সম্প্রতি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য ড. নুরুল ইসলাম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও গবেষণা নিয়ে একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে উঠে আসা তাঁর বক্তব্যটি ছিল এমন— “বিশ্ববিদ্যালয় পড়ানোর মতো যে চিন্তা-চেতনা ও রিসার্চ দরকার তা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অফিসারদের মধ্যে নেই।” একজন দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত শিক্ষাবিদের কাছ থেকে প্রশাসনিক বা শিক্ষাগত কাঠামোর অংশীদারদের সম্পর্কে এমন একপেশে মন্তব্য শিক্ষা সচেতন মহলকে গভীরভাবে ব্যথিত ও আলোড়িত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি বিশেষ গোষ্ঠী শিক্ষা ক্যাডারের অবদানকে খাটো করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অন্যতম একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আসীন ব্যক্তি যখন সেই একই ধারার সমালোচকদের সুরে সুর মেলান, তখন সেই বক্তব্যের পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে কিনা—এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
নিয়োগ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন: ঢাকা শহরের ঐতিহ্যবাহী সাতটি সরকারি কলেজকে সমন্বয় করে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পদক্ষেপ। স্বাভাবিক নিয়মেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু সরকারি কলেজের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যেসব বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করে আসছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে নতুন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ বা নিয়োগের ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় কি এ ধরনের প্রতিক্রিয়া? নিজেদের মতো করে লোকবল নিয়োগ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ না থাকা বা আর্থিক প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাওয়ার কারণেই কি ক্যাডার কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতাকে নিশানা করা হচ্ছে? নীতি ও প্রথার বাইরে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্তের সুযোগ কমে যাওয়ায় এ ধরনের মন্তব্য এসে থাকতে পারে—এমন সন্দেহ অমূলক নয়।
শিক্ষা খাতে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা ও প্রশাসনিক প্রভাব: উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের হাজার হাজার কর্মকর্তা দিনরাত নিরলসভাবে মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশের সরকারি কলেজগুলোতে পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন। যখন কোনো দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিত্ব পুরো একটি ঐতিহ্যবাহী ক্যাডার সার্ভিসকে গণহারে ‘গবেষণাহীন’ ও ‘চিন্তা-চেতনাহীন’ বলে চিহ্নিত করেন, তখন তা কর্মকর্তা ও শিক্ষক সমাজের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
শিক্ষা খাতে এ ধরনের ভিত্তিহীন মন্তব্য অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। জাতীয় পর্যায়ে যেখানে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার, সেখানে শিক্ষক সমাজকে ক্ষুব্ধ করার এই প্রয়াস সরকারের শিক্ষানীতি ও স্থিতিশীলতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে। দেশের শিক্ষা খাতের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে তার দায়ভার কার ওপর বর্তাবে? উপাচার্যের এই জাতীয় দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য শিক্ষা পরিবেশকে ঘোলাটে করার কোনো গোপন ষড়যন্ত্র বা দূরভিসন্ধির অংশ কিনা—তাও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের মেধা ও গবেষণার বাস্তবচিত্র: একক কোনো প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে এত বিপুল সংখ্যক উচ্চতর ডিগ্রিধারী (এমফিল ও পিএইচডি) কর্মকর্তার সমাহার আর কোথাও নেই, যা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে বিদ্যমান। দেশে ও বিদেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করে দেশের হাজার হাজার শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা প্রসারে কিংবদন্তিতুল্য ভূমিকা পালন করছেন।
পিএসসি (পাবলিক সার্ভিস কমিশন)-র অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত এসব মেধাবী সদস্য উচ্চতর গবেষণা, জার্নাল প্রকাশনা ও দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনায় অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। স্নাতকোত্তর ও সম্মান শ্রেণির হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠদান ও তাঁদের গবেষণায় দিকনির্দেশনা দিয়ে যাঁরা গড়ে তুলছেন, তাঁদের এক কথায় “বিশ্ববিদ্যালয় পড়ানোর অনুপযুক্ত” হিসেবে আখ্যায়িত করা বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চরম পরিপন্থী।
গঠনমূলক সমালোচনা সবসময়ই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট সার্ভিসকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খাটো করা কিংবা পূর্বধারণাবশত ঢালাও মন্তব্য করা কখনো একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছ থেকে কাম্য হতে পারে না। শালীনতা ও যুক্তির পরিমণ্ডলে থেকে বলা যায়—কাজের স্বচ্ছতা, মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং শিক্ষাঙ্গনে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই হওয়া উচিত একজন উপাচার্যের মূল ব্রত। ব্যক্তিগত অপছন্দ বা প্রশাসনিক ক্ষমতার বলয় বিস্তারের অপচেষ্টায় বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের মতো ঐতিহ্যবাহী মেধাবী সমাজকে অবমূল্যায়ন করার নীতি বন্ধ হওয়া জরুরি। দেশ ও সরকারের স্বার্থেই শিক্ষা খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সুস্থ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা)
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।









