যে আপনাকে সম্মান দিতে জানে না, তার সাথে কথা বলা, পথ চলা কিংবা সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার সময়েও অসম্মানই জুটবে। কারো গল্পে অল্প জায়গা করে নিলেও আত্মসম্মান বজায় রাখুন। আত্মসমর্পণ শুধু তার কাছেই করবেন, যার কাছে আপনার পূর্ণ মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। অসম্মানজনক পরিবেশে মানুষ টিকে থাকতে পারে না। যারা স্বার্থের বিনিময়ে সম্মান বিক্রি করে, তারা আসলে আত্মহননের পথে পা বাড়ায়। এই আত্মঘাতী কাজ সারাজীবন তাকে ভোগাতে থাকে। মাথা উঁচু করে বাঁচার মাঝে যে গৌরব আছে, তা অন্য কোনো কৃতিত্বে নেই। প্রয়োজনে স্বার্থ ত্যাগ করেও সম্মানের পথ বেছে নিন। একবার নিজেকে বিক্রি করে দিলে আর কখনোই নিজেকে উদ্ধার করা যায় না। অসম্মানের আসন জাহান্নামের শাস্তির চেয়েও ভয়াবহ।
যে একবার সততা হারিয়েছে, সে কি আর কোনোদিন নিজেকে ফিরে পায়? কোনো লোভ কিংবা মোহে নিজের ব্যক্তিত্ব বিক্রি করবেন না। গৌরব ও গর্বে বাঁচার একমাত্র পাথেয় আত্মসম্মান রক্ষা করা। মিথ্যাবাদীদের কখনো আত্মসম্মান থাকে না। যে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সাদামাটা পোশাকেও দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। ভেতরের আলোকচ্ছটা বাহিরে ছড়িয়ে দেওয়ার একমাত্র উপায় সত্যকে আঁকড়ে ধরা। অন্যায়ের কাছে মাথা নত নয়, অসাধুর সাথে আপোষ নয়, অশুভের সাথে সন্ধি নয়। প্রয়োজনে জালিমের কারাগারে বন্দি থাকবেন, তবুও সত্যের শপথ ভঙ্গ করবেন না।
সম্মানহীন মানুষ খুব অল্প বাঁচে। যারা বিবেক বিক্রি করে বাজার করে খায়, তাদের দেখে সমাজে উপহাসের জন্ম হয়। রাজ-ক্ষমতা কিংবা সম্পদ সাময়িক। জীবন বারবার সুযোগ দেয়, কিন্তু একবার পথভ্রষ্ট হলে অতীতের সব অর্জন ম্লান হয়ে যায়। সত্যের পক্ষে ত্যাগ, ন্যায়ের পক্ষে কষ্ট আর উপকারের বিপরীতে অবজ্ঞা—চিরকাল ছিল। যার হৃদয়ে একবার সত্যের আলো পৌঁছায়, তাকে আর কোনো মিথ্যার চাকচিক্য স্পর্শ করতে পারে না। চারপাশে অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে—যারা পোশাকে মলিন, সম্পদে দরিদ্র, কিন্তু আত্মসম্মানের প্রশ্নে অটল। তারা কখনো কারো কাছে হাত পাতেনি, কারো কাছ থেকে জোর করে কিছু নেয়নি।
হোক তা ছোট পরিবেশে, তবুও থাকুন সম্মানের আবেশে। বড় পরিবেশে গিয়ে উপেক্ষিত থাকার চেয়ে নিজের ঘরে চুপচাপ থাকা অনেক শ্রেয়। যে মানুষ ক্ষততে আঘাত করে, গোপন ভঙ্গ করে কিংবা দুর্বলতায় খোঁচায়, তার থেকে যোজন যোজন দূরে থাকাই উত্তম। আলিশান বাড়ি, অভিজাত গাড়ি বা জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে অসম্মানের চেয়ে ঘরহীন ঘরে সম্মান বয়েবেড়ানো অনেক কল্যাণকর। কিছু ভোগ না পেলেও, কারো প্রতিশ্রুতি থেকে বঞ্চিত হলেও, আত্মসম্মানের শর্ত থেকে জীবনকে বঞ্চিত করবেন না। জীবন একবারই আসে। যারা স্মরণীয় হয়ে আছেন, তারা অসত্যের সাথে আপোষ করে জীবন বাঁচাতে চাননি; বরং হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে নিজেদের সমর্পণ করেছেন।
গরিব হওয়া লজ্জার নয়, কিন্তু আত্মসম্মান বিকিয়ে ধনী হওয়ার চেষ্টা ভয়ঙ্কর অসম্মানের। দাসত্বের মানসিকতা মানুষের বিনয় নয়, বরং ব্যক্তিত্বের দেউলিয়াত্বেরঘোষণা। পাঁচ টাকায় বিক্রি হওয়ার মতো আচরণ করবেন না। সত্য বলার কারণে যদি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে যদি মরতে হয়, তবে তাও সম্মানের। অর্থ বা সম্পত্তি দিয়ে মানুষের সম্মান মাপা যায় না—এটি হৃদয়ের পরিমাপ, বিবেকের আলো আর সত্যের অঙ্গীকারে নির্ধারিত হয়।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








