রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে বড় দুই দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী গণসংযোগ ও সভা সমাবেশে জমে উঠেছে প্রাক নির্বাচনী লড়াই। প্রার্থিতার লড়াইয়ে কে পাচ্ছে কোন দলের মনোনয়ন এর হিসাব কষছে সব শ্রেণি পেশার মানুষ। কে মনোনয়ন পাবেন তা নিয়ে মন্তব্যের শেষ নেই সাঘাটা ও ফুলছড়ির ভোটারদের। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে গাইবান্ধা-৫ আসনে ততই বাড়ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রচার কার্যক্রম। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীগণ এলাকায় গণসংযোগ করছেন। ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার সাঁটছেন। উঠান বৈঠক করছেন তারা। আয়োজন করা হচ্ছে মতবিনিময় সভা। পথসভার মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। ভোট চাইছেন নৌকা মার্কায়। দলটির তৃণমূল পর্যায়ে লেগেছে ভোটের হাওয়া। সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে তাদের প্রতিটি কর্মকান্ডেই থাকছে নির্বাচনি আলোচনা। বিএনপি রাজপথে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সক্রিয় থাকলেও তারা যে নির্বাচনের প্রস্তুতি থেকে একেবারে পিছিয়ে আছে তা বলা যাবে না। এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তারাও চালাচ্ছে নির্বাচনি হোমওয়ার্ক। জাতীয় পার্টি (জাপা) তাদের ঘাটি উদ্ধারের জন্য সাংগঠনিকভাবে নিজেদের শক্তিশালী করার পাশাপাশি নির্বাচনি প্রস্তুতিতেও মনোযোগ দিয়েছে। সাঘাটা ও ফুলছড়িতে জামায়াতে ইসলামীর দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। তারা ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে স¤পর্কের টানাপড়া ও রাজনৈতিক কৌশলের কারণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করতে চায় জামায়াত। সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। ইতিমধ্যে এ আসনে নিজেদের একক প্রার্থীও ঠিক করে ফেলেছে জামায়াতে ইসলামী। সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-৫ সংসদীয় আসন। সাঘাটার ১০টি এবং ফুলছড়ির ৭টি ইউনিয়নসহ দুই উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে ভোটার রয়েছে ৩ লক্ষ ৩৯ হাজার ৯৮ জন। এ আসনে স্বাধীনতার পর থেকে ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৫ বার জাতীয় পার্টি, ৪বার আওয়ামী লীগ ও দু’বার বিএনপি জয়লাভ করেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-৫ আসন থেকে ফজলে রাব্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের ২২ জুলাই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুতে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী বর্তমান সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান রিপন। মনোনয়ন চান প্রয়াত এ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার মেয়ে ও ফুলছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ স¤পাদক ফারজানা রাব্বী বুবলী। এ ছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ স¤পাদক আল মামুন, ফুলছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান জিএম সেলিম পারভেজ এবং যুবলীগ নেতা সুশীল চন্দ্র সরকারও মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগে বিভক্তি-বিরোধ সবচেয়ে বড় সমস্যা। সাঘাটা ও ফুলছড়ি আসনে যিনিই মনোনয়ন পাবেন তাকেই দলের একাংশের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। এ কারণে জয়ের জন্য দলের পর্যাপ্ত ভোট থাকলেও প্রার্থীর পরাজয়ের শঙ্কা সবসময় থেকেই যায়। সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান রিপন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই এলাকায় নানা উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নের পাশাপাশি তিনি দলের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে তাদের আস্থা অর্জনে কাজ করে যাচ্ছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন নিয়ে এ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার সঙ্গে মাহমুদ হাসান রিপনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এ নিয়ে দলের কর্মী-সমর্থকরাও বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেই সময় সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একটি অংশকেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে রিপনের সঙ্গে দেখা যায়। মাহমুদ হাসান রিপন ২০০৬ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১১ সালের ১১ জুলাই পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। সেই সুবাদে ফুলছড়ি ও সাঘাটা দুই উপজেলার তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে তার যথেষ্ট কর্মী-সমর্থক গড়ে উঠে। তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে রয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে নানা অনুষ্ঠানে নৌকা মার্কায় ভোট চাইছেন। প্রয়াত ফজলে রাব্বী মিয়ার কর্মী-সমর্থক এবং দলীয় পদ-পদবি থেকে বঞ্চিতসহ নানা কারণে বিক্ষুব্ধরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফারজানা রাব্বী বুবলীর অনুসারী হয়েছে। বুবলী প্রার্থিতা এবং জনসমর্থন আদায় করতে মাঠে কাজ করছেন। গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর স¤পাদক সাইফুল আলম সাকা বলেন, আওয়ামী লীগ একটি নির্বাচনমুখি বড় রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যেমন অনেকেই আগ্রহী থাকেন তেমনই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও থাকে। তবে তা দলে বিভক্তি হিসেবে কাজ করে না। নির্বাচনের সময় কখনো কখনো একাধিক প্রার্থী হলে তার পক্ষ-বিপক্ষে কর্মীরা ভাগ হয়ে পড়ে। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগে কোনো বিভক্তি বা গ্রুপিং নেই। অন্যদিকে আন্দোলনে বিএনপির নজর থাকলেও প্রস্তুতি রয়েছে নির্বাচনেরও। মামলা আর গ্রেফতার আতঙ্ক কাটিয়ে স্থানীয় রাজনীতির মাঠে এখন সাংগঠনিক তৎপরতায় বিএনপি অনেকটাই সুসংগঠিত। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষিত না হলেও ভোটের মাঠে রয়েছে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদেও অনেকেই। এলাকায় শোভা পাচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বাহারি পোস্টার ও ফেস্টুন। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের রয়েছেন গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাধারণ স¤পাদক মাহামুদুন নবী টিটুল, সহ-সভাপতি ফারুক আলম সরকার, সদস্য কামরুজ্জামান সোহাগ, সাঘাটা উপজেলা সভাপতি মোহাম্মদ আলী ও এ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান। বিএনপির জেলা কমিটির সাধারণ স¤পাদক মাহামুদুন নবী টিটুল বলেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে গাইবান্ধায় বিএনপি অনেক বেশি সংগঠিত। পার্টিতে কোনো বিভেদ কোন্দল নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলের পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। নির্বাচনে কম সময়ের নোটিসে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে সব আসনেই সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থী ঠিক করে রাখার প্রক্রিয়া চলছে। অপরদিকে এগার বছর পর দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উপস্থিতিতে সম্প্রতি জাপার জেলা সম্মেলন হলেও কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। দলের দুই শীর্ষ নেতা জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের বিরোধের জেরে তৃণমূলেও লেগেছে বিভক্তির ঢেউ। এ অবস্থাতেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে দলের মনোনয়ন পেতে প্রচারণায় নেমেছেন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাঘাটা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি এএইচএম গোলাম শহীদ রঞ্জু এবং গাইবান্ধা জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আতাউর রহমান সরকার আতা। জাপার জেলা কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ও জাতীয় শ্রমিক পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ বিষয়ক স¤পাদক রেজাউন্নবী রাজু বলেন, জাপায় কোনও বিভক্তি নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে। তারা নানা ইস্যুতে কর্মসূচি দিয়ে মাঠে শক্তি দেখাতে চাচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে এ আসনে তারা প্রার্থীও ঠিক করেছে। সাঘাটা ও ফুলছড়ি আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দলটির জেলা শাখার নায়েবে আমির আলহাজ আব্দুল ওয়ারেছের নাম শোনা যাচ্ছে।








