হামের সংকট: উপাত্তের নির্ভুলতা ও জবাবদিহিতাই হতে পারে সমাধান সাজিদ বিন বশির, স্টাফ রিপোর্টার (ঢাকা)
বাংলাদেশে হামের একটি মারাত্মক ও ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাবে ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৮৪ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, যা একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটকে নির্দেশ করে। দেশটিতে ঐতিহাসিকভাবে ৯৯% টিকাদানের কাভারেজ বজায় রাখার সরকারি দাবি সত্ত্বেও, মাঠপর্যায়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকৃত ভ্যাকসিনের কাভারেজ আশঙ্কাজনকভাবে নেমে এসেছে মাত্র ৫৬–৬০%-এ। এই কাঠামোগত ব্যর্থতা প্রায় ৪৬ লাখ শিশু ও নবজাতককে একটি চরম সংক্রামক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG 3.2) অর্জনের পথকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে এবং একই সাথে চলমান বন্যা, ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু সংকটের মধ্যে সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতকে একটি মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সংকটের মাত্রা ও রোগতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট (Epidemiological Context)
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য এবং আন্তর্জাতিক মনিটরিং মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশ এই দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত হাম ও হামজনিত জটিলতায় মোট ৭৮৪ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫টি কেস ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং আঞ্চলিক হাসপাতালগুলোতে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
রোগতত্ত্বের (Epidemiology) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, হাম হলো মানব ইতিহাসের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাস, যার মৌলিক প্রজনন সংখ্যা বা বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর ($R_0$) ১২ থেকে ১৮ এর মধ্যে প্রাক্কলন করা হয়। এর অর্থ হলো, টিকাহীন একটি জনসমষ্টিতে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। এই ভাইরাসের সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে এবং কার্যকর ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (Herd Immunity) অর্জন করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গাইডলাইন অনুযায়ী হাম-রুবেলা (MR) টিকার দুই ডোজের কাভারেজ ন্যূনতম ৯৫% টিকিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। এই লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় একটি সহজে প্রতিরোধযোগ্য রোগ আজ শিশুমৃত্যুর বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারণী ১: টিকার কাভারেজ সংক্রান্ত অমিল ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব সূচক (২০২৫-২০২৬)
|
সূচক |
সরকারি / ঐতিহাসিক লক্ষ্যমাত্রা |
বর্তমান মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা |
|
MR ভ্যাকসিনের কাভারেজ (১ম ও ২য় ডোজ) |
৮৬% – ১০০% (ঐতিহাসিক) |
৫৬% – ৬০% (২০২৫) |
|
টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা |
নগণ্য (<১%) |
৪৬ লাখ শিশু |
|
নথিভুক্ত প্রাণহানি (মার্চ ২০২৬ থেকে) |
০ (নির্মূলের পথ) |
৭৮৪ জন শিশু |
হামের পুনরুত্থানের মূল কারণসমূহ
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান মহামারীটি কেবল কোনো ক্লিনিক্যাল ব্যর্থতা নয়, বরং রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং কাঠামোগত বিপর্যয়ের একটি যৌথ ফলাফল:
-
পরিসংখ্যানগত অমিল এবং নীতিগত জড়তা: বছরের পর বছর ধরে সরকারি প্রতিবেদনে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) কাভারেজ প্রায় ৯৯% বলে দাবি করা হচ্ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখায়। নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচির সংখ্যার সাথে প্রকৃত হাম-রুবেলা টিকার ডেটা তুলনা করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেখতে পান যে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু টিকাদান থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়ে গেছে। এই পরিসংখ্যানগত অমিলের কারণে সময়মতো কোনো সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
-
দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বারবার ব্যাহত হয়।
-
গণটিকাদান কর্মসূচি স্থগিত হওয়া: বিশ্বব্যাপী অনুসৃত নিয়ম অনুযায়ী, নিয়মিত টিকাদানে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষায় প্রতি চার বছর পর পর একটি বড় আকারের হাম-রুবেলা (MR) গণটিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সর্বশেষ এমন কর্মসূচি হয়েছিল ২০২০ সালে। ২০২৪ সালে যে ক্যাম্পেইনটি হওয়ার কথা ছিল, তা প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়।
-
টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: ভ্যাকসিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র পদ্ধতি (Open International Competitive Bidding) চালু করার কারণে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা মাঠপর্যায়ের জেলা ও উপজেলা ক্লিনিকগুলোতে ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট (Stockout) তৈরি করে, যা ঠিক এমন এক সময়ে ঘটে যখন শিশুদের প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছিল।
জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ও বহুমাত্রিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি
এই প্রাদুর্ভাবের প্রভাব কেবল হামজনিত মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউনিয়ন ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্তরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নজরদারি দুর্বল হওয়ায় রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব হচ্ছে। ফলস্বরূপ, অনেক পরিবার শিশুর অবস্থা গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে যান না, যার ফলে তীব্র নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া বা মস্তিস্কের প্রদাহের (Encephalitis) মতো জটিলতা তৈরি হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তাছাড়া, এই সংকট দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য কাঠামোর ওপর একটি বিশাল চাপ তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশটিতে ব্যাপক বন্যার কারণে কলেরা ও আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, যার সাথে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গুর মৌসুমী হুমকি। এমন পরিস্থিতিতে হামের এই তীব্র সংক্রমণ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ও আইসিইউ (ICU) রিসোর্সের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, এই বিপর্যয় জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG Target 3.2)-র প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে অনূর্ধ্ব-৫ শিশুমৃত্যুর হার শেষ করার কথা বলে। টিকার বাইরে থাকা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কারণে পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে হাম নির্মূলের যে টাইমলাইন ছিল, তা স্থায়ীভাবে পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
সংকট উত্তরণে কৌশলগত সুপারিশমালা
একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক বিপর্যয় এড়াতে বাংলাদেশ সরকারকে অতি দ্রুত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং গ্যাভি (Gavi)-র মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সমন্বয় করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জরুরি হস্তক্ষেপ কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে:
I. দ্রুত উপাত্তের সমন্বয় ও জরুরি ‘ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইন
রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার পরিসংখ্যানের অমিল স্বীকার করে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত শূন্যস্থানগুলো চিহ্নিত করতে হবে। টিকার বাইরে থাকা ৪৬ লাখ শিশুকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুঁজে বের করে একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রামের আওতায় এনে জরুরিভিত্তিতে টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
II. দুর্গম অঞ্চলের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স
পার্বত্যাঞ্চল (CHT), চরাঞ্চল, বিচ্ছিন্ন চা বাগান এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ভ্রাম্যমাণ টিকাদান দল (Mobile Immunization Units) মোতায়েন করতে হবে।
III. চিকিৎসাসেবা ও নজরদারি জোরদার
মৃত্যুহার তাৎক্ষণিকভাবে কমিয়ে আনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোটোকল অনুযায়ী সমস্ত আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন শিশুকে জরুরিভিত্তিতে উচ্চ-মাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করতে হবে। একই সাথে ইউনিয়ন পর্যায়ে রোগ নজরদারি (Surveillance) ও দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
IV. প্রাতিষ্ঠানিক টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া সংস্কার
টিকা সংগ্রহ এবং লজিস্টিক সাপ্লাই চেইনকে দেশের যেকোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন রাখতে হবে। ভবিষ্যতে যেন প্রশাসনিক পালাবদলের কারণে জাতীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিনের কোনো সংকট বা স্থবিরতা তৈরি না হয়, সেজন্য স্থায়ী বাফার স্টক এবং বিশেষ জরুরি ক্রয় ধারা প্রবর্তন করতে হবে।








