ইরানের যুদ্ধে ক্ষমতাধর দেশগুলোর কার কী অবস্থান?

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত চতুর্থ দিনে গড়ানোর পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। টানা পাল্টাপাল্টি হামলা, উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মৃত্যুর দাবি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো নিজ নিজ অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছে। কেউ সরাসরি নিন্দা জানিয়েছে, কেউ সতর্ক সমর্থন দিয়েছে, আবার কেউ ভবিষ্যৎ সামরিক জড়িত থাকার ইঙ্গিতও রেখেছে।

সংঘাতের সূচনার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটেছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দাবি অনুযায়ী, তিন দিনের হামলায় দেশটিতে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে অভিযানে তাদের ছয়জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলও নিজেদের কয়েকজন নাগরিক নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এই সংঘাতকে কীভাবে দেখছে?

যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্য শুরুতে স্পষ্ট করে জানায়, তারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সরাসরি জড়িত নয়। প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেন, লন্ডন এই হামলায় অংশ নেবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ‘প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ নিতে পারবে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাইপ্রাসে তাদের একটি আরএএফ ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে সন্দেহভাজন ড্রোন হামলা হয়েছে। যদিও এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবু অঞ্চলজুড়ে ব্রিটিশ বাহিনীর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি ইরানের পাল্টা হামলাকে ‘বাছবিচারহীন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনা ও নাগরিকরা ঝুঁকিতে পড়ছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার মন্তব্য করেন, ইরান যেসব দেশকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, তারা সবাই এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত ছিল না যা তেহরানের ‘বেপরোয়া’ আচরণের ইঙ্গিত বহন করে।

চীনের তীব্র নিন্দা
চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাকে তারা ‘সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, এই হামলা জাতিসংঘ সনদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। বেইজিং সব পক্ষকে সংযত থাকার এবং অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

রাশিয়ার কঠোর প্রতিক্রিয়া
রাশিয়াও একই সুরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনির মৃত্যুকে ‘নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

মস্কো সতর্ক করে বলেছে, এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

জার্মানির সতর্ক অবস্থান
জার্মানি সরাসরি হামলার পক্ষে অবস্থান নেয়নি, তবে ইরানের পাল্টা হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জার্মান রাজনৈতিক ও সামরিক সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, আঞ্চলিক দেশগুলোতে ইরানের আক্রমণ অব্যাহত থাকলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানে যোগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

বার্লিনে সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা যেমন বিমান হামলায় অংশগ্রহণ কিংবা আকাশপথে সহায়তা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে।

ফ্রান্সের সমর্থন ও সতর্কবার্তা
ফ্রান্স খামেনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রকাশ্যে সন্তোষ জানিয়েছে। দেশটির সরকারের মুখপাত্র বলেন, খামেনি ছিলেন একজন ‘দমনমূলক একনায়ক’ এবং তার মৃত্যুকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

তবে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ আগে সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে তা বৈশ্বিক শান্তির জন্য ভয়াবহ হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, মিত্রদেশের অনুরোধ এলে ফ্রান্স নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত থাকবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যদের উদ্বেগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের পথই একমাত্র টেকসই উপায় এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি উত্তেজনা প্রশমনে মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সে লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে তারা সমর্থন দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত থামানো না গেলে তা বিশ্বশান্তির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্ক বলেছেন, যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয় তাই আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

সম্পর্কিত পোস্ট

রিয়াদে হুথিদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

রিয়াদে হুথিদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতিরা। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময়...

ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় সৌদির ২৬ বিমান অভিযান, দাবি হুথিদের

ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় সৌদির ২৬ বিমান অভিযান, দাবি হুথিদের

ইয়েমেনের হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ২৪ ঘণ্টায় ২৬টি বিমান অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এসব অভিযান চালানো হয়...

অপ্রতিমের হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

অপ্রতিমের হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

কুমিল্লা: অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার...

অপ্রতিমের প্রথম জানাজা সম্পন্ন

অপ্রতিমের প্রথম জানাজা সম্পন্ন

কুমিল্লা: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার...

পাবনায় ১০ বছরের শিশু ধর্ষণ-হত্যা: প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতার তাণ্ডব

পাবনায় ১০ বছরের শিশু ধর্ষণ-হত্যা: প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতার তাণ্ডব

পাবনা সদর উপজেলায় ১০ বছর বয়সী শিশু কামরুন্নাহার কলিকে গণধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমাদের বিভাগ সমূহ

সাম্প্রতিক পোস্ট

Recent Comments

    Welcome Back!

    Login to your account below

    Retrieve your password

    Please enter your username or email address to reset your password.