শিক্ষা হলো নিজেকে ও জগৎকে চেনার ও জানার একটি মাধ্যম এবং জ্ঞানের এক প্রবাহমান স্রোত। এর মাধ্যমে যেমন নিজেকে আবিষ্কার কার যায়,তেমনি জগৎকে আবিষ্কার করা যায়। সেই শিক্ষার বাহন হলো শিক্ষক। আর সেই শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রবাহকে সচল রাখার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তারা হলেন শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রশাসক।শিক্ষকদের একাডেমিক পদবি তাদের যোগ্যতা ওসম্মানের নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।শিক্ষকগণ ভুল বা মিথ্যা পরিচয় বহন করবেন-এটা কোনক্রমেই কাম্য হতে পারে না। শিক্ষা ব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। যার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পদের মর্যাদা ও সম্মান নির্ধারিত হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ইদানীং আমাদের দেশের বেসরকারি কলেজ, মাদ্রাসা এবং কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে বিভিন্ন পদের নাম বা পদবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইন ও নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে একশ্রেণির শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজেদের নামের পাশে এমন সব পদবি যুক্ত করছেন, যা কেবল শিক্ষানীতিরই পরিপন্থী নয়, বরং শিক্ষার সামগ্রিক প্রশাসনিক মর্যাদাকে চরমভাবে অবমাননা করছে।
প্রথমত, বেসরকারি কলেজ এবং মাদ্রাসার ক্ষেত্রে পদবি ব্যবহারের বিষয়টি সরকারি বিধিমালা দ্বারা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত। সেখানে একজন শিক্ষকের পদোন্নতির সর্বোচ্চ ধাপ হলো সহকারী অধ্যাপক। বেসরকারি এমপিওভুক্ত বা নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোতে ‘অধ্যাপক’ নামে কোনো পদই নেই। তাদের পদবিগুলো পর্যায়ক্রমে হলো-প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, উপাধ্যক্ষ এবং অধ্যক্ষ। অথচ অনেক বেসরকারি কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের দিব্যি নিজেদের ‘অধ্যাপক’ হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা যায়, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বিভ্রান্তিকর।
দ্বিতীয়ত, আরও ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন, প্রাক-প্রাথমিক বা প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণি, এমনকি সর্বোচ্চ দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করানো হয় এমন কিন্ডারগার্টেন সদৃশ ক্ষুদ্রকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা নিজেদের নামের আগে বুক ফুলিয়ে ‘অধ্যক্ষ’ লিখছেন ও প্রচার করছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই তথাকথিত ‘অধ্যক্ষ’দের অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা সাকুল্যে এসএসসি বা এইচএসসি পাস! এটি শুধু হাস্যকরই নয়, বরং দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি চরম লজ্জাজনক বিষয়।
অধ্যক্ষ পদবি ব্যবহারের একটি তুলনামূলক বাস্তবতা
সরকারি কলেজের নিয়ম: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা সুদীর্ঘ কর্মজীবন শেষে এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ পদোন্নতি পার হয়ে যখন চতুর্থ গ্রেডের ‘অধ্যাপক’ পদে উন্নীত হন কেবল তখনই তিনি একটি সরকারি কলেজের ‘অধ্যক্ষ’ হওয়ার যোগ্যতা লাভ করেন।
বেসরকারি কলেজের নিয়ম: এমনকি বেসরকারি ডিগ্রি কলেজ বা মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হতে গেলেও সুনির্দিষ্ট উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং দীর্ঘ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।
কিন্ডারগার্টেনের বাস্তব চিত্র: প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই কেবল একটি প্রাথমিক স্তরের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক বা প্রধান হয়েই অনেকে ‘অধ্যক্ষ’ পদবিটি নিজের করে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক (এসএসসি) বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস (এইচএসসি)-যাদের উচ্চতর কোন ডিগ্রি নেই।
এই ধরনের সস্তা ও অননুমোদিত পদবি ব্যবহারের মানসিকতা শিক্ষার গুণগত মানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। যখন একজন এসএসসি পাস ব্যক্তি নিজেকে ‘অধ্যক্ষ’ দাবি করেন বা কোনো বেসরকারি কলেজের শিক্ষক নিজেকে ‘অধ্যাপক’ হিসেবে সমাজে পরিচয় দেন, তখন বিসিএস ক্যাডারভুক্ত প্রকৃত অধ্যাপক এবং যোগ্যতাসম্পন্ন কলেজ অধ্যক্ষদের মেধা, শ্রম ও মর্যাদাকে চরমভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের কাছেও পদবিগুলোর গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য হারিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রশাসনিক নৈরাজ্য আর চলতে দেওয়া যায় না। শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা এবং প্রশাসনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এমন সুনির্দিষ্ট পদবির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে যাতে পদবি শুনলেই বুঝা যায় যে, ব্যক্তির যোগ্যতা বা পর্যাদা কোন পর্যায়ে।
প্রথমত, একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করে প্রাথমিক, প্রাক-প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের জন্য ‘প্রধান শিক্ষক’ বা ‘পরিচালক ( প্রতিষ্ঠানের নাম বা ধরণসহ)’ পদবি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তাদের ‘অধ্যক্ষ’ পদবি ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি কলেজ ও মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সরকারি জনবল কাঠামো অনুযায়ী নির্ধারিত পদবির বাইরে -যেমন ‘অধ্যাপক’ পদবি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে এবং এর লঙ্ঘন হলে প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বা এমপিও বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।একই সাথে নিজ নিজ পদবি যথ্যথভাবে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে কঠোর নির্দেশনা জারি করতে হবে।
পদবি কেবল একটি নাম নয়, এটি যোগ্যতা, মেধা এবং অর্জনের প্রতীক। শিক্ষার আঙিনায় এই প্রতীকের অবমূল্যায়ন ও জালিয়াতি বন্ধ করতে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
মো: মহিউদ্দিন
শিক্ষক (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা),
আমতলী সরকারি কলেজ, বরগুনা।
সম্পাদক-মাসিক ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স








