‘অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর’-জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের এমন মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ, লুটপাট ও অনিয়মের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্পিকারের বক্তব্যে প্রশাসনের একটি অংশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতিফলন থাকলেও এর পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে-দুর্নীতির দায় কি শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের? রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেউ যদি ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে নিয়োগ, বদলি—পদায়ন, ঠিকাদারি, প্রকল্প কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বেআইনি হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে সেই দুর্নীতির দায় কি শুধু কর্মকর্তাদের ওপর বর্তাবে?
এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক ও কলামিস্ট মনিরুজ্জামান মনির বলেন, দুর্নীতিকে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁর মতে, দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির ঘাটতি-সবকিছুর ভূমিকা থাকতে পারে।
“দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা যেমন আইনের ঊর্ধ্বে নন, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষমতার আড়ালে থাকা দুর্নীতিবাজরাও দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারেন না। দুর্নীতির দায় নির্ধারণে ব্যক্তি নয়, অপরাধ ও প্রমাণকে মানদণ্ড করতে হবে”-মন্তব্য করেন মনিরুজ্জামান মনির।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি-পদায়নে অনিয়ম ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে ‘অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর’-এমন ব্যাপক অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণের আগে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। কারণ প্রশাসনে দুর্নীতিবাজের পাশাপাশি সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাও রয়েছেন।
রাজনৈতিক দায়ও কি বিবেচনায় আসবে?
মনিরুজ্জামান মনির বলেন, একটি দুর্নীতির ঘটনায় শুধু নিচের স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তি দিয়ে যদি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক, প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী বা সুবিধাভোগীদের আড়াল করা হয়, তাহলে দুর্নীতির মূল কাঠামো অক্ষত থেকে যায়।
“যে ঘুষ নেয়, যে ঘুষ দেয়, যে ঘুষের ব্যবস্থা করে এবং যে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অনিয়মকে সুরক্ষা দেয়-প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একটি শ্রেণির বিরুদ্ধে নয়; এটি একটি দুর্নীতিপ্রবণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে”-বলেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক চাপ থাকলেও কোনো কর্মকর্তা বেআইনি কাজ করলে তাঁর ব্যক্তিগত দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একইভাবে কোনো কর্মকর্তা পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেনÑএটিও তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নয়। অপরাধের মানদণ্ড হতে হবে প্রমাণ; রাজনৈতিক পরিচয় নয়।
প্রশাসনে ‘আগের সরকারের লোক’ পরিচয়ে কাউকে অভিযুক্ত না করে তাঁর কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে তদন্ত করা উচিত বলেও মনে করেন মনিরুজ্জামান মনির। তাঁর মতে, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার অর্থ সৎ কর্মকর্তাদের হয়রানি করা নয়; বরং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা।
দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতির পরীক্ষা নিজেদের ঘরে:
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু অন্য দলের দুর্নীতির বিচার দাবি করলেই হবে না; নিজের দলের কোনো নেতা, জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস থাকতে হবে।
“দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো-নিজের দলের দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধেও একই আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস। রাজনৈতিক পরিচয় যদি অপরাধের ঢাল হয়ে যায়, তাহলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না”-মন্তব্য করেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট মনিরুজ্জামান মনির।
তাঁর মতে, দুর্নীতি বন্ধে রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা, নিয়োগ ও পদায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, সরকারি ক্রয়ে জবাবদিহি, স্বাধীন তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষা দিতে হবে।
জনগণ চায় দলীয় নয়, সমান জবাবদিহিঃ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে কর্মকর্তা, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার কিংবা প্রভাবশালী-অপরাধের সঙ্গে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাঁকে প্রমাণের ভিত্তিতে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
মনিরুজ্জামান মনিরের ভাষায়, “রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের। তাই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা যেমন আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিও দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারেন না। জনগণ এখন শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য শুনতে চায় না-তারা দেখতে চায় নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং বাস্তব জবাবদিহি।”
তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের বিনিময়ে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।
সুতরাং প্রশ্নটি শুধু ‘অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর কি না’-তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, দুর্নীতির সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে কি না।








