সাহাব উদ্দিন রিটু(বান্দরবোন): বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ।কৃষিই
এদেশের জীবন জীবিকার প্রধান মাধ্যম।কৃষির প্রধান পন্য ধান।সাধারণত
সমতল ভুমিতে ধানচাষ হয় বর্ষা মৌসুম আর শীত মৌসুমে সেচের
পানিতে।কিন্ত পাহাড়ের চুঁড়ায় ধানচাষ অন্য জেলার মানুষের কাছে
হয়তো অকল্পনীয়।অথচ পার্বত্য অঞ্চলে এ চাষ হয়ে আসছে বহুকাল ধরে।এ
ধরনের চাষ স্থানীয় ভাষায় জুমচাষ। আর জুমচাষীকে জুমিয়া বলে।
জুমিয়ারা জানান,জুমচাষের জন্য সাধারণত নভেম্বর/ডিসেম্বরের
দিকে পাহাড়ে জঙ্গল কাটা হয়। কাটা জঙ্গল শুকালে মার্চ/এপ্রিলের দিকে
আগুনে পুড়িয়ে পরিস্কার করা হয়।অবশ্য পোড়ানের আগে ফায়ার লাইন করা
হয় যাতে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে বিপদ না ঘটে।মে/জুনের দিকে
পাহাড়ে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে দায়ের সাহায্যে সামান্য গর্ত করে
জুমের ধান রোপন করা হয়।জুমের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে
মারপা,ভুট্রা,মাসকলই,তিলসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল বুনা
হয়।সেপ্টেম্বর/অক্টোবরের দিকে শুরু হয় ধান কাটা ।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে
জেলায় এবার জুমচাষের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৪৬০ হেক্টর
জায়গায়। আবাদ হয়েছে ৮২৬৭ হেক্টর জায়গায়। তারমধ্যে বান্দরবান সদর
উপজেলা ১৪৫,রোয়াংছড়ি ৮৩৫,রুমা ১৫৫৩,থানছি ২১০২,লামা
১১৮৫,আলীকদম ১২৩৮ ও নাইক্ষংছড়ি উপজেলায় ১৯২ হেক্টর জায়গায় জুম
চাষ হয়েছে।
এখন সেপ্টেম্বর মাস। ধান কাটার ভরা মৌসুম।পাহাড়ে পাহাড়ে পাকা
ধান। সমতল থেকে ৫শ/১ হাজার ফুট উপরে পাহাড় চুঁড়ায় পাকা ধান
বাতাসে সোনালী ঢেউ খেলছে।যে দিকে দুচোখ যায় পাকা ধানের
সোনালী আভায় যে কারো মন ভরে যায়।পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে
জুমিয়াদের মুখে হাসি ফুটেছে।
জুমিয়ারা এখন ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। কারো সাথে
যেন কথা বলার সময় নেই তাদের।কেউ ধান কাটছেন,কেউ ধান মাড়াচ্ছেন
আবার কেউ বা ধান শুকাচ্ছেন।
এদিকে লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে ইয়াংছা মৌজার
মিরাঞ্জা পর্যটন ও বোদুরঝিরি এলাকায় স্বরজমিনে দেখা য়ায়, বিশাল
পাহাড়গুলোর ২৫ একর জায়গাজুড়ে শুধু পাকা ধান আর ধান।ধান কাটা ও
মাড়াইয়ে ব্যাস্ত জুমিয়ারা। মাড়াইকৃত ধান পাহাড়েই শুকাতে দেখা
গেছে। ধান কাটা শেষ হলে নতুন চালের পিঠার উৎসবের আমেজ বইবে
জুমিয়াদের ঘরে ঘরে। আবার কারো কারো বছরের খাবার যোগাড় হবে
জুমের ধান থেকে।
জুমিয়া জার্মান ত্রিপুরা বলেন, প্রকৃতির উপর নিভর হয়ে
বংশপরমপরায় আমরা এ জুমচাষ করে আসছি।আমি এই পাহাড়ে ৬ আড়ি
(আড়ি প্রতি ১০ কেজি) ধান রোপন করেছি।আমার বেশিরভাগ ধান
পেকেছে। কিন্তু কিছু ধান এখনও কাঁচা।তবে পাকাধান কাটা ও
মাড়াইয়ের কাজ চলছে।অনুকুল আবহাওয়ায় ফলন ভালো হওয়ায় আমাদের
অনেক খুশি লাগছে।
অপরদিকে মিরিঞ্জা পর্যটন এলাকায় জুমিয়া মনিরাম ত্রিপুরা
বলেন,আমি ৮ আড়ি ধান রোপন করেছি।আমার সব ধান পেকেছে।এখন
ধান কাটার কাজ চলছে। জুমের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে
মারপা,ভুট্রা,মাসকলই,তিলসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল বুনেছি।
লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুজ্জান বলেন,এ বছর উপজেলায়
জুমচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১২২.০ হেক্টর।আর আবাদ
বাস্তবায়ন হয়েছে ১৩১২.০ হেক্টর জায়গায়।তবে স্থানীয় জাতের
পাশাপাশি জুম চাষীদেরকে আমরা আধুনিক কৃষি সম্প্রসারণের দিকে
উদ্বোদ্ধ করছি।২৫জন জুম চাষীকে এবছর ব্রিধান ৮৩ জাতের বীজ
প্রদান করা হয়েছে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ পরিচালক কৃষিবিদ
মো. হাসান আলী বলেন,কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আমাদের মাঠ
পর্যায়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উসহকারি কৃষি কর্মকর্তাগন
জুম চাষীদের সহযোগীতা ও পরামশ দিয়েছেন।ইতিমধ্যে জুম কাটা শুরু
হয়েছে।এবার আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সাফল্য অর্জিত হয়েছে।







