ঢাকা, ৩ মে, ২০২৩
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী নাগরিক আন্দোলনে তরুণদের নেতৃত্ব দিতে হবে
আজ ৩ মে (২০২৩), বুধবার, বিকেল সাড়ে ৩টায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে শহীদজননী জাহানারা ইমামের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘জাহানারা ইমামের আন্দোলন: তরুণদের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার।
উক্ত আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ব্লগার লেখক মারুফ রসূল এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর।
উক্ত আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য প্রদান করবেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক শহীদসন্তান অধ্যাপক ডাঃ নুজহাত চৌধুরী, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাদিয়া চৌধুরী, ঘাসফুল শিশু কিশোর সংগঠনের সভাপতি সমাজকর্মী হাসান আব্দুল্লাহ বিপ্লব এবং অনলাইন বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর সহকারী সম্পাদক লেখক সাংবাদিক সুশীল মালাকার।
সভার প্রারম্ভিক বক্তব্যে নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘৩১ বছর আগে শহীদজননী জাহানারা ইমাম ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের যে নাগরিক আন্দোলনের সূচনা করেছেন বহু ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করে তা আজ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলেও আমাদের আরও দীর্ঘ, কঠিন ও বিপদসঙ্কুল পথ অতিক্রম করতে হবে। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার যেভাবে সমাজ ও রাজনীতিকে গ্রাস করেছে সেখান থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে এগিয়ে আসতে হবে তরুণ প্রজন্মকে, যেভাবে তরুণরা অংশগ্রহণ করেছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে।’
তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ জামায়াত সমর্থিত খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের যাবতীয় হুমকি ও বাধা অগ্রাহ্য করে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের জন্য আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে যে গণআদালত করেছিলামÑ অংশগ্রহণকারী নব্বুই ভাগ ছিল তরুণ। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে শাহবাগে তরুণদের নেতৃত্বেই যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে ঘটেছিল ছাত্র-জনতার মহাঅভ্যুত্থান। এখনও তরুণরাই এই আন্দোলনের প্রধান শক্তি।’
শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘১৯৭৫-এর পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা মুছে ফেলে বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতো ধর্মের নামে রাজনীতি চালু করেছে, যার ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আমরা দেখেছি কীভাবে জঙ্গি মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। সমাজ ও রাজনীতির মৌলবাদীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ যেভাবে ঘটেছে, যেভাবে মানুষের মনোজগতে এর আধিপত্য বিস্তৃত হচ্ছে- এর বিরুদ্ধে লড়তে হলে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সূচিত নাগরিক আন্দোলনের কোনও বিকল্প নেই।’
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদজননী জাহানারা ইমামের ত্যাগ দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ উদাহরণ। ১৯৭১ সালে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং বেশ কিছু সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানিদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। জাহানারা ইমাম ছিলেন ব্যক্তিত্বময়ী। আবার একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে মানুষের মনোজগতে তিনি ঠাঁই করে নিয়েছেন। তিনি একাধারে শহীদজননী, লেখিকা, শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনের নেত্রী। সংসার জীবন এবং লেখক জীবনের পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কলাম লিখতেন দৈনিক বাংলায়। তার একাত্তরের দিনগুলি শুধুই স্মৃতিচারণা নয়, ইতিহাসের অসামান্য দলিল। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মানুষ পাকিস্তানিদের মাধ্যমে যে নিপীড়নের স্বীকার হয়েছেন তার হৃদয়গ্রাহী বয়ান। বাংলাদেশের নাগরিক আন্দোলনেও তার অবদান অনস্বীকার্য। এই আন্দোলনে তরুণদের সম্পৃক্ততা ছিল। আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মানেও তরুণদের ভূমিকা অনেক। তারাই দেশ ও জাতিকে পথ দেখাবে।
আলোচনা সভার প্রধান বক্তা গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ব্লগার লেখক মারুফ রসূল শহীদজননী জাহানারা ইমামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘ইউটিউবে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাসের একটি চ্যানেল করা হলো। সেখানে সেক্টরভিত্তিক ইতিহাসের দলিল-প্রমাণাদিসহ উপস্থাপনা করা হলো; কিন্তু তার ভিউ কম। এটা কি প্রমাণ করে যে, এ ইতিহাসের কোনো মূল্য নেই? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিনকে দিন আমাদের সেদিকে ধাবিত করছে। আমরা এখন ফলোয়ারের চক্করে পড়ে মূল তথ্য থেকে সরে আসছি। এই রোগে দেশের মূলধারার গণমাধ্যমও আক্রান্ত হয়েছে। সবার আগে সংবাদÑএমন নীতি তো আগেও ছিল; কিন্তু এখন সংবাদ দিলেই হয় না, তাকে ভাইরাল করতে হয়। এই ভাইরাল করতে গিয়ে ভুল সংবাদও প্রচারিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে রিউমার স্ক্যানারের জরিপ অনুযায়ী, দেশের মূলধারার গণমাধ্যম কী পরিমাণ ভুল সংবাদ প্রচার করে, সেটা উঠে এসেছে।’
নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘তরুণদের নিয়ে আমি অনেক আশাবাদী। তারা একদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবে। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পেছনে তাদের অনেক অবদান ছিল। এখনো এই প্রযুক্তি বিশ্বে তারা নিজেদের মত করে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা আমাদের বাংলাদেশ, দেশটা আমাদের মত করে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গঠন করব।’
শহীদজননী জাহানারা ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মূল কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক শহীদসন্তান অধ্যাপক ডাঃ নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘তরুণদের প্রতি জাহানারা ইমামের ভরসা ছিল। ১৯৯২ সালে তরুণদের যেমন অংশগ্রহণ ছিল, তেমনি ২০১৩ সালেও আমরা দেখি তরুণদেরকে। তাদেরকে মা এবং মাটির কাছে নিয়ে যেতে হবে। অনলাইনেও একদল তরুণকে যুদ্ধ করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হয়ে। কারণ প্রতিক্রিয়াশীলরা সংগঠিত। তরুণদের হাত ধরেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।’
নির্মূল কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাদিয়া চৌধুরী বলেন, ‘জাহানারা ইমাম যেমনটা রুমির আলমারিতে বিস্ফোরক পেয়ে ভয় পেয়েছিলেন, সেভাবে আমরাও অবাক হয়ে ভয়ে ভয়ে দেখছি আপনারা আপনাদের আলমারিতে সেভাবে বিস্ফোরণ জমিয়ে রাখছেন কিন্তু রুমির মতো আমরাও বলছি, “ভয় পাওয়ার সময় পার হয়ে গেছে, মা, এখন আর পিছন ফেরার সুযোগ নেই। সকল যুদ্ধাপরাধী, নব্য আলবদর, জামাতকে বিচারের আওতায় আনা হবে। আমাদের বাঙালিত্ব নিয়ে বাঙালিরা, নারীরা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আমরা সবাই আবারো স্বাধীন হয়ে বাঁচতে পারবো। এভাবেই আমরা শহীদজননী জাহানারা ইমামের লিগেসিকে সম্মান জানাতে কাজ করব, তার জন্মবার্ষিকীতে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।’
ঘাসফুল শিশু কিশোর সংগঠনের সভাপতি সমাজকর্মী হাসান আব্দুল্লাহ বিপ্লব বলেন, ‘ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদজননী জাহানারা ইমাম যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তার প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় এখনো আসেনি। এখনও যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীর বিচার হয়নি। রাজাকার, আলবদর, আলশামস-এর মতো ঘাতক বাহিনীর বিচার হয়নি। পাকিস্তানি জেনারেলদেরও বিচার হয়নি। স্বাধীনতাবিরোধী গণহত্যাকারী ও মৌলবাদীদের দল এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়। স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনৈতিক ও আদশর্গত ভাবে পরাজিত করার মাধ্যমেই আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে।’
অনলাইন বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর সহকারী সম্পাদক লেখক সাংবাদিক সুশীল মালাকার বলেন, ‘যারা একটি মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে, জাহানারা ইমাম ছিলেন তাদের অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের জন্য তিনি অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য যে নাগরিক আন্দোলনের সূত্রপাত তিনি ঘটিয়েছিলেন তা এখনো চলমান। এই দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মকে নিজ কাঁধে তুলে নিতে হবে। তরুণরা এ দেশের প্রাণ। লালন, হাছন, ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া, জারী, সারী গানের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।’
দিনের অনুষ্ঠানসূচি শুরু হয় সকাল ৮টায় মিরপুরে শহীদজননী জাহানারা ইমামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে।







