বরগুনা: বড় ভাইয়ের দুটি কিডনি অকেজো। ভাইয়ের কিডনি স্থাপন করার জন্য কিশোর হাসিবকে অপহরণ করে। কথিত এক পল্লী চিকিৎসকের সহয়তায় হাসিবের রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। হাসিবের রক্তের সঙ্গে মিল না থাকায় পল্লী চিকিৎসক ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে হত্যার পরামর্শ প্রদান করা হয়। এমন তথ্য উদঘাটন করতেই প্রধান আসামি নোমান ও পল্লী চিকিৎসক মিজানকে ১০ দিনের রিমান্ডের প্রার্থনা করেছে পাথরঘাটা থানা পুলিশ।
বরগুনার পাথরঘাটায় অপহরণের পর হত্যা করে মুক্তিপণ চাওয়ার ঘটনায় পাথরঘাটা থানা পুলিশ সকল আসামিকেই আটক করেছে। মূলহোতা আবদুল্লাহ আল নোমান ওরফে তানভীর ওরফে শিশু ফকিরসহ আট জনের নামে পাথরঘাটা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করে হত্যার পর লাশ গুম করার অপরাধে নিহত হাসিবের বাবা শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে গতকাল ২৩ অক্টোবর পাথরঘাটা থানায় মামলা দায়ের করে।
মামলার আসামিরা হল পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের গহরপুর গ্রামের মহিউদ্দিন ফরাজির ছেলে এই ঘটনার মাষ্টারমাইন্ড আবদুল্লাহ আল নোমান ওরফে তানভীর ওরফে শিশু ফকির (১৯)। অন্যরা হলেন, চরদুয়ানী ইউনিয়নের দক্ষিণ জ্ঞানপাড়া গ্রামের সালাম কাজীর ছেলে রহিম কাজী (৪৮), চরদুয়ানী ইউনিয়নের হোগলাপাশা গ্রামের ইউনুস মুন্সির ছেলে রহিম মুন্সি (৩৫), বরগুনা সদর ইউনিয়নের পশ্চিম হেউলিবুনিয়া গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে পল্লী চিকিৎসক মিজানুর রহমান (৩৪) হোগলাপাশা গ্রামের আকবর মুন্সির ছেলে ইউনুস মুন্সি (৬৪), নোমানের স্ত্রী তাহিরা (১৯), নোমানের শাশুড়ী রহিমা (৫৫) ও নোমানের স্ত্রীর বোন তানজিলা (২৮)।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাসিবের বাবার দোকান বন্ধ করে দোকানের সামনে দাড়ালে ১নং আসামি আব্দুল্লাহ আল নোমান ওরফে তানভির ওরফে শিশু ফকির হাসিবকে তার সাথে গেলে ১০ হাজার টাকা দিবে বলে ফুঁসলিয়ে অপহরণ করে পাথরঘাটা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডস্থ ইমান আলী সড়কে গোলাম মোস্তফার ভাড়া দেওয়া টিনসেড দোতালা ঘরের মধ্যে নিয়ে যায়। এরপর হাসিব ও মুল হোতা ১নং আসামি রাতে একসাথে খাওয়া দাওয়া করে।
রাত ৯টার দিকে ১নং আসামি পাথরঘাটা পৌর বাজারস্থ মাসুদ ফার্মেসি হতে ৬টি ঘুমের ট্যাবলেট এনে সেভেন আপ কোমল পানির সাথে ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে খাওয়ালে হাসিব কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। ওই দিন রাত ১২টার পর হাসিব ২ বার বমি করে। পরদিন ২১ অক্টোবর ৭টার দিকে ১নং আসামি হাসিবকে পুনরায় ৩টি এ্যালার্জির ট্যাবলেট খাওয়ালে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। ওই সময় নোমান কিডনি নেওয়ার উদ্দেশ্যে হাসিবের শরীরের রক্ত নিয়ে ঘরের মধ্যে আটক রেখে ওই বাসায় ভাড়ায় থাকা বরগুনার হেউলিবুনিয়ার বাসিন্দা পল্লী চিকিৎসক মিজানের কাছে নিয়ে যায়।
রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে রক্তের গ্রুপ মিল না থাকায় নোমানকে বলে এখন যদি হাসিবকে ছেড়ে দাও তাহলে আমাদের বিপদে পড়তে হবে। এ সময় আসামি মিজান নোমানকে বলে ‘বাঁচতে চাইলে হাসিবকে জীবনে শেষ করে দাও’। মিজানের কথিত অনুযায়ী সকাল ১০টার দিকে হাসিবের হাত, পা, প্লাষ্টিকের রশি দিয়ে বেঁধে মুখে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার আগে হাসিবের সাথে থাকা ফোনে সিম ঢুকিয়ে ফোনে ভিডিও ধারন করে হাসিবের চাচা মনিরের ইমোতে তিন লাখ টাকা চেয়ে পাঠায়।
ওই মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়, ওইদিন বিকেলে নোমান পাথরঘাটার নীলিমা পয়েন্ট গিয়ে হাসিবের চাচা মনিরের ফোনে কল দিয়ে আবারও তিন লাখ টাকা চায়। এ সময় হাসিবের অসুস্থতার কথা বলে নোমান বিকাশ নম্বর দিলে ওই নম্বরে মনির ৪ হাজার টাকা পাঠায়। তিন লাখ টাকা না দেয়ায় ২২ অক্টোবর সকাল ৭ টার দিকে হাসিবের শরীরে ন্যাপথলিন গুঁড়া দিয়ে কাথা দিয়ে পেঁচিয়ে লাল রং এর বোরখা পড়ে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে অপরিচিত অটোরিকশা যোগে হোগলাপাশা নোমানের শশুরবাড়ি নিয়ে কুঠারকুটের মধ্যে রাখে।
ওইখান থেকে কয়েকঘণ্টা পর বিকেল চারটার দিকে শশুরবাড়ির লোকজনের সহযোগিতায় ইজিবাইকে করে কাকচিড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বাইনচটকি এলাকার নিভৃতে বেড়িবাঁধ এলাকায় ২ নম্বর আসামি আ. রহিম কাজীর সহায়তায় মাটি পুঁতে রাখে।
এদিকে সোমবার আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ২ জনের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ।
পাথরঘাটা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ্ আলম হাওলাদার বলেন, এটি এখন চাঞ্চল্যকর ঘটনা। আমরা সে হিসেব করেই গুরুত্ব দিয়ে সার্বিক দিক তদন্ত করছি। এ ঘটনায় ৮ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমান ও পল্লী চিকিৎসক মিজানুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।








