সততা টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করতে হবে। অভাব দাঁড়িয়ে থাকবে দুয়ারে,
সমাজ অনেক কথা শোনাবে। সহকর্মী ও সহযাত্রীদের কাছ থেকে অসহযোগিতা
মিলবে। প্রিয়জন এবং আত্মীয়স্বজন অযোগ্য, বোকা বলে উপহাস করবে। এই
সময়ে সৎ থাকা মানে স্রোতের বিপরীতে চলা। দৃঢ় মনোবল না থাকলে কেউ
এই লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবে না। তবে কেউ যদি টিকে যায়, তবে সে
সমাজের শুধু বাতিঘর নয় বরং ধ্রুবতারা হয়ে বাঁচব।
সততার সুবাস সমাজকে আলোকিত করে। অথচ সততার অভাবে ধুঁকছে সময়।
চারদিকে স্বার্থপরতা, অসততা এবং চরিত্রহীনতার মহফিল চলছে। ভণ্ডামিতে কে
কাকে পাল্লা দিতে পারে, সেটার প্রতিযোগিতাই সর্বত্র। সততার গল্প এখন প্রায়
পাঠ্যপুস্তকের বিষয় হয়ে পড়েছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে এর বাস্তবায়ন
দ্রুতলয়ে কমছে।
সততা শুধু অর্থের বা চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সততা চর্চা করতে হবে
আমাদের কথা ও বক্তব্যেও। একজন মানুষ ঘুষ নেয় না, দুর্নীতিতে জড়ায় না,
কিন্তু কাজে ফাঁকি দেয়—এই সততার উপকার সামান্যই। তবে যে সব অপরাধ
করে এবং যে সব থেকে দুইটা-পাঁচটা বাদ দেয়—উভয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট।
মন্দের ভালো দিয়েও জীবন চলতে পারে, তবে আমাদের কামনা হওয়া উচিত
সর্বোত্তম। সততা এমন এক স্বভাব, যা শুরুতেই অন্যের কাছ থেকে আদায়
করা যায় না। বরং সৎকর্মের চর্চা, ন্যায়ের বার্তা ও দায়িত্ববোধ আগে নিজের
মধ্যে জাগ্রত করতে হয়। সততায় টিকে থাকা যুদ্ধের মতো কঠিন, কিন্তু যে
আত্মবিশ্বাস রাখে, সে এই যুদ্ধে পরাজিত হয় না।
সৎ থাকতে হলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয় বঞ্চনা ও ব্যথা সহ্য করার জন্য।
সমাজ তো আসলে বিষিয়ে আছে। কতিপয় মন্দস্বভাবের মানুষের কাছে জিম্মি
সমাজব্যবস্থা। ঘুণধরা সিস্টেমের মধ্যে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয়। এই
সংগ্রামই সৎ মানুষকে মহৎ করে তোলে।
চোখের সামনে অনেক সময় দেখা যায়—অযোগ্যরা প্রভাবশালী হয়ে উঠছে,
অমানুষেরা নেতৃত্ব পাচ্ছে। নৈতিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে এইসব অপমান সহ্য
করার মনোবল রাখতে হয়। সামান্য প্রতিকূলতায় হাল ছেড়ে দিলে মর্যাদায় বাঁচা
যায় না। আত্মসম্মান রক্ষাই সৎ থাকার আসল পুরস্কার।
মানুষ যদি দাসত্বের মানসিকতা থেকে মুক্ত না হয়, তবে কেউ কাউকে মুক্তি
এনে দিতে পারে না। সততা মানে আত্মসম্মান—অসত্যের কাছে বিক্রি না হওয়ার
গৌরব। মানুষকে কারও না কারও ছায়ায় থাকতে হয়, কিন্তু সেই ছায়া যেন
পরগাছা না হয়।
যারা সৎ নয়, তাদের ছায়া থেকেও দূরে থাকতে হবে। যাদের সঙ্গে দেখা হলেই
সম্পদ ও সঞ্চয়ের গল্প শুরু হয়, তাদের থেকে দূরে থাকতে হয়। কারও সঙ্গে
তুলনা করে ভালো থাকতে গেলে নিজের জীবনের সবটুকু ভালো হারিয়ে যায়।
সততা আত্মসম্মানের আদিরূপ—যে একবার বিক্রি হয়, সে আর মাথা তুলে
দাঁড়াতে পারে না।
চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস কেবল সততাই দেয়। সৎ মানুষের কিছুই
হারানোর ভয় থাকে না, চলার পথে কোনো শঙ্কাও থাকে না। সৎ মানেই
স্বাধীন—আত্মসম্মানে বলীয়ান। এই স্বাধীনতাই মানুষকে মানুষ করে তোলে।
মানবজীবন সম্পদহীন হলেও সততায় ভরপুর হওয়া উচিত। একসময় সবাই
উপলব্ধি করবে, সততাই প্রকৃত সম্পদ। ব্যক্তিত্বহীন হয়ে বাঁচা মৃত্যুর চেয়েও
তুচ্ছ। অভাব, কুটনামি বা চাপ কোনো কিছুই আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে
পারবে না। অনৈতিক অর্জন আত্মতৃপ্তি দেয় না, বরং অস্থিরতা বাড়ায়। তাই
মানুষ হিসেবে সৎ হওয়া, সততার গল্প হওয়া এবং অন্যের জন্য প্রেরণা হওয়াই
জীবনের আসল অর্জন। অসৎ যে-কেউ হতে পারে, সৎ হতে পারে কেবল
মানুষ।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








