শে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ছে না তবুও। বরং কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই রাজধানীজুড়ে ফুটপাতের ওপর গ্যাস সিলিন্ডার রেখে হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবার রান্না করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশেষ করে বিকেলে পুরি, সিঙ্গারা, ছমুচা, মোগলাইসহ বিভিন্ন পণ্য ফুটপাতে সিলিন্ডার রেখে ভাজাটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরজমিন রাজধানীজুড়েই দেখা গেছে এমন চিত্র। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সিলিন্ডারের পাশেই রাখা হচ্ছে গ্যাসের চুলা।
এ কারণে বিস্ফোরণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। যে কোনো সময়েই ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এতে যেমন ঝুঁকিতে রয়েছে দোকানি, কারিগর তেমনি ফুটপাতে চলাচলকারী সাধারণ নাগরিকরা। এক একটা গ্যাস সিলিন্ডার যেন এক একটা মৃত্যুকূপ। আর দিনের আলোতেও এসব চোখে দেখেন না সংশ্লিষ্টরা। ব্যবস্থা নেয়া তো দূরে থাক নেই ন্যূনতম সচেতনা সৃষ্টিরও প্রয়াস। চোখ থাকতে অন্ধ সবাই!
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, আদাবর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, আজিমপুর, পুরান ঢাকাসহ রাজধানীজুড়েই সরজমিন ঘুরে মিলেছে এমন চিত্র। রাস্তার ওপর ফুটপাতে রাখা এসব সিলিন্ডারের কয়েক ডজন ছবি রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।
জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর এলএফসি রেস্টুরেন্টের মালিক নয়া শতাব্দীকে বলেন, এ ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা আমাদের এখানে কখনো ঘটেনি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই কাজ করছি। এতে তো অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে— যদি আগুন লেগে যায় তাহলে আপনাদের অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না আমাদের আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। এর আগে কেউ বলেনি। তবে কথা দিচ্ছি- এভাবে আর সিলিন্ডার-চুলা কাছাকাছি রাখব না। চুলা থেকে সিলিন্ডার দূরে সরিয়ে রাখব।
মো. মহসিন নামের আরেক দোকানি বলেন, এখনো আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। সাব্বির নামের আরেক দোকানি বলেন, এখনো এ বিষয়ে কেউ কিছু বলেনি। তাছাড়া আমরা ওভাবে ভেবেও দেখিনি। রায়ের বাজারের সাদেক খান সড়কে দেখা যায়, ভাই ভাই হোটেল নামের এক দোকানের চুলা থেকে সিলিন্ডার এক ফুটেরও কম দূরত্বে রেখে সিঙারা ভাজছেন এক ব্যক্তি। নিজেকে দোকানের কর্মচারী পরিচয় দেন তিনি।
পরে ক্যাশ কাউন্টারে বসা সাব্বির নামের একজন নয়া শতাব্দীকে বলেন, আসলে আমি মালিক না। আমি এখানে চাকরি করি। ফুটপাতে সিলিন্ডার ও চুলা রাখার বিষয়ে মালিক বলতে পারবে। তিনিও জানান, তাদের হোটেলেও অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে কোনো দোকানেই অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি। পথচারীরা দুষছেন ফায়ার সার্ভিসকে।
তারা বলছেন, আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে পানি ঢেলে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে কিন্তু আগুন লাগার আগে যদি এসব বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়, এসব দোকানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু এ কাজটা কেউই করছে না। যে কারণে অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই ফুটপাতে সন্তানদের নিয়ে চলতে হচ্ছে।
এছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেও এসব হোটেলের সামনে সিলিন্ডার রেখে বিভিন্ন পণ্য ভাজতে দেখা যায়। ফলে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুলগামী শিশুরাও। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ৮১৮টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন। আহত হয়েছেন ৬৯ জন। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি টাকার ওপরে।
এরপর ২০২০ সালে এ দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫৭টিতে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন। আহত হয়েছেন ১০৭ জন। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। ২০২১ সালে দেশে ৮৯৪টি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে সারা দেশে মোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২৪ হাজার ১০২টি। এর মধ্যে বিস্ফোরণ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ৯৪টি, গ্যাস সরবরাহ লাইনে আগুন লেগেছে ৭৯৫টি। গ্যাস সিলিন্ডারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩০ জন আহত এবং ১ জন মারা গেছেন। তবে বাস্তব চিত্র এর থেকে অনেক বেশি বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
কারণ এসব অগ্নিকাণ্ডের অনেকেই স্থানীয়রা নির্বাপণ করেন। বড় ধরনের ঘটনা না ঘটলে ফায়ার সার্ভিসকে কল করা হয় না। আর যেসব অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসকে ডাকা হয় না সেসব ঘটনা ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে নেই। গড় হিসেবে দেখা যায়, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও একাধিক সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দুর্ঘটনাগুলো মূলত গ্যাসের লিকেজ থেকে ঘটে। সিলিন্ডারের হোস পাইপ, রেগুলেটর, গ্যাস ভালভের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে গ্যাস লিক হয়। এরপর ঘটে বিস্ফোরণের ঘটনা। এছাড়াও অনেকে চুলার পাশে গ্যাস সিলিন্ডার রাখায় অতিরিক্ত তাপে সিলিন্ডার গরম হয়েও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন নয়া শতাব্দীকে বলেন, এটা তো অবশ্যই মারাত্মক ঝুঁকির। এর ফলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যেমন ঝুঁকিতে রয়েছে, সেই সঙ্গে ঝুঁকিতে রয়েছে ফুটপাতে চলাচলকারী নগরবাসী।
এক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের কিছু করণীয় রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এটি তো করবে যারা নগরের দায়িত্বে রয়েছে। তবে আমরা যখন মহড়া করি তখন আমাদের চোখের সামনে পড়লে আমরা তাদের সতর্ক করি, পরামর্শ দিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে আসলে এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের করার নেই। একের পর এক গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা দুষছেন বিস্ফোরক পরিদফতরকে।
তাদের দাবি, একটি গ্যাস সিলিন্ডার ন্যূনতম ২০ বছর ব্যবহার করার কথা। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে কয়েক দফায় রেগুলেটর ও ভালভ পরিবর্তন করতে হয়। এ দুটি যন্ত্রাংশই মূলত গ্যাস লিকেজ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশের সিলিন্ডারগুলোয় মানহীন রেগুলেটর ও ভালভ ব্যবহারের ফলে লিকেজ সৃষ্টি হয়।
অথচ সিলিন্ডার ও এতে ব্যবহূত যন্ত্রাংশের মান পরীক্ষার দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদফতরের। কিন্তু যথাযথভাবে এসব গ্যাস সিলিন্ডারের মান পরীক্ষা করা হয় না। আর এ সুযোগে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার ও এতে ব্যবহূত যন্ত্রাংশ।
জানা যায়, দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি গ্রাহক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। এ গ্রাহকের একটি বড় অংশই গ্রামাঞ্চলের। এ মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩০টি কোম্পানির অন্তত দুই কোটি সিলিন্ডার বাজারে রয়েছে।
বিস্ফোরক পরিদফতরের তথ্য বলছে, গত এক বছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে ৬ লাখের বেশি। এলপিজি ছাড়া অন্যান্য সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে তিন লাখের বেশি। পাশাপাশি দেশেও সিলিন্ডার নির্মাণের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করেছে দেশে নির্মিত সিলিন্ডার। কিন্তু এসব সিলিন্ডারের মান পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত কোনো পরীক্ষা কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।
নয়া শতাব্দী








