ঈদের চাঁদ উঠেছে ধীরে, রুপালি আলোয় ভাসছে শহর,
তুমি কি জানো, এই আলোয় খুঁজি কেবল তোমারই প্রহর?
রাতের নীলিমায় মিশে গেছে বুকের অব্যক্ত সব ব্যথা,
তুমি ছাড়া ঈদের খুশি যেন কেবলই একলা পথচলা।
নতুন শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে ছিল তোমার ছোঁয়ার আকুলতা,
হাতের মেহেদিতে আজও রয়ে গেছে তোমার নামের চুম্বন-চিহ্ন।
আতরের ঘ্রাণে আজও খুঁজি তোমার গায়ের পরিচিত সুবাস,
তুমি কি জানো, তোমার ছোঁয়া ছাড়া ঈদের সকালও ম্লান হয়ে আসে?
সকালবেলার সূর্য ওঠে, ঈদের দোয়া মেশে বাতাসে,
তবু হৃদয়ের মিনার যেন একলা, নিঃসঙ্গতায় হাসে।
সবাই যখন ঈদের খুশিতে মেতে ওঠে আপন মনে,
আমার ঈদ কাটে শুধু অপেক্ষার অন্ধকার কোণে।
তুমি কি দেখো, ঈদের চাঁদের আলোয় আমার চোখের জল?
তুমি কি শোনো, বাতাসে ভেসে আসে প্রেমের দোলাচল?
তুমি ছাড়া রঙিন চুড়ির শব্দ আজ বড্ড ফাঁকা লাগে,
তোমার ছোঁয়া ছাড়া উৎসবও যেন কান্নার ভাষায় জাগে।
শহরের মোড়ে, পুরনো রাস্তার ধুলোয় এখনো অপেক্ষা জেগে থাকে,
যদি ফিরে আসো, হৃদয় জুড়ে ফুটবে নতুন ঈদের ফাল্গুন-ফুল।
আর যদি না আসো, তবে ঈদের চাঁদও ফিকে হয়ে যাবে,
আমার হৃদয়ের মতোই, নিঃসঙ্গ আলোয় ডুবে যাবে।
(০২)
তুমি আর আমি
-বিচিত্র কুমার
সেই ঈদের চাঁদ কি এখনো তোমার জানালায় আসে?
আমার শহরের আকাশে উঠলেই তোমার নামে ডাকে?
সেই চাঁদ, যে একদিন তোমার কপালে আলো রেখে বলেছিল—
“এত সুন্দর, এত পবিত্র, ঈদের মতো হৃদয়!”
সেই সকাল, যেখানে আতরের সুবাস ছিলো তোমার চুলে,
তুমি সেদিন ওড়নার কোণে রোদ বেঁধে নিয়েছিলে,
আর আমার চোখে রেখে গিয়েছিলে এক মেঘলা ঈদ—
যে ঈদে তুমি ছিলে, অথচ ছুঁতে দাওনি!
আমি অপেক্ষায় ছিলাম ঈদের মাঠে,
তুমি এলে ধবধবে সাদা এক খুশির শরীরে,
চোখে কাজল, ঠোঁটে লাল আবির,
আর হাতে মেহেদির আঁকা আমার প্রথম ভালোবাসা!
তুমি একবার তাকিয়েছিলে—
সে দৃষ্টি ছিলো সেমাইয়ের মতো মিষ্টি,
সে দৃষ্টি ছিলো আতরের মতো অমলিন,
সে দৃষ্টি ছিলো আমার ঈদের সবচেয়ে দামি উপহার।
ঈদের নামাজ শেষে, যখন কোলাকুলির ভিড়,
আমি কি একটু এগিয়ে যেতে পারতাম তোমার দিকে?
তোমার হাত ধরতে পারতাম?
নাকি তুমি লাজুক হেসে আরও দূরে চলে যেতে?
তোমার জানালার নিচে এসে দাঁড়িয়েছিলাম বিকেলে,
হয়তো তুমি জানোনি, কিংবা জেনেও চুপ ছিলে,
সেদিন ঈদের মাঠের ঘাসের মতো সবুজ লাগছিল তোমাকে,
মনে হয়েছিল, ঈদ শুধু এক দিনের নয়—
যদি তুমি থাকো, তবে চিরকাল!
আজ এত বছর পরও, ঈদের চাঁদ উঠলে,
আমি বাতাসে তোমার চুড়ির শব্দ খুঁজি,
আমি সেমাইয়ের সুগন্ধে তোমার হাতের ছোঁয়া খুঁজি,
আমি তাকাই সেই আকাশে, যেখানে একদিন
তুমি আর আমি একই ঈদের চাঁদ দেখেছিলাম—
দূর থেকে, কিন্তু একই হৃদয়ের কাছে!
(০৩)
ঈদের চাঁদ ও তোমার অপেক্ষা
-বিচিত্র কুমার
সে ছিল এক ঈদের রাত,
নরম চাঁদের আলোয় ঢেকে থাকা এক রূপকথার মেঘ।
তোমার অপেক্ষায় সময় থমকে ছিল,
ফুরফুরে বাতাসের ভেতর যেন এক অদৃশ্য গান বাজছিল নীরবে।
ঈদের নতুন পোশাকের ভাঁজে ছিল স্মৃতির উষ্ণতা,
তোমার দেওয়া কাঁচুলিপড়া কাজ করা ওড়না,
যে ওড়না বাতাসের স্পর্শে উড়ে উড়ে বলেছিল—
“তোমার ছোঁয়া ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।”
সন্ধ্যার মিষ্টি আতর মেখে
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বারান্দার রেলিং ধরে,
যেভাবে কিশোরী নদী দাঁড়িয়ে থাকে পূর্ণিমার দিকে,
যেভাবে শিশির জমে অপেক্ষা করে ভোরবেলার রোদ্দুরের জন্য।
ঈদের চাঁদ উঠেছিল ধীর পায়ে,
সেই আলোয় তোমার প্রতিচ্ছবি ধরা পড়েছিল মনের আয়নায়।
সাদা পাঞ্জাবিতে তুমি ছিলে অশ্বত্থ গাছের ছায়া,
যার নিচে দাঁড়ালেই একরাশ শীতলতা মেলে ধরে মন।
গলির মোড়ে তখন শিরনি বিলাচ্ছিল বালকেরা,
আর আমি এক গোপন প্রতীক্ষায় ডুবছিলাম—
তোমার পায়ের শব্দ,
তোমার মৃদু হাসির সেই চিরচেনা সুরে।
তুমি এলে ঠিক সেই মুহূর্তে,
যখন রাতের আকাশে দারুচিনি রঙের বাতাস বইছিল,
তোমার চোখে ছিল ঈদের রঙিন খুশি,
আর আমি দেখেছিলাম আমার পৃথিবীর সমস্ত চাওয়া-পাওয়া
তোমার সেই গভীর দৃষ্টির মাঝে।
আমার হাতে তখন একজোড়া সাদা বেলি ফুল,
তুমি হাত বাড়িয়ে বললে—
“এটা কি আমার জন্য?”
আমি হেসে বললাম—
“ঈদ তো একবারই আসে,
কিন্তু তোমার জন্য অপেক্ষা?
তা তো প্রতিদিনই ঈদের মতো…”
সেই রাতের পর, ঈদ আসে বারবার,
কিন্তু আমার ঈদ আটকে আছে সেই এক রাতেই,
যেখানে তুমি ছিলে,
আর আমি ছিলাম শুধু তোমার অপেক্ষায়।
(০৪)
ঈদের সন্ধ্যায় তোমার অপেক্ষায়
-বিচিত্র কুমার
সে এক ঈদ ছিলো—
চাঁদের আলোয় ঢাকা, মায়াবী রাতের মতো।
তুমি ছিলে রুপালি জোছনার মতো নরম,
আমি ছিলাম কাঠফাটা রোদ্দুরের তৃষ্ণার্ত পথিক।
তখন রঙিন শাড়ির ভাঁজে লুকানো ছিলো বসন্ত,
চুড়ির কাঁচে বেজেছিলো হাজারো আলোর বাজনা।
তুমি ঈদের নতুন জামার সুগন্ধে মাখা
এক চিলতে মেঘের মতো এলেম খসে পড়া বৃষ্টি হয়ে।
আমি অপেক্ষার মেহগনি—
তোমার পায়ের শব্দে দুলে ওঠা।
তুমি এলেই ঈদের চাঁদ পূর্ণ হতো,
তুমি আসলেই আমার অন্ধকার বারান্দা
জোনাকির আলোয় ঝলমল করতো।
কিন্তু সে ঈদ, সে সন্ধ্যা—
অপেক্ষার দোলনায় দুলেছিলো একলা।
তোমার আসার পথে থেমেছিলো বাতাস,
তোমার কণ্ঠস্বর ঝরে পড়েনি জুঁইয়ের মতো।
ঈদের রঙিন আলোর মাঝে আমি খুঁজেছি
তোমার চোখের গভীর সজল জলছাপ।
সেমাইয়ের সুগন্ধ ছড়িয়েছিলো ঘরময়,
কিন্তু সে স্বাদ ছিলো না তোমার হাতের ছোঁয়া।
চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে,
ফেরিওয়ালার মিষ্টি সুরে,
তোমার মুখ ছায়া হয়ে ভেসে উঠতো বারবার।
আর আমি মনে মনে বলতাম—
“তুমি আসবে, না?”
ঈদ চলে গেলো,
তবু সে সন্ধ্যা এখনো থেকে গেছে—
বুকের গহীনে, রুপালি চাঁদের পাশে,
তোমার আসার প্রতীক্ষায়।
নামঃ বিচিত্র কুমার
গ্রামঃ খিহালী পশ্চিম পাড়া
পোস্টঃ আলতাফনগর
থানাঃ দুপচাঁচিয়া
জেলাঃ বগুড়া
দেশঃ বাংলাদেশ









