝোতার প্রশ্নে ম্যাডামসহ আমরা সবাই সদয়-সবর্দা পক্ষে। পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অর্থাৎ যারা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন তারাও সমঝোতার পক্ষে। ঐক্য না থাকলে দলের শক্তি থাকে না। এতে মধ্যবর্তী রাজনৈতিক শক্তি যারা আছে তারা এ সুযোগ কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে। সে জন্য রওশন এরশাদ ঐক্য চান, আমরাও ঐক্য চাই। কিন্তু ঐক্য প্রক্রিয়া যেভাবে হওয়ার কথা মাঝখানে কেন জানি এই প্রক্রিয়া থেমে গেছে। এ বিষয়ে রওশন এরশাদ খুবই দ্রুতই একটা সিদ্ধান্ত জানাবেন।’
তিনি আরও বলেন, আমরা যদি জি এম কাদের সাহেবকে ছাড়া কাউন্সিল করতাম তাহলে গত বছরের ৩০ নভেম্বরই করতে পারতাম। যেহেতু সমঝোতার মাধ্যমে জি এম কাদেরকে নিয়েই জাতীয় সম্মেলন করতে চাই, সে জন্য স্থগিত করেছিলাম। সুতরাং আগামীকাল (আজ) মিটিংয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসবে। এবং তৃণমূল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে একটা যৌথসভা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইদুর রহমান টেপা নয়া শতাব্দীকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির ঐক্য প্রক্রিয়া ঠিক আছে। একেবারেই কোনো বিভাজন নেই। দলের মধ্যে এলেই কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এসব রিউমার ছাড়া আর কিছুই না। জাতীয় পার্টি এক এবং অভিন্ন। এতে জিরো পারসেন্টও বিতর্ক নেই।
তিনি বলেন, রওশন এরশাদ পূর্ণ-সমর্থন দিয়েছেন জি এম কাদেরকে। তার স্বার্থে জি এম কাদেরের কোনো দ্বন্দ্বও নেই। কে কি বলল, কে কি করল এটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে দলে বহিষ্কৃত নেতাদের ফেরানোর ব্যাপারে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।







