অনেক অপছন্দেরএক্সপেরিমেন্ট আপনার জীবনের ওপরেই ঘটবে। নানা অরুচি চুপচাপ হজম করতে হবে। ঘৃণা করেন— এমন অনেক কিছুই বিনা প্রশ্নে, মুখ বুজে মেনে নিতে হবে। এড়িয়ে চলতে চান, কিন্তু এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে— যখন সহজ কথাটুকুও সহজে বলতে পারবেন না। মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে সমাজ–সংসার থেকে চাপ আসবে।
এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে— এই সব আপনার জীবনের সঙ্গে ঘটতে পারে, তা কয়েক মুহূর্ত আগেও আপনি কল্পনা করতে পারেননি। এমন পরিবেশে মানিয়ে নিতে হবে, যেখানে দম বন্ধ হয়ে আসে। তবু মুখ বুজে দিন পার করতে করতে একসময় আপনার আপনাকে আর আপনি-ই চিনবেন না। নিজের ভেতর একজন অচেনা ‘আমি’- এর আবির্ভাব হবে।
যা চান, তা ছাড়া সবকিছুই পাচ্ছেন। ইচ্ছেগুলো আপনার কাছে ধরা দিচ্ছে না। স্বপ্নের হাতছানি কল্পনার ঘরে বাসা বেঁধেছে। সুখের ভেলা গন্তব্য থেকে বহু দূরে আটকে আছে। আশার সঙ্গে প্রাপ্তির দফারফা হয়নি। সুন্দর সূচনার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। যেন কোনো কিছুর মধ্যেই প্রাণ নেই।
অপ্রাপ্তির হতাশায় নিজেকে অপাংক্তেয় মনে হয়। এককালে যারা সমীহ করত, তারা সম্মান তুলে নিয়েছে। জীবনের তালমাটাল অবস্থা সব স্বপ্ন এলোমেলো করে দিচ্ছে। আশাভঙ্গজনিতক্লান্তিতে জীবন অসহ্য মনে হয়। নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে— জীবন এমন কেন? রুষ্টভাবাপন্নতাই কি জীবনের গতি?
মানুষ ঘোড়া বা হাতি নয়। সাপ কিংবা কচ্ছপও নয়। খাপ খাওয়াতে পারে বলেই মানুষ সৃষ্টির সেরা। অল্পতেই পরাজয় বরণ করলে ইতিহাস পাল্টায় না। পরবর্তী পৃথিবীর জন্য গল্পের রসদ রেখে যেতে হয়। লড়াইয়ের আগে হার মেনে নিলে সেই খেলোয়াড়দের ইতিহাস মনে রাখে না। যে জীবন সংগ্রামে গড়া, সেই জীবনই সুন্দর। যে জীবনে ঘাম ও শোক নেই, সে জীবনের মূল্য নেই।
পরিশ্রম ব্যতিরেকে সফল হলে সে জীবন অনুসরণযোগ্য হয় না। পাতানোম্যাচের ফল আগে জানা বলেই মসৃণ পথে পরিচালিত জীবন দুনিয়াকে আকর্ষণ করে না। বরং রাতের কান্না ভোরের শিশিরের মতোশুকিয়ে গিয়ে নবোদ্যমে শুরু হওয়া লড়াই সন্ধ্যায় সম্পদ ও সম্পর্ক জমা করে।
জীবনের অনেক ঘটনার নাটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা অনেক কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের চেষ্টা ও কর্মের প্রভাব অবশ্যই আছে। তবু ভাগ্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করা সাধ্যাতীত। আমরা ভাবি— এমন অনেক কিছু আমাদের সঙ্গে না ঘটলেও পারত। কিন্তু ঘটার ক্ষেত্রে আমাদেরও কিছু দায় থাকে। সেধে বিপদে পড়ার অভ্যাস দীর্ঘদিনের।
তাছাড়া সমাজ ও সংসার আমাদের ওপর কিছু অন্যায় চাপিয়ে দেয়। সম্মিলিতভাবে চুপ থাকার সংস্কৃতি অনেক অপরাধ সহ্য করতে বাধ্য করছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবাদের ভাষাও উগ্র হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে ঘোমট সময়ের মধ্য দিয়েই জীবন পাড়ি দেয়। চাওয়া–পাওয়ার হিসাব অপূর্ণই থেকে যায়। আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব রয়ে যায়। বাস্তবায়নের অনিচ্ছাও পিছিয়ে থাকার পেছনে কম দায়ী নয়।
সবকিছু আমার চাওয়ারমতো হবে না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটুখানি না হলেই বাকিটুকুর জন্য হাল ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতাই আমাদের হারিয়ে দেয়। শেষ শ্বাস পর্যন্ত হাল ধরে রাখতে হবে। চরম অরুচিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও বপন করে যেতে হবে আশার বীজ। অন্ধকারের বিপরীতেই আলো। আপনি হেরে গেলে, আপনি হারিয়ে গেলে— ক্ষতিটা আপনারই। ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
ভাবুন— জগতের যত আয়োজন, ফুল–ফল— সবই আপনার জন্য। এই সব আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে আপনি-ই তো। আপনার অনুপস্থিতি কল্পনা করুন— তবে এসবের মূল্য কী থাকে? আশাবাদী হয়ে বাঁচুন। সুন্দর স্বতঃমূল্যবান— কারণ মন্দের অস্তিত্ব আছে। আপনি ভালো নেই— কেউ তো ভালো আছে। আপনাকেও ভালোতে বদলে নিন, অন্তত চেষ্টা করুন। হাল ছেড়ে হারিয়ে যাওয়ার মাঝে পৌরুষ নেই।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।








