রকার পতন’ ও ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’ এই দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপিসহ সমমনা দল ও জোট। চার মাস একসঙ্গে চলে আন্দোলনে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারলেও ঝুলে আছে যুগপতের নানা হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে জাতীয় সরকার ইস্যুতে দোটানায় বিএনপি ও সমমনা শরিকরা।
সরকার পতনের আগেই জাতীয় সরকারের সুরাহা চায় শরিকরা। কেউ কেউ চায় নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার। আবার কোনো কোনো দলের অবস্থান এর বিপরীতে। অথচ এই ইস্যুতে অনেকটাই চুপ বিএনপি। আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরেও রয়েছে নানা হিসাব।
এমতাবস্থায় বিএনপি দেখতে চাইছে যুগপৎ আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত কারা তাদের সঙ্গে থাকছে। ফলে বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও আস্থার সংকটের কারণে যুগপৎ আন্দোলনে শরিকরা একমতে পৌঁছাতে পারছে না। আর সরকারবিরোধী আন্দোলনেও গতি পাচ্ছে না, ঝিমিয়ে পড়ছে নেতাকর্মীরা।
এদিকে, বিএনপি আগেই বলেছে, নির্বাচনের পর সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করতে চায়। চলমান আন্দোলন কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে। পুলিশি হয়রানিও দিন দিন বাড়ছে। জামিন থাকার পরও নেতাকর্মীদের বাড়িতে হানা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। পদ-পদবির বাইরে থাকা নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে চাচ্ছে না। সব মিলিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও যুগপৎ আন্দোলন ইস্যুতে দেখা দিয়েছে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব।
জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটি নিয়েও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা শঙ্কা। দলীয় পদ বা মনোনয়ন বঞ্চিতদের একটি অংশ যোগ দিয়ে দলে ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে। তাই আলাদা প্ল্যাটফর্ম ইনসাফ নিয়েও তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস-সন্দেহ।
এরই মধ্যে ইনসাফ কমিটির সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিএনপি থেকে ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদকে বহিষ্কার করা হয়। লেবার পার্টিকেও ১২ দলীয় জোট ছাড়তে বাধ্য হয়। তবে যুগপৎ আন্দোলন শরিক দল ও জোটের অনেক নেতাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না- তৃণমূল নেতাকর্মীদের এই প্রশ্ন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণতন্ত্র মঞ্চের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, কর্মসূচি যাই ঘোষণা করা হোক না কেন? চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে হলে সরকারবিরোধী দলগুলোকে একে অপরের প্রতি আস্থা বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। এখনো আস্থার সংকট রয়েছে, এটা যতদ্রুত সমাধান হবে যুগপৎ আন্দোলনও তত দ্রুত একটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে। কিন্তু চলমান কর্মসূচি দেখে আমার তো মনে হচ্ছে, জাতীয় সরকার ব্যবস্থা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হবে নাকি; নির্বাচনের পর সেই সিদ্ধান্তেই আটকে আছে বিএনপির হাইকমান্ড। দলটির নেতারা যে বৃহৎ ঐক্য গড়ার কথা বলছেন, সেই যুগপৎ আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি-কাঠামো কী হবে তাই চূড়ান্ত করতে পারছে না।
তিনি বলেন, এখন আন্দোলনকে চূড়ান্ত পথে নিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। কিন্তু বিএনপি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ইফতার রাজনীতিতে। দলগুলোকে এখনো এক জায়গায় নিয়ে আসতে পারছেন না বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। বরং দলটির ভেতরেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলছে। দলের নেতারা আগামী নির্বাচন ও আন্দোলন ইস্যুতে আস্থা সংকটে ভুগছে বলে রাজনীতির মাঠে গুঞ্জন রয়েছে।
তার ভাষ্যমতে, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। তাই যুগপৎ আন্দোলনকে চূড়ান্ত পথে টেনে নিতে বিএনপিকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। আন্দোলন ইস্যুতে কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমি মনে করি, প্রত্যেকটি দল ও জোটের আলাদা স্বতন্ত্র অক্ষুণ্ন রেখেই কমন ইস্যুতে একটা যুগপৎ ও সমন্বিত ধারায় আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।
বিএনপির সূত্রমতে, যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর মাঠের কর্মসূচিতে নজরদারি করবে বিএনপি। নির্বাচন সামনে রেখে নানা মেরুকরণ মোকাবিলায় সর্তকভাবে এগোতে চাইছে বিএনপির হাইকমান্ড। আগামী ১ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মহানগর, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে গৃহীত মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি সফল করতে দিক নির্দেশনা দিয়েছে দলে হাইকমান্ড।
আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত নানা খাতে সরকারের দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়ম তুলে সারা দেশে ৩৭টি মতবিনিময় সভা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেইসঙ্গে ৮২ সাংগঠনিক জেলা, ৬ শতাধিক থানা-উপজেলায় অবস্থান, মানববন্ধন ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো হলো— লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), সাত দলীয় জোট— গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, বাম গণতান্ত্রিক ঐক্য, গণফোরামের একাংশসহ শরিক দলগুলো নিজ নিজ ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে আসছে। এর মধ্যে লেবার পার্টি জোট থেকে বের হয়ে এখন আলাদা ভাবে কর্মসূচি পালন করছে।
প্রথমদিকে বিএনপির যুগপৎ কর্মসূচিতে মাঠে ছিল জামায়াত। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিল কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর মৌচাকে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ ও জামায়াতের কয়েকজন আহত হন। গ্রেফতার করা হয় দলটির কয়েকজন কর্মীকে।
ওই ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেয়া বা খোঁজখবর না নেয়ায় জামায়াত মনোক্ষুণ্ন হয়। নতুন করে ভাবতে শুরু করে জামায়াত। পরবর্তীতে যুগপৎ আর কোনো কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেয়নি দলটি। এসব কারণে বিএনপির সঙ্গে জোট শরিকদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে।
যদিও বিএনপি নেতারা বলছেন, তাদের ভাবনায় এখন শুধু যুগপৎ আন্দোলন। তাই রাজনৈতিক জোট গঠনের চেয়ে যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে তারা। এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এখনো চূড়ান্ত কিছুই হয়নি। সার্বিক বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একে অপরের সঙ্গে আরও আলোচনা করতে হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, চূড়ান্তভাবে যুগপৎ আন্দোলন যেতে একটু সময় লাগছে। কারণ, অনেক অভিন্ন ইস্যুকে এক ইস্যুতে রূপান্তর করতে হলে কিছুটা সময় নিয়েই বিভিন্ন দল ও জোটগুলোর সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে। এরপরে আন্দোলনের ধরন-কৌশল কেমন হবে এ সব প্রস্তুতি নিতেও সময় লাগবে।
১২ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, আন্দোলনকে কীভাবে আরও গতিশীল করা যায়, তা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। যাতে করে একটি স্থির সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হওয়া সহজ হয়।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এ মুহূর্তে কর্মসূচিতে যেসব রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করে মাঠে নেমেছে তারাই যুগপৎ আন্দোলনে থাকবে।







