বাড়ির সবাই ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছিল। সেই ফাঁকে স্ত্রীকে দেখতে শ্বশুরবাড়িতে এসেছিল হাসিবুল। তাকে দেখে বউ অনেক খুশি হয়েছিল।
ভেবেছিল ঈদ তাই হয়তো তার স্বামী তাকে নিতে এসেছে। ছয় মাস আগে স্বামীর সাথে ঝগড়াঝাটির জন্যে স্বামী তাকে বাপের বাড়ি চলে আসতে বলেছিল।
বউ এমি আক্তার ভেবেছিল তাদের ছোট বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো সব ঠিকঠাক করতে এসেছে তার স্বামী হাসিবুল।
এটা ভেবে সে অনেক খুশি হয়েছিল। স্বামীকে কি কি খাওয়ানো যায় তার জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে সে।
নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় হাসিবুলকেও তার স্ত্রী বলছিল নামাজে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু সে জানায় একটু পর যাবে তাই বউ আর কিছু বলেনি।
হাসিবুলের শ্বশুরবাড়ি একই এলাকায় ছিল। কুরবানির জামাত তাড়াতাড়ি হওয়ায় হাসিবুলের বাবা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল – একসাথে নামাজে যাবে কি-না?
সে বলেছিল- বউয়ের সাথে একটু দেখা করে তারপর আসতেছি। তোমরা যাও।
পরে হাসিবুলের বাপ-ভাই দুজনেই নামাজে চলে যায়। সে চলে আসে শ্বশুরবাড়িতে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও তখন নামাজ পড়তে গিয়েছে।
এইদিকে নামাজে যেতে দেরি হওয়ায় তার বউও বারবার তাগাদা দিচ্ছিল নামাজে যেতে। কিন্তু হাসিবুল বারবার বলছিল যাব, যাব। কিন্তু যাচ্ছিল আর না।
হাসিবুল প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে পূর্বের সব কথা তুলতে থাকে।
বউ বুঝতে পারে না আগেকার কথা কেন এখন আগে তোলা হচ্ছে। তারপর আগেকার সব ঝগড়ার বিষয়গুলো তোলার পর দুজনের মধ্যে কথা কথা কাটাকাটি হয়।
তারপর সেটা রূপ নেয় ঝগড়ায়। বাড়ির লোকজনও সে ঝগড়াঝাটির আওয়াজগুলো শুনছিল।
তারা ভেবেছিল অন্যান্য দিনের মতোই হয়তো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে তাই কেউ আর আসেনি। তাছাড়া প্রতিবেশীরাও ঈদের ব্যস্ততার মধ্যে ছিল।
হাসিবুলের সাথে বউয়ের কথা কাটাকাটির পরিমাণ বাড়তে থাকে। হাসিবুলও চেয়েছিল এটাই যাতে একটা উসিলা পাওয়া যায় শরীরে রাগ উঠানোর জন্যে।
সাথে এটাও বারবার দেখছিল বাড়ির সবাই নামাজে গিয়েছে কি-না।
কিন্তু এমি বুঝতে পারছিল না তার স্বামী আগেকার কথাগুলো তুলে ঝগড়া বাঁধাচ্ছে। অথচ এমি তার স্বামীর সাথে আবার শ্বশুরবাড়িতে যাবে এটা ভেবে এতক্ষণ খুশি হয়েছিল।
অন্তত ঈদের দিনে স্বামীকে এসব বাদ দিতে বলে এবং হাসিবুলকে নামাজ পড়ে এসে একসাথে খেতে বলে এমি।
কিন্তু হাসিবুল এবারে রেগে গিয়ে হাতাহাতি শুরু করে। দু’জনের মধ্যে ধ্বস্তাধস্তির মতো হয় এবং হাসিবুল পূর্বের প্ল্যান অনুযায়ী লুকিয়ে রাখা ছুড়িটা বের করে হাতে নেয়।
তারপর হাসিবুল বউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে পিঠে সজোরে একটা কোপ দেয়। তীব্র আঘাতে বউ জোরে চিৎকার করে।
এবারে হাসিবুল বউয়ের মুখটা চেপে ধরে। হাসিবুলের হাতে ছুড়ি দেখে তার বউ আরও ভয় পায়। হাসিবুল এবারে মুখটা চেপে ধরে তাৎক্ষণিক গলায় ছুড়ি চালায়।
বউটা বাঁধা দিতে চেয়েছিল কিন্তু স্বামীর শক্তির সাথে পেরে উঠে না। ধরালো ছুরির পোচে গলার শিরা উপশিরাগুলো কেটে যায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে।
তারপর সে তার নিজ বউকেই ধারালো ছুরি দিয়ে জ*বাই করে। ঘটনাটা খুব কৌশলে এত অল্প সময়ের মধ্যে ঘটায় যে আশপাশের কেউ বুঝেই উঠতে না পারে।
কিছুক্ষণ হাত পা ছোড়াছুড়ি করে বউটা যখন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল তখন হাসিবুল লোকজনের আওয়াজ টের পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
বাড়ির লোকজন এবং প্রতিবেশীরা এমির চিৎকার শুনেই এসেছিল। তারা ভেবেছিল অন্যান্য দিনের মতোই ঝগড়াঝাটি হয়েছে তাই আর মাথা ঘামায়নি।
কিন্তু ঈদের দিনেও কেন ঝগড়াঝাটি হচ্ছে সেটা দেখতেই তারা এসেছিল। এসে তারা আশ্চর্য হয়ে যায়।
দেখতে পায় বউটা পড়ে আছে। তার গলা দিয়ে অনবরত ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে।
তারা চিল্লাচিল্লি শুরু করে এবং লোকজন জড়ো করতে থাকে। উপস্থিত কয়েকজন চেক করতে থাকে দম আছে কি-না।
তারা দেখতে পায় বউটার হাত-পা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। মানে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং গলার শিরা কাটায় সেখানেই মারা গিয়েছে।
তারা তাৎক্ষণিকভাবেই বুঝতে পারে এটা তার স্বামী হাসিবুলের কাজ।
তাই তাৎক্ষণিক উপজেলা পুলিশকে কল করে। ঘটনাটা লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার কুচলিবাড়ি ইউনিয়নের।
তারপর লালমনিরহাট থানার পুলিশ ফোর্স এসে ঘটনার আলামত সংগ্রহ করে এবং হাসিবুলকে না পেয়ে তার বাপ এবং ভাইকে গ্রেফতার করে।
তাদেরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর থানার অফিসার ইনচার্জের কাছে ঘটনার কিছু বিবরণও দেয় তারা।
পাড়া প্রতিবেশীদের মতে- এর আগেও তাদের মধ্যে প্রচুর ঝগড়াঝাটি হতো। কিন্তু এমন কিছু ঘটবে সেটা তারা কল্পনাতেও ভাবেনি।
বাবা-মায়ের পর স্বামীই একটা মেয়ের জন্যে সবচেয়ে ভরসার জায়গা। আগের সব ঝগড়াঝাটি ভুলে গিয়ে ঈদের দিনে হাসিবুল তার বউ এবং বাচ্চাকে নিয়ে একসাথে সেমাই খাবে তারপর বাড়িতে নিয়ে যাবে হয়তো এমনটাই ভেবেছিল বউ এমি আক্তার।
কিন্তু সেসবের কিছুই হয়নি।
হাসিবুল বউটাকে আগে মারতোও। কিন্তু বউটা চেয়েছিল সংসারটা টিকিয়ে রাখতে। তাই মাটি কামড়ে থাকতে চেয়েছিল স্বামীর সাথে।
ভেবেছিল বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো তার স্বামী ঠিক হবে, তাদের সংসারটা বাকি আট-দশটা সংসারের মতো সুখের হবে।
কিন্তু মেয়েটার সে স্বপ্নটাই তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ালো। ঈদের মতো উৎসমুখর একটা দিনে নিজ স্বামীর হাতে নির্মমভাবে জবাই হতে হলো অসহায় মেয়েটার।
সংগৃহীত
Post Views: 164
Related