আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। (সূরা মুজাদালাহ-১১)
হাদীস শরীফে এসেছে,
হযরত মুয়াবিয়া (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা যার জন্য বিশেষ কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দ্বীনী জ্ঞান অর্জন ও বুঝার তাওফীক দান করেন। (বোখারী শরীফ হাদীস নং ৭৩১২)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان الانبياء لم يورثوا درهما ولا دينارا وانما ورثوا العلم
নিশ্চয় নবীগণ মীরাস হিসেবে কোন দীনার বা দিরহাম রেখে যান না বরং তারা মীরাস হিসেবে রেখে যান ইলম। (বোখারী)
উপরোক্ত কুরআন হাদীসের বাণী গুলো প্রমাণ করে যে,দক্ষিণ চট্টগ্রামের সিংহ পুরুষ, ইলমে দ্বীনের জগতের নীরব সাধক,সুন্নী রণাঙ্গনের সীপাহসালার, বাতিলের আতংক, দ্বীনি শিক্ষা প্রসারে নির্ভীক নিরলস ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব, হাল জমানার সুফী, আলা হযরত আহমদ রেযা খান ফাজেলে বেরেলভী অকৃত্রিম প্রেমিক ও খলীফা, আলা হযরত গবেষক, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক, উস্তাজুল ওলামা ওয়াল ফোকাহা, মিল্লাত মাজহারের নির্ভরযোগ্য রাহবার, প্রখর মেধার অধিকারী সর্বজন প্রিয় প্রথম সারির গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব মোহাদ্দিসদের অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আমিনুর রহমান (রহ) এর ব্যপারে শতভাগ প্রমাণিত হয়েছিলেন। তিনি অর্থ- মেধা, যেগ্যতা সবদিক দিয়ে পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও দুনিয়াবী মায়া ত্যাগ করে দ্বীন ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কাজকে নিজের জীবন জন্য পাথেয় করে নিয়েছিলেন।
ব্যক্তি জীবনে তিনি যে প্রখর মেধার অধকারী ছিলেন, সে মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলন বাংলার অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বেশ সুনাম ও কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানে চাকুরীজীবন শুরু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ইলমে দ্বীনের প্রসারে মাদরাসাকে তার কর্মের স্থান হিসেবে বেছে নেন। তিনি চাইলে গ্রামীণ জীবনে ছেড়ে শহুরে জীবনে চাকুরী করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁর দাদা হুজুরের প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জোয়ারা ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় শিক্ষাগত জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি অধ্যক্ষ পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এবং ঐ পদে খেদমতরত অবস্থায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দেন। আমরা চলার পথে অনেক শিক্ষিত লোককে দেখি যারা জ্ঞানের অহংকারে মাটিতে পা রাখতে চাননা। কিন্তু অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আমিনুর রহমান একাধারে একজন ইসলামী স্কলার, বিদগ্ধ ভাষাবিদ, বিখ্যাত মুহাদ্দিস, দক্ষ প্রশাসক এবং সুন্নী মতাদর্শের রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের জীবনকে মাটির মত নরম ও বিনয়ী করেছিলন। তিনি বড়, ছোট, ধনী গরীব সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সাথে সমানভাবে নম্রতার সাথে ব্যবহার করতেন।
চন্দনাইশে সুন্নিয়তের প্রচার প্রসারে যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গ অবদান রেখে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের মধ্যে অধ্যক্ষ মাওলানা আমিনুর রহমান প্রথম কাতারের একজন ব্যক্তিত্ব।তিনি যতদিন জোয়ারা ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদরাসার প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন,ততদিন সুন্নিয়তের স্বার্থে ছাত্রসেনা, যুবসেনা, ইসলামী ফ্রন্টের কোন আবদার অগ্রাহ্য করেননি। অর্থ , বুদ্ধি,পরামর্শ ও সুযোগ সুবিধা দিয়ে ইন্তেকালের পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত সুন্নিয়তের সেবা করে গেছেন। একইসাথে লেখনির মাধ্যমেও সুন্নিয়তের প্রচার প্রসারে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সুন্নিয়তের রাহাবার আল্লামা নঈমুদ্দীন মুরাবাদী, মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী, আলা হযরত আহমদ রেযা খান বেরেলভী (রহ) এবং মুফতি আমীমুল ইহসান মুজাদ্দেদী (রহ) সহ অনেকের কিতাব অনুবাদ ও তাদের অবদান তুলে ধরে সুন্নিয়তের প্রচার প্রসারে অনন্য অবদান রেখেছেন।
অনেক আলেম আছেন তারা আরবী ভালোভাবে বুঝেন এবং বলতে সক্ষম কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আমিনুর রহমান সে ক্ষেত্রে একজন ব্যতিক্রমধর্মী লোক ছিলেন। তিনি যখন আরবী বলতেন তখন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অনর্গল আরবী ভাষায় কথা বলতে পারতেন। পাশাপাশি তিনি ইংরেজী ভাষাতেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কথা বলতে ও লিখতে পারতেন। তিনি অসংখ্য কিতাব অনুবাদ ও রচনা করেন। তন্মধ্যে ইংরেজী ও আরবী ভাষায় বেশ কয়েকটি কিতাব অনুবাদ করেছেন। একইসাথে তিনি উর্দু ও ফার্সীতেও সমান ভাবে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। অধিকাংশ আলেম প্রশাসনিক পদ লাভ করলে কিংবা জ্ঞানের গভীরতা থাকলে তিনি সহজে সাধারণ মানুষদের সাথে মিশতে চান না। অধ্যক্ষ মাওলানা আমিনুর রহমান সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ছিলেন। তিনি একাধারে একজন তরীকতের খলীফা, বিজ্ঞ আলেম ও দক্ষ প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও সবাইকে স্নেহ ও ভালোবাসা দেয়ার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয় ছিলেন। সকল পরিচিত জনের প্রতি তার মায়া মমতা ও ব্যবহার ছিল দেখার মতো।
বর্তমানে শিক্ষকের অভব না থকলেও দরদ মাখা নিঃস্বার্থ মনোভাব সম্পন্ন শিক্ষকের বড়ই অভাব রয়েছে। কার্যকর সৃষ্টিশীল ও বোধ শক্তি জাগরণকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তার দরদী পাঠদানের বদৗলতে অনেকেই বিজ্ঞ আলেমে পরিণত হয়েছে। তিনি বিজ্ঞ আরবী ব্যাকরণবীদ ও বিজ্ঞ হাদীস বিশারদ হিসেবে শিক্ষার্থীকে নিকট অতি প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। আমি সরাসরি তাঁর ছাত্র না হলেও তার অনেক ছাত্রদের সাথে আমার পরিচয় সূত্রে তার শিক্ষকতা কিংবা তাঁর দরস সম্পর্কে অনেক কিছু জানা ছিল।
একজন কবি বলেছেন”” মরেঙ্গে হাম কিতাবু পর ওয়ারক হো গা কাফন আপনা” অর্থাৎ বই পাঠরত অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়- এবং বইয়ের পাতা দিয়ে যেন আমার কাফন পরিধান করানো হয়। ঠিক তেমনি অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আমিনুর রহমন মাদরাসার প্রশাসনিকের দায়িত্বকে এমনভাবে কাঁধে নিয়ে ছিলেন তিনি দিন-রাত, প্রতিটি নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে মাদরাসায় দায়িত্ব এককভাবে সুনাম ও দক্ষতা এবং আমানতদারিতা সহিত এককভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন সময়ে মাদরাসার উপধ্যক্ষ সহ অনেক শিক্ষকর পদ খালি থাকলেও তার কর্ম দক্ষতা অনুভব করতে দেয়নি। তিনি একাধারে অধ্যক্ষ, শিক্ষক, ও দক্ষ প্রশাসন ছিলেন।
পরিশেষে এই মহান আদর্শ শিক্ষকের দ্বীনি জগতে যে স্বপ্ন তা বাস্তবায়ন করা সকল সুন্নী আলেম ওলামা এবং ভাইদের এগিয়ে আসা উচিত। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী যা প্রকাশিত হয়েছে তা সাধারণ মানুষদের কাছে পৌছিয়ে দেয়া নৈতিক দায়িত্ব। একইসাথে তার অপ্রকাশিত গ্রন্থগুলি প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবী। এব্যাপার সুন্নী মতাদর্শের অনুসারী সকলেই এগিয়ে আসা বড্ড প্রয়োজন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ওনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান করুক এবং তাঁর জীবনের গুনাহ সমূকে ক্ষমা করুক। আমিন।
লেখক : কাজী মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ মহিউদ্দিন জেহাদী।
পি, এইচডি গবেষক (চ.বি)
প্রভাষক, কামালে ইশকে মুস্তাফা ফাজিল মাদরাসা।