ঢাকা: দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় যতই কমে আসছে ততই বাড়ছে রাজনীতির উত্তাপ। নির্বাচন প্রশ্নে সরকারি দল সংবিধানের বাইরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়। বিপরীতে বিএনপিও নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে আটঘাঁট বেঁধে মাঠে নেমেছে। ইতোমধ্যে সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচি শুরু করে দিয়েছে দলটি, যাতে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে।
এক দফা দাবিতে আগামী বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে বিএনপি। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোও সেদিন পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। অনড় অবস্থান থেকে প্রধান দুই দল সরে না এলে সহিংতার আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। যদিও দুই দলের শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য, তারা কেউ সংঘাত চায় না। দুই দলই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করার কথা বলছে।
আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ ও বিএনপির মহাসমাবেশের মিছিল রাজধানীর প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে। এ অবস্থায় গণপরিবহনের গাড়ি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর সেইসঙ্গে নগরবাসীর চরম ভোগান্তির আশঙ্কাও রয়েছে।
এরপরও দুটি দলের এই কর্মসূচি নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। কী হতে যাচ্ছে রাজধানীতে এই আলোচনা সর্বত্র। এদিকে বিএনপির মহাসমাবেশে জনসমাগম বাড়াতে ব্যাপক তৎপর রয়েছেন দুটি দলের নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখন পর্যন্ত পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও ভবিষ্যতে একই ধারায় চলবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে, বিবদমান দুই রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ততই বাড়বে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা সংলাপের পরামর্শও এসেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নিজ নিজ অবস্থানে অটল রয়েছে।
কী হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার?
বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ নানা দাবিতে অনেকদিন ধরেই কর্মসূচি দিয়ে আসছে বিএনপি। বিএনপির কর্মসূচির দিন পাল্টা কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
পাল্টা কর্মসূচি থেকে সরে আসতে সুশীল সমাজ ও কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে দুই দলের প্রতি আহ্বান জানানো হলেও কেউ তা আমলে নিচ্ছে না। নির্বাচন পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ১২ জুলাই ‘এক দফা’ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা দেয় বিএনপি। সেটির প্রথম কর্মসূচি ছিল ১৮ ও ১৯ জুলাই। এই দুইদিন দেশের সব মহানগর ও জেলা সদরে পদযাত্রা করে বিএনপি ও সমমনা জোটের দলগুলো।
সরকার হটানোর আন্দোলনের যুগপৎ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৭ জুলাই ঢাকায় মহাসমাবেশের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। বিএনপি ছাড়াও যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণফোরাম-পিপলস পার্টি, এলডিপি, লেবারপার্টি, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যসহ বিরোধী বিভিন্ন জোট নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম থেকে একই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। নয়াপল্টনে না পেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করতে চেয়েছে বিএনপি।
সোহরাওয়ার্দীতে বড় জমায়েতের চার দিন পর ফের রাজধানীতে মহাসমাবেশ ডাকার পেছনে বিএনপির উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে আলোচনা চলছে। সেজন্য ঝুঁকি এড়াতে একইদিন পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। ওইদিন একই সময়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ-পশ্চিম গেটে কর্মসূচি পালন করবে সরকারদলীয় তিন সংগঠন। ফলে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে সংঘাতের আশঙ্কা। সবারই প্রশ্ন- কী হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার?
একই দিন সমাবেশ করবে ইসলামী আন্দোলনও
বৃহস্পতিবার ঢাকায় একইদিন সমাবেশের ডাক দিল চরমোনাই পিরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও।
ওইদিন দুপুর আড়াইটায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এ সমাবেশ হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া উপকমিটির সহকারী সমন্বয়কারী শহীদুল ইসলাম কবির যুগান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমের বক্তব্য প্রদানকালে পুলিশের বাধা ও অসৌজ্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ, ব্যর্থ নির্বাচন কমিশন বাতিল, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির প্রবর্তন, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে সংসদ ভেঙে দিয়ে জাতীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে এ সমাবেশ হবে। মঙ্গলবার বিকালে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা সভা হয়। সভায় আগামী বৃহস্পতিবার প্রতিবাদ সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যা বলছেন রাজনৈতিক নেতারা
এসব কর্মসূচি ও আন্দোলনে সংঘাতের কোনো আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন বলেন, ‘আগামী দিনে খুব কাছাকাছি সময় নির্বাচন। যে কারণে আমাদের দলের সার্বিক কর্মকাণ্ড বেশি হবে, দেশজুড়ে সিরিজ প্রোগ্রাম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে ঢাকায় আমরা আমাদের মতো নির্ধারিত জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি করব। বিএনপি অনুমতি পেলে তারাও করবে। সেখানে সংঘাতের কারণ দেখি না।’
অভিযোগ করে আফজাল হোসেন বলেন, ‘বিএনপি বেশ কিছুদিন ধরে মাঠের রাজনীতিতে ব্যর্থ হয়ে সংঘাত করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চায়। কিন্তু আমরা সর্বোচ্চ সহনশীল আচরণ করছি এবং করব। আমাদের সাধারণ সম্পাদক স্পষ্ট করে বলেছেন সবাইকে ধৈর্যধারণ করার জন্য।’
এর আগে সোমবার (২৪ জুলাই) বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি দলকে কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘এক দফা দাবিতে ডাকা মহাসমাবেশের দিন রাজধানীতে যুবলীগের সমাবেশের মাধ্যমে সরকার সংঘাত সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তবে কোনো ধরনের সংঘাত হলে এর দায় সরকারকে নিতে হবে।’







