বগুড়ার গাবতলি উপজেলার ডাকুমারা হাটের ইজারায় অনিয়মের ঘটনায় তৎকালীন ইউএনও আব্দুল ওয়ারেছ আনসারীর দুই বছর বেতন না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি জনপ্রশাসন সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দীন চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এই লঘুদন্ডের তথ্য জানা গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার প্রাক্তন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বর্তমানে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের উপপরিচালক, (সিনিয়র সহকারী সচিব) আব্দুল ওয়ারেছ আনসারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার, গাবতলী, বগুড়া হিসেবে কর্মরত থাকাকালে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন হাট-বাজারের বাংলা ১৪২৬ সনের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ডাকুমারা হাটের ইজারা দিতে ৪ টি দরপত্র দাখিল করেন। ইজারায় সর্বোচ্চ ডাককারী মো: আহসান হাবিব সেলিম এর দর এক কোটি চুরাশি লক্ষ নব্বই হাজার টাকা সর্বোচ্চ হওয়ায় তাকে অবশিষ্ট টাকা জমা প্রদানের জন্য পত্র দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইজারামূল্য পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করায় তার ইজারা বাতিলপূর্বক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা মো: আব্দুল মতিন সরকার এর দাখিলকৃত এক কোটি ষাট লক্ষ পঞ্চাশ হাজার একশত টাকার দর গ্রহণ না করে চতুর্থ পর্যায়ে দরপত্র আহবান করে পুনরায় একই ব্যক্তি মো: আহসান হাবিব সেলিম-এর অনুকূলে এক কোটি চুরাশি লক্ষ নব্বই হাজার টাকার স্থলে একানব্বই লক্ষ এগার হাজার একশত এগার টাকায় ইজারা প্রদান করা হয। ডাকুমারা হাটের জন্য সবোর্চ্চ দরদাতা মো: আহসান হাবিব সেলিম তার দাখিলকৃত উদ্ধৃত দরের টাকা যথাসময়ে জমা প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারি হাট-বাজার ইজারা নীতিমালা, ২০১১ অনুযায়ী উদ্ধৃত দরের ৩০% জামানত পঞ্চান্ন লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫% জামানত নয় লক্ষ চব্বিশ হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করে সরকারের ছয়চল্লিশ লক্ষ এক হাজার পাঁচ শত টাকার রাজস্ব ক্ষতিসাধন করার অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধি অনুযায়ী যথাক্রমে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ এর অভিযোগ আনয়ন করে একই বিধিমালার বিধি ৪(৩)(ঘ) অনুযায়ী কেন তাঁকে চাকুরি হতে বরখাস্ত করা হবে না বা অন্য কোন উপযুক্ত দন্ড প্রদান করা হবে না এ মর্মে উক্ত বিধিমালার বিধি ৭(১)(খ) মোতাবেক প্রাপ্তির ১০ (দশ) কার্য দিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য বলা হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি ব্যক্তিগত শুনানি চান কিনা তাও তাঁর লিখিত জবাবে উল্লেখ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়।
বিভাগীয় মামলার অভিযোগ ও সার্বিক বিষয় পর্যালোচনাপূর্বক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৭ (২) (ঘ) বিধি অনুযায়ী মামলাটি তদন্ত করার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা গত বছরের ২ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনাপূর্বক পুন:তদন্ত প্রয়োজন মর্মে প্রতীয়মান হওয়ায় গত বছরের ২৬ অক্টোবর মামলাটি পুন:তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি পুন:তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে, উল্লিখিত ৯৩ লক্ষ ৭৮ হাজার ৮৮৯ টাকা রাজস্ব ক্ষতি সাধনের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি তবে ডাকুমারা হাটের ১ম পর্যায়ে ইজারা ডাকে সর্বোচ্চ দরদাতা জনাব মো: আহসান হাবীব সেলিম এর দরপত্র বাতিল করে জামানত হিসেবে জমাকৃত ৩০% অর্থের মধ্যে ৫% অর্থ বাজেয়াপ্ত করে ২৫% অর্থ ইজারা ডাককারীকে ফেরত দিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা কর্তব্য কাজে অবহেলা ও সরকারের ৪৬ লক্ষ ১ হাজার ৫০০ টাকা রাজস্ব ক্ষতি করেছেন।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলা ১৪২৬ সনের গাবতলী উপজেলার হাট-বাজার ইজারার দরপত্র মূল্যায়ণ কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে “স্থানীয় সরকার বিভাগের ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রি. তারিখের ৪৬.০৪১.০৩০.০২.২০২১.৮৭০ নং স্মারকে জারীকৃত সরকারি হাট-বাজার সমূহের ব্যবস্থাপনা, ইজারা পদ্ধতি এবং উহা হইতে প্রাপ্ত আয় বন্টন সম্পর্কিত নীতিমালা, ২০১১ অনুযায়ী তার দরপত্রটি বাতিল করে দাখিলকৃত ইজারা মূল্যের অর্থ বাজেয়াপ্ত করে হাট-বাজার দরপত্র মূল্যায়ণ ও ইজারা প্রদান কমিটি ০৪.০৪.২০১৯ তারিখের পূর্বের ইজারা বাতিল পূর্বক ২৭.০১.২০১৯ তারিখে প্রকাশিত ইজারা বিজ্ঞপ্তি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পুনরায় ইজারা দরপত্র আহব্বান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু ফাইল নোট অনুযায়ী মো: আব্দুল ওয়ারেছ আনসারী একক সিদ্ধান্তে ৩০% জামানতের পরিবর্তে ৫% জামানত বাজেয়াপ্ত করেন সর্বোপরি তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর মতামতে উল্লেখ করেছেন যে সরকার পক্ষে গৃহীত ০৫ (পাঁচ) জন সাক্ষীর জবানবন্দী, অভিযুক্ত কর্মকর্তাসহ তাঁর পক্ষে অন্য দুই জন সাক্ষীসহ মোট ০৩ (তিন) জনের জবানবন্দী, পুন:তদন্তকালে অভিযুক্ত কর্মকর্তার দাখিলকৃত নিখিত জবাব, সমুদয় কাগজপত্র ও এ সংক্রান্ত বিধি-বিধান পর্যালোচনায় মোঃ আব্দুল ওয়ারেছ আনসারী এর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙখলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(ঘ) মোতাবেক আনীত ‘দুর্নীতি পরায়ণতার’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তবে একই বিধিমালার বিধি ৩(খ) মোতাবেক আনীত ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
সেহেতু বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে অসদাচরণ এর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে একই বিধিমালার ৪(২)(খ) বিধি অনুযায়ী তাঁর ‘বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ০২ (দুই) বৎসরের জন্য স্থগিত রাখার লঘুদণ্ড প্রদান করা হলো। তিনি ০২ (দুই) বৎসরের বর্ধিত বেতন কখনও প্রাপ্য হবেন না, ০২ (দুই) বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তৃতীয় বৎসর হতে তিনি বর্ধিত বেতন প্রাপ্য হবেন মর্মে নির্দেশ প্রদান করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।







