২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা দিবস। বাঙালি জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অবিস্মরণীয় একটি দিন। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনে বছরের পর বছর শাসন-শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে বাঙালি জাতিকে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বহু লড়াই, সংগ্রাম আর অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে পূর্ব বাংলার মানুষকে। সমগ্র জাতি যখন মুক্তির দিশায় বিভোর, তখন স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে আসেন এক মহানায়ক।
যিনি পরাধীন বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের মহান নেতা, যার তর্জনীর হুঙ্কারে অর্জিত হয়েছে এই মহান স্বাধীনতা। তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
স্বাধীন বাংলায় লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেশকে সোনার বাংলার রূপান্তর করতে ক্রীড়াঙ্গনে স্বর্ণোজ্জ্বল অবদান রয়েছে বঙ্গবন্ধুর।
মহান স্বাধীনতা দিবসে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্রীড়াঙ্গনে বর্ণাঢ্য পদচারণা নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকের জন্য আজকের এ আয়োজন।
গণমানুষের রাজনীতির বাইরে পরিপূর্ণ একজন ক্রীড়ামনস্ক মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির মহান নেতা হয়ে ওঠার আগে তিনি ছিলেন পারদর্শী ফুটবলার। রাজনীতিবিদের আড়ালে জাতির পিতার খেলোয়াড়ি পরিচয়টা বড় না হলেও তিনি যে ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ ছিলেন, সেটি একরকম স্বীকৃত।
১৯৩৭ সালে নিজ উদ্যোগে গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে ফুটবল ও ভলিবল দল গঠন করেন বঙ্গবন্ধু। এরপর নিয়মিত দুটি খেলাতেই অংশগ্রহণ করতেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে কলকাতায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় অ্যারিয়ান্স ও মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে খেলার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে আসায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল তার।
এরপর ১৯৪০ সালের গোড়ার দিকে যুবক বয়সে ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের হয়ে ফুটবলের মাঠ মাতিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এই ক্লাবে ১৯৪১-৪৮ সাল পর্যন্ত একটানা আট বছর ফুটবল খেলেছেন তিনি। ১৯৪৩-৪৪ সালে তার নেতৃত্বে বগুড়ায় একটি গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ওয়ান্ডারার্স। এ ম্যাচে একাই পাঁচ গোল করে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন জাতির পিতা।
বঙ্গবন্ধুর কারণেই ‘স্বাধীন বাংলা’ ফুটবল দল গঠিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ ফুটবল দলের ভূমিকা আজও চিরস্মরণীয়।
১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। এ খেলায় মুজিবনগর একাদশ ও প্রেসিডেন্ট একাদশ অংশ নেয়। দেশ স্বাধীনের পর প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ম্যাচটি উপভোগ করেন।
১৯৭২ সালে কলকাতার মোহনবাগান দল এবং ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিন্সক ডায়নামো ক্লাব ঢাকায় খেলতে এলে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবলকে বিশ্ব কাতারে নিয়ে যেতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুধু ফুটবলই নয়, দেশের অন্যান্য খেলার প্রতিও তিনি বেশ সচেতন ছিলেন। এজন্য একই বছরে তার উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড’ গঠিত হয়। যার বর্তমান রূপ ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’।
এরপর ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার বর্তমান নাম ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ’। এটি দেশের ৫৩টি ভিন্ন ভিন্ন খেলাধুলা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে। এসবের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
দেশের ক্রীড়া সংস্থাকে এগিয়ে নিতে ১৯৭৪ সালে ‘বাংলাদেশ স্পোটর্স কাউন্সিল অ্যাক্ট’ পাশ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমনকি ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চায় বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। এটির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয় ১৯৭৫ সালের ৬ আগস্ট।
বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যে সাফল্য, তার পেছনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেননা, দেশ স্বাধীনের পর থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে নতুন রূপরেখা দিতে তার বর্ণাঢ্য পদচারণা কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।








