জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্রকারী চক্র দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘কি পয়েন্ট ইন্সটুলেশন’ (কেপিআই)ভুক্ত প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে পারে। সম্প্রতি এ আশঙ্কা প্রকাশ করে সেখানকার নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এ ধরনের আগাম তথ্য পেয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা নড়েচড়ে বসেছে। তারা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশ পেয়ে নিরাপত্তার ছক কষছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনীর সদস্যরা। এমনকি বেশ কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগেও দেশজুড়ে চলা দাবদাহের সময় মফস্বলসহ দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ অফিসে হামলার শঙ্কা করা হয়েছিল। এ কারণে রাজধানীসহ সারা দেশের বিদ্যুৎ অফিসের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি সরকারকে। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই ফের গুপ্ত হামলার শঙ্কা করায় নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ পেয়ে পুলিশের সব ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপাররা বিশেষ বৈঠক করছেন। নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। জানা গেছে, দেশকে চরম অস্থিতিশিল করতে একটি পক্ষ দেশে ও বিদেশে নানা ধরনের চক্রান্ত করছে। এর প্রতিফলনও ঘটছে বহির্বিশ্বের নানা ধরনের তৎপরতায়। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে উজ্জীবিত সরকারবিরোধী পক্ষগুলো। তারাও বিভিন্ন সময় নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে এ থেকে উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় গুপ্ত হামলা চালিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি পদমর্যদার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্প এলাকায় যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সতর্ক রয়েছে। বিশেষ সময়কে সামনে রেখে সুযোগ সন্ধানীরা নাশকতার চেষ্টা করে থাকে। গোয়েন্দা তথ্য আছে, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে উন্নয়ন প্রকল্প বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে ‘টার্গেট’ করতে পারে নাশকতাকারী চক্র। এ কারণে এসব এলাকায় পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি, সিসি ক্যামেরায় নজরদারি এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য বাড়ানো হয়েছে।’ ঊর্ধ্বতন ওই গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, এরই মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট, মোংলা ও পায়রা বন্দরে বাড়ান হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। লোকবলের ঘাটতি সত্ত্বেও বিশেষ নজরদারি অব্যাহত আছে। অপর এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ভবন, দফতর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস ও কয়লা ক্ষেত্র, ইপিজেডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পভুক্ত এলাকায় নিরাপত্তা আগেরচেয়ে বাড়ান হয়েছে। নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানান হয়েছে। তিনি বলেন, কেপিআই এলাকার কোথাও কোথাও বাইরের সাধারণ লোকদের যাতায়াত করার সুযোগ নেই। এসব এলাকায় উন্নয়ন কেন্দ্রের দেশীয় লোকদের পাশাপাশি বিদেশি লোকদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। এ কারণে নিরাপত্তার অজুহাত যেন কেউ তুলতে না পারে- বিষয়টি মাথায় রেখেই অ্যাডভান্স ইনটেলিজেন্সের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। প্রায় ৪শ’ স্থাপনা বিভিন্ন ক্যাটাগরির আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিশেষ নজর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তিনি জানান, নাশকতা করতে পারে এমন অনেকে গোয়েন্দা জালে রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া সমন্বিত গোয়েন্দা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকার নতুন ভিসানীতিতে উজ্জীবিত বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো। এরপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে মিশন নিয়ে চক্রান্ত। বিএনপি নেতাকর্মীদের ধারণা এসব চক্রান্তগুলো তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মসৃণ করবে। এ ধারণা থেকে তারা এখনই ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। ফলে তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। এ থেকে তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বহির্বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাতে পারে। এমনকি দেশে আইনের শাসন নেই বলেও তারা প্রচার চালাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পর তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হলে সেই বিষয়গুলো হাতিয়ার করে নতুন চক্রান্তে মেতে উঠতে পারে।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বহির্বিশ্বে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার কারণে তার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারগুলোতেও। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা ব্যাহত হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে বিএনপি ও জামায়াত নানা ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। দেশে এখন প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিং। যা আগের দুই সপ্তাহের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। তারপরও লোডশেডিংয়ের অজুহাত তোলে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে একটি চক্র। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা। প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়তি পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সঙ্গে থানার ওসিদের নানা দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন জেলার পুলিশ সুপাররা। এমনকি বাড়তি ফোর্সও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। বিদ্যুৎ অফিসের পাশাপাশি ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার বলয় গড়ে তুলতে ডিএমপি কমিশনার ৫০ থানার ওসিদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘বিদ্যুৎসহ যে কোনো সমস্যা নিয়ে কোনো মহল যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সেই জন্য বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। আশা করি বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না। তারপরেও পুলিশ সতর্ক আছে।’
জানা গেছে, তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে দেশের মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। দিনের পর দিন অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক সভায় লোডশেডিংকে পুঁজি করে কেউ যাতে অপ্রীতিকর কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়ে নজর রাখতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনার পর সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, বিদ্যুৎ অফিস, সাবস্টেশনসহ কেপিআই স্থাপনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা কার্যক্রম ও পুলিশি টহল বাড়ান হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা সমিতি বা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও পুলিশকে চিঠি দিয়ে বাড়তি নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও সোনাগাজীতে ক্ষুব্ধ লোকজন বিদ্যুৎ অফিসে চড়াও হয়েছেন। সৈয়দপুরসহ দেশের কয়েকটি স্থানে উত্তেজনা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিভিন্ন অফিস থেকে বিদ্যুৎ অফিসসহ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ প্রশাসনের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। সম্প্র্রতি ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ থেকে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপারকে দেয়া এক চিঠিতে বলা হয়, ময়মনসিংহ জোনে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং লো-ভোল্টেজের কারণে চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সমিতির আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে অসহনীয় লোডশেডিং চলছে। তীব্র গরমে গ্রাহকরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সেচকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক এলাকায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ঘিরে অনাকাক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা বিধানে সার্বিক সহযোগিতার অনুরোধ জানানো হয়।
কেপিআইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সরকারের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সব সময়ই একটু ভিন্ন রকমের থাকে। গুরুত্বপূর্ণ বলেই এ বিষয়ে নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা গোপন রাখা হয়। কেপিআইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখার সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, যে কোনো সময়ের চেয়ে বিরোধী দলের কর্মসূচি উপলক্ষ্যে এবার কেপিআইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিক জোরদার করা হয়। র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারাও কেপিআইয়ের নিরাপত্তা পৃথক সেলের মাধ্যমে তদারক করছে। সূত্র আরও জানায়, সরকারি ব্যবস্থাপনার রেডিও-টেলিভিশন সেন্টার, আণবিক শক্তি কমিশন, ডিএফপি নিয়ন্ত্রণাধীন দফতর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, ওয়াসা, গ্যাস সরবরাহের স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে পুলিশি পাহারার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ান হয়। কূটনীতিকপাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুলিশের পাশাপাশি র্যাবকে।
নয়া শতাব্দী/








