বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি জেলা ভোলা। নদীমাতৃক প্রাকৃতিক দৃশ্যের এই জেলাটিতে জলপথের যোগাযোগ বেশ কঠিন। বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলের কাছে অবস্থিত ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর এই জেলাটি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
২০১৯ সালে দেশের ১৪টি জেলার ৪২টি উপজেলাকে হার্ড টু রিচ (এইচটিআর) বা দূর্গম এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ভোলার মনপুরা দ্বীপ তার মধ্যে অন্যতম। ভৌগলিক অবস্থান এবং অবকাঠামোর সংকটে মনপুরায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া রীতিমত চ্যালেঞ্জ । বিশেষত প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই দ্বীপটিতে পৌছানো কঠিন। দ্বীপটির বাসিন্দাদের পায়ে হেঁটে, অস্থায়ী বাঁশের সেতু পেরিয়ে বিশাল পথ অতিক্রম করতে হয়, অথবা নৌকা নিয়ে নিকটতম স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের সাথে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং ভিটামিন এ সম্পূরকের মতো মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে অসচেতনতা এই দ্বীপের শিশুরা বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
শিশুর বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য ভিটামিন এ’ অপরিহার্য। বিশ্বজুড়ে গবেষণা থেকে প্রমাণ মিলেছে যে, ভিটামিন এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। হাম এবং ডায়রিয়াজনিত রোগের মতো প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি এবং হাড়ের বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে একটি শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।
শিশুর সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা
মনপুরার দশেরহাট গ্রামের বাসিন্দা ঝুমুরের দুই সন্তান। তাঁর ছোট মেয়ে মরিয়ামের বয়স এখন ৪ বছর। মরিয়াম প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ ডোজ পেলেও ঝুমুরের ৯ বছর বয়সী ছেলে আলিফ এই ডোজ নেয়নি।
“আমরা ভিটামিন এ এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলাম না। একারণে আমার ছেলেকে ভিটামিন এ খাওয়ানো হয়নি। এখন তাকে রাতকানা রোগে ভুগতে দেখে কষ্টে বুক ভেঙ্গে যায়। সে ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে। সুস্থ হতেও অনেক সময় লাগে। আমরা যদি ভিটামিন ‘এ’র গুরুত্ব আরও আগে জানতাম, তাহলে ছেলেটাকে এই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হতো না” নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ জানান ঝুমুর ।
মনপুরার মতো দুর্গম অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে ভিটামিন এ পরিপূরকের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা মোকাবেলায় ২০২২ সাল থেকে জাতীয় পুষ্টি পরিষেবা (এনএনএস)/ জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ইনস্টিটিউট (আইপিএইচএন) এর সাথে একযোগে কাজ করে আসছে ইউনিসেফ। কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এসব এলাকার শিশুদের অপরিবহার্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা সরবরাহে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে ইউনিসেফ।
২০২২ সালে ৫১টি দুর্গম এলাকার ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ লাখ ৫০ হাজার ৭০২ শিশু এবং ২০২৩ সালে ৬৬টি দুর্গম এলাকার ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮৯ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ সম্পূরক সরবরাহ করা হয়েছে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভিটামিন এ পাবার যোগ্য শিশুদের তালিকা তৈরি, শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ভিটামিন ‘এ’র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করার মতো কৌশল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ভিটামিন এ সম্পূরক কোন তারিখে এবং কোথায় দেয়া হবে সেটি নির্দিষ্ট করে মনপুরার রাস্তায় রাস্তায় মাইকে ঘোষনা দেয়া হয়। পরিবারগুলির কাছে তথ্য পৌঁছানো ও জীবন রক্ষার উদ্যোগে অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে কাজ করেছে এই পদ্ধতি।
ভিটামিন এ বিতরণ কেন্দ্রগুলো কমিউনিটির ভেতরে বসানোর ফলে পরিবারগুলোর জন্য সন্তানের ভিটামিন এ সম্পূরক পাওয়া সহজ হয়েছে। পাশাশি দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে এবং কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে তা নিশ্চিত করা গেছে।
পুষ্টি নিশ্চিতের এক সমন্বিত উদ্যোগ
২০২২ এর আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো নিবন্ধন বা শিশুদের তালিকা সংরক্ষণ করা হতো না। একারণে ওই সময়ে ভিটামিন এ সম্পূরক পাবে এমন শিশুদের সম্পর্কে তথ্যের অভাবে তাদের খুঁজে বের করাও অত্যন্ত কঠিন ছিল। ডোজ নেয়ার পরবর্তী তারিখে পরিবারগুলো সন্তানদের নিয়ে আসতে পারতেন না এবং তাদের খুঁজে বের করা অসম্ভব ছিলো।
২০২২ সালে ইউনিসেফ গ্রোথ মনিটরিং অ্যান্ড প্রমোশন (জিএমপি) কার্ড চালু করার পর, ট্র্যাকিং প্রচেষ্টায় বড় ধরণের পরিবর্তন আসে। যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের ডোজ নিতে পারেনি, স্বাস্থ্যকর্মীরা সেই পরিবারগুলোকে সনাক্ত করতে এবং তারে সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিল। ভিটামিন এ সম্পূরক দেওয়ার অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্যের সাথে সাথে স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা জিএমপি কার্ডে শিশুর নাম, বয়স, ঠিকানা, এবং পিতামাতার নাম লিখে রাখেন। এর মাধ্যমে যদি কোনো শিশু একটি ডোজ নিতে না পারে, তাহলে সহজেই তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা যায়। শিশু বছরে দুটি ভিটামিন এ সম্পূরক ডোজসহ সবগুলো টিকা পেয়েছে কিনা জিএমপি কার্ডের মাধ্যমে সে বিষয়টি বোঝা যায়।
ঝুমুরের মেয়ের জিএমপি কার্ডের তথ্য বলছে, সে গত দুই বছরে (২০২২-২০২৩) ভিটামিন এ সম্পূরকের চারটি ডোজই পেয়েছে। এর অর্থ সে বছরে দুটি ভিটামিন এ সম্পূরক ডোজের আওতাভুক্ত।
জাতীয় পুষ্টি পরিষেবা (এনএনএস)/ জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ইনস্টিটিউট (আইপিএইচএন) সহযোগিতায় ইউনিসেফ দেশের ৫টি জেলার ১৭টি উপজেলার ১২০০ এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ সেশনের আয়োজন করে। সেই প্রশিক্ষণে অংশ নেয়াদের একজন মলয় কুমার।
“একজন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী হওয়ার পরও আমি ভিটামিন এ সম্পূরক বাদ দেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলাম না। কমিউনিটির মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন এ এর অভাবে স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব এবং ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার কোনগুলো সেটি বোঝা খুবই প্রয়োজনীয়” বলেন মনপুরার স্বাস্থ্যকর্মী মলয় কুমার ।
শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ
শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ভিটামিন এ এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের মাধ্যমে, মলয়ের মতো পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীরা ভিটামিন এ সম্পূরক ঘিরে মানুষের উদ্বেগ এবং কুসংস্কার দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করেছেন। এভাবে তারা ধীরে ধীরে কমিউনিটির সবচেয়ে সংশয়ে থাকা সদস্যদেরও আস্থা অর্জন করেছে।
কমিউনিটি এনগেজমেন্ট সেশন এবং উঠান বৈঠকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঝুমুরের মতো মানপুরার অন্যান্য অভিভাবকেরা ভিটামিন এ এর অভাবে ত্বক ও চোখের শুষ্কতা, রাত কানা এবং শিশুর বিকাশ ব্যহত হওয়া সম্পর্কে আগে জানতেন না এমন মূল্যবান জ্ঞান অর্জন করেন।
এছাড়া, তারা ভিটামিন এ এর প্রাকৃতিক উৎস, ভিটামিন এ সম্পূরকগুলির উপকারিতা যেমন: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন রোগ এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ভিটামিন এ সম্পূরকের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারেন।
“শরীরে পুষ্টি ও ভিটামিন এ এর ঘাটতির প্রভাব সম্পর্কে আমি আগে খুব বেশি জানতাম না। স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাদের গ্রামে এসে ভিটামিন নিয়ে কথা বলেন। কেন সম্পূরক গ্রহণ করা জরুরি তা ব্যাখ্যা করেন এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে বলেন।” জানালেন ঝুমুর।
“মরিয়ম একটি সুস্থ এবং সবল শিশু হিসাবে বেড়ে উঠছে। এজন্য আমি ভিটামিন এ কর্মসূচীর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক সুস্থতার ক্ষেত্রে ভিটামিন এ উপকার করে সে বিষয়ে জানতে পেরে আমি খুশি। আমি যেসব বিষয় শিখি তা সবসময় আমার প্রতিবেশীদের সাথে শেয়ার করি এবং ভিটামিন এ সম্পূরক নিতে তাদের উত্সাহিত করি, ” এভাবে কথা শেষ করেন ঝুমুর।
ঝুমুরের মেয়ে মরিয়াম এমন শিশুদের একজন, মনপুরায় যারা আগে কখনও ভিটামিন এ সম্পূরক গ্রহণ করেনি। তবে এখন ইউনিসেফের সহায়তায় এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ থেকে উপকৃত হচ্ছে। সবচেয়ে দুর্গম এলাকায় পৌছানোর দিকে গুরুত্ব দেয়ায়, প্রচারাভিযানটি এই অঞ্চলের শতভাগ শিশুর ভিটামিন এ সম্পূরক পাওয়া নিশ্চিত করেছে।
যাতে সব শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি কার্যক্রম থেকে উপকৃত হতে পারে এবং সাফল্য লাভ করতে পারে সেজন্য ইউনিসেফ ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টসহ পুষ্টি সেবার সহজলভ্যতা ও গুণগত মান বৃদ্ধির পক্ষে এ্যাডভোকেসি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।







