সাংবাদিকতা (Journalism) অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পেশা। সাংবাদিক হওয়ার উপায় জানলে দারুণ এই পেশা দিয়ে আপনিও নিজের ক্যারিয়ার উন্নত করতে পারেন। যদিও একজন ভালো মানের সাংবাদিক হতে চাইলে অনেক লেখাপড়া থাকতে হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য ন্যূনতম এইচএসসি পাশ হলেই চলে। একজন অভিজ্ঞ ও সফল সাংবাদিক হতে হলে আপনাকে সৎ, সাহসী এবং নির্ভিক হতে হবে। পাশাপাশি থাকতে হবে সৃজনশীল লেখনি শক্তি। প্রতি দিনের ঘটনাবলী সমন্ধে নিয়মিত ওয়াকিবহল থাকতে হয়। এক জন ভাল সাংবাদিক হতে প্রয়োজন সততা, ধৈর্য, নিয়মিত পড়াশোনা এবং সঠিক উপস্থাপনা। একজন সাংবাদিক মূলত সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, রেডিও, টেলিভিশন ও ওয়েব পোর্টালের জন্য খবর জোগাড় করা, সংবাদ ও কলাম লেখা, সম্পাদনা, পরিমার্জন, পরিবেশন ও ছবি সংগ্রহের কাজ করে থাকেন। আমাদের দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে সাংবাদিকদের কাজের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্র বেশ বড় হওয়ায় অনেকেই নির্দিষ্ট বিভাগে মনোযোগ দেন। যেমন, ক্রীড়া সাংবাদিকরা শুধু খেলাধুলা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করেন। এক জন আদর্শ সাংবাদিকদের বৈশিষ্ট্যঃ অবশ্যই সাংবাদিককে যে বিষয়ে দক্ষ থাকতে হয়। ১) ভাষাগত দক্ষতা, ২) তথ্য অনুসন্ধানে দক্ষতা, ৩) উপস্থাপনার দক্ষতা, ৪) যোগাযোগের দক্ষতা তবে আরো কিছু বিষয়ে তাকে কাজ করতে হবে যেমনঃ ১) সংবাদ সংগ্রহ করা ২) সংবাদের সত্যতা যাচাই করা ৩) সংবাদ সম্পাদনা করা ৪) প্রয়োজনে মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া ৫) বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা ৬) কলাম লেখা ও বাছাই করা ৭) তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করা ৮) প্রয়োজনীয় ছবি/ভিডিও সংগ্রহ করা। এছাড়া সংবেদনশীল খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যদাতার গোপনীয়তা রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। যেহেতু সাধারণ মানুষের জীবনে গণমাধ্যমের সরাসরি প্রভাব রয়েছে, সেহেতু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা একজন সাংবাদিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এছাড়া সংবেদনশীল খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যদাতার গোপনীয়তা রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। প্রত্যেক সাংবাদিককে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা বা গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়তে হবে, এমন কোন কথা নেই। বাংলা, ইংরেজি সাহিত্য, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অন্যান্য বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরাও এ পেশায় নিয়োজিত আছেন। তবে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে আগে থেকেই যারা নির্বাচন করে রাখেন, তাদের জন্য সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াই ভালো। তবে কারিগরি কিছু জ্ঞান থাকলে আপনি অন্য অনেকের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারবেন। যেমন, ফটোশপ বা ইলাস্ট্রেটরের প্রাথমিক ব্যবহার শিখে রাখলে তা কাজে দেবে। এর বাইরে ফেসবুক, টুইটার, লিঙ্কডইন ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াতে যুক্ত থাকলে আপনার কাজ অনেক সহজ হয়ে আসবে। আমার জানা মতে সাংবাদিকতা কিছু নিয়ম বা শর্ত রয়েছে,যেটা অবশ্যই আপনাকে মানতে হবে যেমনঃ ১) নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। ২) সংবাদের সত্যতা যাচাই অবশ্যই করতে হবে। ৩) ভাষা সাবলীল ও পরিশুদ্ধ হতে হবে। ৪) সাধারণ মানুষের সমস্যা বেশি উত্থাপন এবং বিষয়গুলি গুরুত্ব সহ তৈরী করতে হবে। ৫) সর্বদা সত্য উন্মোচন করতে হবে। ৬) ব্যবহার মাধুর্য হতে হবে এবং সংবাদ সংগ্রহের সময় অবশ্যই তথ্য দাতার গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। ৭) যে কোন সংবাদ গুছিয়ে লিখতে ও বলতে হবে । ৮) সরকারী নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। ৯) কোন সমাজ বা জাতিকে কটাক্ষ করা যাবে না। ১০) অনুসন্ধাণী সাংবাদের অবশ্যই কতৃপক্ষ কতৃক এসাইনমেন্ট থাকতে হবে এবং প্রয়েজনে যথাযথ কতৃপক্ষ কে অবহিত করতে হবে। ১১) আপনার পরিবেশন করা সংবাদের দায়ভার আপনারই, তাই খুবই সাবধানে সংবাদ পরিবেশন করুন। একজন সাংবাদিক হিসেবে কপিরাইট বিষয়ক আইনের জ্ঞান থাকা আপনার জন্য জরুরি। সর্বশেষ যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সৃজনশীলতা। তাই নিজেকে প্রতিনিয়ত সৃষ্টিশীল করে তোলার চেষ্টা থাকা চাই। সুযোগ পেলে কোন সংবাদপত্রে ইন্টার্নশিপ করতে পারলে অনেক কিছু শিখতে পারবেন। এছাড়া কাজের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে প্রাধান্য পেতে পারেন চাকরিদাতাদের কাছে। ছোট ছোট অনেক কোর্স আছে অবশ্যই সে গুলি তে প্রশিক্ষন নিতে হবে। আমার জানা মতে , সাংবাদিকতার জন্য সবার প্রথমেই যা দরকার হয়, তাহলে সাহস; সৎ সাহস। আপনি যদি একজন ক্রাইম রিপোর্টার হয়ে থাকেন, তাহলে তথ্য সংগ্রহের জন্য আপনাকে অনেক প্রতিকূলতার সম্মূখীন হতে হবে। কখনো কখনো সরেজমিন তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। আর এসব ক্ষেত্রে অপরাধিদের আক্রোশের শিকার হতে পারেন আপনি।প্রকৃত সত্য তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন মহল হতে ক্রমাগত হুমকি, সময় বিশেষ প্রাণনাশের হুমকিও আসবে। কিন্তু একজন সফল সাংবাদিক হতে হলে এসব হুমকিতে ভয় পেলে চলবে না। তাই আপনার ভেতরে যদি নির্ভিক এবং সৎ সাহস কাজ করে, তবেই আপনি সাংবাদিকতাকে জয় করতে পারবেন। আপনি যদি পেশাদার কোন গণমাধ্যমে কাজ করতে চান, তাহলে প্রতিদিনই আপনাকে নিত্য নতুন প্রতিবেদন লিখতে হবে। কিন্তু আপনার ভেতরে যদি সৃজনশীল লেখনী শক্তি না থাকে, তাহলে প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয়ের ওপর আপনি লিখতে পারবেন না। তাই বিশ্লেষণধর্মী লেখা উপহার দেয়ার জন্য আপনার ভেতরে সৃজনশীল লেখনী শক্তি থাকা অত্যাবশ্যক। ব্লগিং, সংবাদ সংস্থা বা অন্যান্য মিডিয়া আউটলেটের জন্য একজন ফ্রিল্যান্স লেখক হওয়া লেখালেখিতে অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি উপায়। মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে এমন জিনিসগুলো সম্পর্কে লিখুন এবং যে কোনও অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি গল্প খুঁজে পাওয়ার আপনার ক্ষমতা প্রদর্শন করুন। এতে করে আপনি আপনার সিভিতে নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করতে পারবেন। সম্ভাব্যভাবে এটি আপনাকে একটি এন্ট্রি-লেভেলের চাকরি দিতে এবং সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ারের পথে সাহায্য করবে। উপস্থপনা: আপনি যে কেবল প্রিন্ট মিডিয়ায় সাংবাদিকতা করবেন, তাই নয়; চাইল কোন টেলিভিশন চ্যানেলেও কাজ করতে পারেন। টেলিভিশনে কাজ করতে হলে আপনাকে ক্যামেরার সামনে আসতে হবে। আর ক্যামেরার সামনে আসতে হলে আপনার কথা বলার ভঙ্গি, শারীরিক ভাষা এবং শব্দচয়ন অত্যন্ত পরিপাটি হতে হবে। ক্যামেরার সামনে আপনি নিজেকে যতটা সুন্দরভাবে উপস্থপন করতে পারবেন, আপনার প্রতিবেদনটিও ততটা চিত্তাকর্ষক হবে। ফলে আপনার কাজের প্রতিষ্ঠান তথা দর্শকদের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। যোগাযোগ ও সম্পর্ক: সংবাদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের তাগিদে আপনাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষের সাথে যোগাযোগ থাকতে হবে। যেমন প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে। নেটওয়ার্কিং: সম্পাদক, সংবাদ প্রতিবেদক এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথে সংযোগ স্থাপন করুন। একজন পেশাদার সাংবাদিক হওয়ার পথে আপনার কাজ করার সময় এই লোকেরা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং সহায়ক পরামর্শ দিতে পারে। আপনার নেটওয়ার্ক যত বড় হবে, রেফারেন্স হিসেবে আপনার নামটি তত বেশি মনে পড়বে। সেখানে কাজ করতে হলে সাহস, সততা, সংকল্প, নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি—এমন কিছু অপরিহার্য গুণ একজন পেশাদার সাংবাদিকের থাকতে হয়, যা তাকে সামনে এগিয়ে নেয়। তা সেই সাংবাদিক প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, সেই আলোচনায় সবচেয়ে বড় নিয়ামক যে বিষয়গুলো, সেটিই তুলে ধরার চেষ্টা আজ। এই পেশায় ভালো করতে হলে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবস্যায়ের বিকল্প নেই। সব জায়গায় সময়মতো পৌঁছাতে পারার একটা তাড়া থাকে একজন আদর্শ সাংবাদিকের। কাজ শেষ করারও বৈকি। সম্পাদকের ভিন্নমত, সমালোচনা গ্রহণ করার মতো ঋজুতা থাকতে হয় সাংবাদিকের। সীমাবদ্ধতা থেকে শেখা এবং দক্ষতা বাড়ানোর আগ্রহ শেষ পর্যন্ত একজন সাংবাদিককে সফল করে তোলে।তথ্য যাচাই করার জন্য নিজের কাছে সঠিক বিচারও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হলে গল্প সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে ওজন হারায়। এ জন্য কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা অপরিহার্য। একটি গল্পের জন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বের করার কৌশল অবশ্যই জানতে হবে একজন আদর্শ সাংবাদিককে। পেশাদারত্ব এবং আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা সেই সাংবাদিক প্রবীণ অথবা নবীন যেমনই হোন না কেন। সাংবাদিকের অনুসন্ধান হতে হবে উন্মুক্ত ও নিরপেক্ষ। সম্ভাব্য কোনো পক্ষ বা কারা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, কী হবে তার জবাব, সেটি মাথায় রাখলে অনুসন্ধান পায় পূর্ণতা। কখনো কখনো লিড নিউজ পেতে, সংবাদকক্ষে, পেশায়, সমাজে সাড়া ফেলতে মাসের পর মাস ছুটতে হয়। দেখা যায় নির্দিষ্ট একটি গল্পের পেছনে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে আসে নতুন গল্প। কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসে সাপ। সেই প্রাপ্তির আনন্দ পেশাগতভাবে সেই সাংবাদিকই কেবল বোঝে যে এটির দেখা পায়। সাংবাদিকের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্যের সন্ধান করা এবং সব বিষয়ে ন্যায়বিচার খোঁজা। তবে রাষ্ট্র-সমাজ সেই পরিপ্রেক্ষিত সব সময় না-ও রাখতে পারে। কখনো কখনো সাংবাদিক অর্থ এবং খ্যাতির জন্য তাদের নীতি-নৈতিকতা ত্যাগ করেন। কিন্তু এটি ভালো দৃষ্টান্ত তৈরি করে না, এই পেশাকে আস্থাহীন করে তোলে সাধারণ মানুষের কাছে। তাহলে মানুষ সাংবাদিকদের সন্মান করবে এবং রাষ্ট্র সাংবাদিকদের মুল্যয়ন করবে। আমি আশা করি সকলে এই পেশায় ঢুকার আকে ভাববেন আপনি নিকেকে লোভ লালসার উদ্ধে থেকে নিজেকে আদর্শ পেশাদার হিসাবে গড়ে তুলতে পাবেন কি না।