একজন আপু লিখেছেন :————
একবার ভারতে গিয়েছিলাম তাজমহল দেখতে। সেখানে কয়েকজন ভারতীয়র সঙ্গে পরিচয় হলো। গল্প করতে করতে একসময় আমি প্রশ্ন করলাম—
“আপনারা সীমান্তে আমাদের মানুষদের এভাবে গুলি করে হত্যা করেন কেন?”
তাদের একজন শান্তভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি ভারতে এসেছেন কীভাবে?”
আমি বললাম,
“ট্রেনে করে এসেছি। ফেরার সময় বিমানে যাব।”
তিনি আবার প্রশ্ন করলেন,
“আপনার কোনো সমস্যা হয়েছে? কেউ বাধা দিয়েছে? কেউ গুলি করার চেষ্টা করেছে?”
আমি বললাম,
“না, কারণ আমার বৈধ ভিসা আছে।” বরং নামার পরে আমাকে অভিনন্দন স্বাগতম জানিয়েছে।
তখন তিনি হালকা হেসে বললেন,
“আপনার কথার মধ্যেই তো উত্তর আছে। আপনি বৈধভাবে এসেছেন, তাই আপনি আমাদের অতিথি। কিন্তু কেউ যদি অবৈধভাবে কাঁটাতার পেরিয়ে, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করতে আসে—তাহলে সেটা তো আর স্বাভাবিক প্রবেশ না। তাহলে ভিসা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কেন?”
তার কথার পর কিছুক্ষণ আমি চুপ হয়ে ছিলাম। কারণ আবেগ দিয়ে অনেক কিছু বলা যায়, কিন্তু বাস্তবতার কিছু কঠিন দিকও আছে।
কয়েকদিন আগেও সীমান্তে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। মৃত্যু অবশ্যই দুঃখজনক। কোনো মানুষের জীবনই এভাবে শেষ হওয়া উচিত না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারা সেখানে কেন গিয়েছিল? কেন বৈধ রাস্তা ছেড়ে অবৈধ পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা খুব কমই খুঁজি।
আমি বারবার একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি—
বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে ভারত সীমান্ত পার হতে গিয়ে বেশি বিপদে পড়ে। কিন্তু ভারতীয়রা কেন একইভাবে এপারে এসে মারা পড়ে না? অসংখ্য ভারতীয় ঘোরাঘুরি করে। তারা কি এভাবে এসেছে? না তারা বৈধ পথে এসেছে ঘোরাঘুরি করে আবার চলে যায়। এইতো কয়দিন আগে কক্সবাজারে গিয়েছিলাম ওখানে অসংখ্য ভারতীয়র সাথে পরিচয়।
কারণ তারা সাধারণত বৈধ পথ ব্যবহার করে।
তাই আবেগ দিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলার থেকে আগে প্রশ্ন করতে হবে আমাদের দেশের লোকজন কেন সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে কেন ভারতীয়রা গুদি বিদ্ধ হচ্ছে না?
এই প্রশ্নের ভিতরে সকল উত্তর লুকিয়ে আছে।
বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর প্রায় সব দেশই সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও কোনো রাষ্ট্র তার সীমান্ত রক্ষা করার অধিকার রাখে। এজন্য সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াকে অনেক দেশ নিজেদের নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই দেখে। আবেগ দিয়ে এটা পছন্দ না-ও হতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা অনেক সময় মানবিক অনুভূতির চেয়েও কঠিন হয়।
আমেরিকা সীমান্তে দেয়াল তোলে, ইউরোপ কাঁটাতার বসায়, বিভিন্ন দেশ সীমান্তে সেনা মোতায়েন রাখে। আর ভাগ্য ভালো বাংলাদেশ চীনের প্রতিবেশী না। চীনের সঙ্গে সীমান্ত হলে হয়তো এদিকেও আরেকটা নতুন “গ্রেট ওয়াল” উঠে যেত!
আমরা অনেক সময় অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়াকে সাহসিকতা ভাবি। কিন্তু সত্যি হলো—বৈধ পথ থাকতে রাতের আঁধারে কাঁটাতারের নিচ দিয়ে যাওয়া কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ না।
মানবিকতা অবশ্যই দরকার। সীমান্তে মৃত্যু কখনো আনন্দের বিষয় হতে পারে না। কিন্তু দায়িত্ববোধও দরকার। কারণ একজন মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত শুধু তার নিজের জীবনই না, পুরো পরিবারের কান্নার কারণ হয়ে যায়।
সীমান্তে লাশ নয়, বৈধ যাতায়াত, সম্মান আর সচেতনতা বাড়ুক—এই প্রত্যাশা রইলো।








