সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দাবিতে নগরের চেরাগী পাহাড় মোড়ে নাগরিক সমাবেশ
চট্টগ্রাম, ২১ আগস্ট: চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক ও প্রকাশক আয়ান শর্মাকে ঘিরে অপপ্রচার, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম নগরের চেরাগী পাহাড় মোড়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মসূচি থেকে সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে সাংবাদিক-ছাত্র-শ্রমিক-জনতার উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, একজন সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো ধরনের চাপ, ভয়ভীতি, হুমকি কিংবা হয়রানির শিকার হলে সেটি শুধু ওই সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের পরিবেশ সরাসরি সম্পৃক্ত।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একটি শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম ও অসঙ্গতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর আয়ান শর্মা এবং চট্টগ্রাম প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল। তৎকালীন মন্ত্রী ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে গণমাধ্যমটির প্রকাশনা বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং আয়ান শর্মাকে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে হুমকি দেওয়া ও একাধিক মামলায় আসামি করে হয়রানির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আয়ান শর্মাকে ঘিরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাকে কেন্দ্র করে আবারও অপপ্রচার, মিথ্যাচার, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ সামনে এসেছে। কখনো বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠনের নাম ব্যবহার করে, আবার কখনো সাংবাদিক কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় সামনে এনে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
কর্মসূচিতে বক্তারা স্পষ্টভাবে বলেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মতের ভিন্নতা কিংবা সংবাদ প্রকাশ নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই বিরোধের সমাধান হতে হবে আইন, তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি কিংবা প্রশাসনিক পরিচয়ের আড়ালে থেকে সাংবাদিককে চাপে রাখার সংস্কৃতি গণমাধ্যমের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সমাজের জন্যও বিপজ্জনক।
সমাবেশে নিম্নলিখিত দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়:
· সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নিরাপদভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা
· সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও হুমকির অভিযোগের প্রতিকার
· হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত
· সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বেআইনি চাপ সৃষ্টি না করা
বক্তারা বলেন, কোনো সাংবাদিকের প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তার বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খোলা রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিককে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো কিংবা হুমকি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হলে সেটি স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের পেশা নয়; এটি সমাজের মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সত্য প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক যাতে প্রতিহিংসা, চাপ কিংবা ভয়ভীতির মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন—চট্টগ্রাম প্রতিদিন-এর সিনিয়র রিপোর্টার জুলহাজ নীল, দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সম্পাদক ও সম্পাদক-প্রকাশক পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল আলম রফিক, দ্য ফিন্যান্স টুডে-এর সম্পাদক ও সম্পাদক-প্রকাশক পরিষদের সদস্য সচিব মতিউর রহমান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট এম এ হাশেম রাজু, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক ইকবাল, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, সনাতনী সংগঠনের কর্ণধার অশোক চক্রবর্তীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সমাবেশ শেষে চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে একটি প্রতিবাদ র্যালি বের করা হয়। আয়োজকরা জানান, আয়ান শর্মাকে ঘিরে যে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর সত্যতা সময়ের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের হুমকি, হয়রানি বা পরিকল্পিত অপপ্রচার গ্রহণযোগ্য নয়।
বক্তারা বলেন, আয়ান শর্মা একা নন—একজন সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই অবস্থান কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়; বরং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার এবং আইনের শাসনের পক্ষে একটি নাগরিক অবস্থান। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, প্রমাণ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক, কিন্তু অপপ্রচার, ভয়ভীতি কিংবা হুমকির মাধ্যমে কোনো সাংবাদিকের কণ্ঠ থামানোর চেষ্টা হলে তার প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে—এই বার্তাই চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড় থেকে উচ্চারিত হলো।









