পৈতৃক সম্পত্তির মতো বিলিয়ে দিচ্ছেন বনভূমি
রক্ষণ নয়, ভক্ষণই লক্ষ্য-বন গিলে খাচ্ছে ‘রাজা’ কুদ্দুস
এসিএফ রেঞ্জ কর্মকর্তার পকেটেই বনের ভবিষ্যৎ
নিজস্ব প্রতিবেদক
#এসিএফ রেঞ্জ কর্মকর্তার মদদে বনের রাজা কুদ্দুস
#মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান দখলের হিড়িক
#বন বিভাগের কর্মকর্তার ইন্ধনে বনভূমি উজাড়
#রেঞ্জ কর্মকর্তার হাতেই প্লট বাণিজ্যের বিস্তার
#নির্মাণের অনুমতি নিতে ঘরপ্রতি ১ লাখ টাকা
#প্রতিবাদকারীরা বনখেকোদের নির্যাতনে
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী-ডুলাহাজারা অংশে বিদ্যমান মেধা কচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান। এ উদ্যানের সরকারি নথি অনুযায়ী জমির পরিমাণ ৩৯৫.৯২ হেক্টর। সরকারি বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও জলাধার সংরক্ষণ করতে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বন। এখানকার শতবর্ষী মাদারট্রি থেকে বীজ সংগ্রহ করে গর্জন চারা সৃজন করে যুগ যুগ ধরে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে। ২০০৮ সালের ৮ আগস্ট এ অঞ্চলকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শতবর্ষী রাইজোফোরা-এপিকুলাটা রক্ষা করা। কিন্তু বন বিভাগের উদাসীনতা, খামখেয়ালী আচরণ, লোভ-লালসা ইত্যাদি কারণে এ জাতীয় উদ্যান অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান ও তার সহকর্মীরা এসব সরকারি জমিকে তাদের ‘বাপ-দাদার’ সম্পত্তি বানিয়ে কৌশলে বনভূমিতে বসতি স্থাপনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতা দিচ্ছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।

ঘন বনজঙ্গল, লেক, প্রাকৃতিক জলাধার, বিচিত্র প্রাণী, হাতির আসা-যাওয়া, পাহাড়, টিলা,সমতলভূমি ও প্রাণপ্রকৃতির আধার এই উদ্যান কিভাবে হাতছাড়া হচ্ছে- প্রথমে লবণ, তুইতা দিয়ে বনখেকোরা শতবর্ষী মাদারট্রি গর্জন গাছের মৃত্যু নিশ্চিত করে। তারপর জমি খালি হলে সেখানে অস্থায়ী বাসা তৈরি করায়। অবস্থা বুঝে সেখানে গড়ে ওঠে বহুতল ভবন। দখল চলে মসজিদ, স্কুল ও মাদ্রাসার নামে। পোলট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, দোকানপাট ও বাজার- সবই এ মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনের ভেতরে। যা ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। গড়ে উঠছে বিশাল জনপদ। এ কাজে পাকা খেলোয়াড় স্থানীয় কতিপয় জনপ্রতিনিধি, কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, হেডম্যান, ভিলেজার মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
তারা বনবিভাগের অসাধু কর্মকর্তা বনের রাজা রেঞ্জার কুদ্দুসকে ম্যানেজ করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বনের জমি করে নিচ্ছে নিজের নামে। এসব জমিতে প্রথমে অসহায়, হতদরিদ্র ও রোহিঙ্গাদের দিয়ে ছোট ঝুপড়ি বাসা তৈরি করে অস্থায়ীভাবে থাকতে দেয় কিছুদিন। দখল নিশ্চিত হলে বছর পেরোনোর আগেই গড়ে ওঠে স্থাপনা। অতীতে বনভূমির দখল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্ত কুদ্দুস আসার পর থেকে প্রকাশ্যে দরদাম ঠিক করে কার ভাগ কত হবে- একেবারে অংক কষে বনভূমির দখল দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জনের কাছে।
এ দৃশ্য দেখে সচেতন মহলের অনেকেরই মন্তব্য করে বলেন- এবার আর মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের অস্তিত্ব থাকবে না। ইতিমধ্যে ৮০ হেক্টরের মতো এলাকা বন বিভাগের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এই বন সাম্রাজ্যের অধিপতি রেঞ্জার কুদ্দুসের নেতৃত্বে।
স্থানীয় খুটাখালী সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক আবদুস শুকুর দৈনিক ‘মেহেদী’ কে বলেন- ‘মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনভূমি প্রকাশ্যে বেচাবিক্রি করছেন রেঞ্জ ও বনবিট কর্মকর্তা মিলে।’ বন উজাড় করে প্লট তৈরি, বিক্রি এবং স্থাপনা নির্মাণে এলাকায় এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
আরও অভিযোগ রয়েছে- বনভূমি দখল ও বিক্রির বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করেছেন, আজ তারাই উল্টো মামলা, হামলা ও নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের ইন্ধনেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যায়। বন রক্ষায় সহযোগিতা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের হাতে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পাহাড় কাটা, বৃক্ষনিধন এবং মাটি-বালু উত্তোলনকারীদের সঙ্গে ওই বন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। দেশের অন্যতম মাদারট্রি গর্জন বাগান এভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন পরিবেশবাদীরা।
অভিযোগ করতে গিয়ে হামলার শিকার গত মার্চ মাসের ৯ তারিখ স্থানীয় এক ব্যক্তি বন ও বনভূমি রক্ষার উদ্দেশ্যে স্বপ্রণোদিত হয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের কাছে অভিযোগ করেন। পরে রেঞ্জ ও বনবিট কর্মকর্তা তাকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় উদ্যান মেধাকচ্ছপিয়ায় ঘটনাস্থলে যান।অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী- অভিযুক্ত দখলকারীদের সামনে তাকে হাজির করা হয় এবং পরবর্তীতে ওই দখলকারীরা রেঞ্জ কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই তাকে মারধর করে গুরুতর আহত করে। এ সময় রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুস রহস্যজনকভাবে নীরব ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে সাংবাদিকরা রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে তিনি প্রথমে নিজেকে সাধারণ বনকর্মী পরিচয় দেন। পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং অশালীন ভাষায় চড়াও হন বলে প্রতিবেদকের দাবি।
তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মারুফ হোসেনকে জানানো হয়। পরদিন বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে বিস্তারিত অবহিত করা হলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিতের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পূর্বের দায়িত্বকাল নিয়েও অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সূত্রে জানা যায়- রামুর বাঘখালী রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে কুদ্দুসের বিরুদ্ধে বনভূমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ ছিল বলেও দাবি করেন এলাকাবাসী। এদের মধ্যে রয়েছেন খুটাখালীর স্থানীয় আবদুর রহমান, নিয়াজ ভুট্টো, বেলাল উদ্দীন, জাহাঙ্গীর আলম, আরমান, কবির হোসেন, শাহনেওয়াজসহ আরো অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের এক কর্মচারী জানান- রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান ও বনবিট কর্মকর্তা রিপন কিছু দুর্নীতিবাজ ভিলেজারের মাধ্যমে ১ থেকে ২ লাখ টাকা নিয়ে বনভূমিতে বসতঘর নির্মাণের মৌখিক অনুমতি দিয়েছেন।তাদের দাবি- ইতোমধ্যে মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বন উজাড় হয়ে গেছে।
‘চা-পানির খরচ’ নামে বনভূমি দান একজন হেডম্যান বলেন- লাখ লাখ টাকার লেনদেন সত্য নয়, তবে ‘চা-পানির খরচ’ নামে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বনভূমি দখলে সহায়তার অভিযোগ থাকতে পারে।
স্থানীয়দের মতে- রাতারাতি মাদারট্রি কর্তন করে এলাকার ফাঁকে ফাঁকে কয়েকশ’ নতুন ঘর তৈরি হয়েছে। এলাকায় এখন প্রতিযোগিতা চলছে- কে কত গাছ কাটতে পারে এবং কত জমি দখল করতে পারে।
এছাড়াও রোহিঙ্গাদের টার্গেট করার অভিযোগ রয়েছে- নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে বনভূমির ভেতরে বসতি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। বনভূমিতে বসবাসকারী এক রোহিঙ্গা নাগরিক হারেসের স্ত্রীও এমন অভিযোগ
করেছেন- যার ভিডিও প্রমাণ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী- একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র আগ্রহীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে জায়গা নির্ধারণ করে দেয়। রেঞ্জ কর্মকর্তার মৌখিক অনুমতি এবং বনবিট কর্মকর্তার নীরব সমর্থন ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম সম্ভব নয় বলেও দাবি তাদের। বর্তমানে অন্তত ১০-১২টি পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা এবং শতাধিক কাঁচাঘর নির্মাণাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
টহল শিথিলতার অভিযোগস্থানীয়দের অভিযোগ- বন বিভাগের নিয়মিত টহল কার্যক্রমে শিথিলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দখলকারীদের আগাম সতর্ক করে দেওয়া হয়, ফলে নির্বিঘ্নে নির্মাণকাজ চলছে। এতে বন সংরক্ষণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযুক্ত বনবিট কর্মকর্তা রিপন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন- ‘কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি। একটি চক্র আমার নাম ব্যবহার করে এসব করছে।’ তিনি অবৈধ বসতি নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার পরপরই আবু তাহের নামে এক ব্যক্তি প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন।
বন বিভাগ নীরব?
বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজার উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মারুফ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কার্যকর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন- এভাবে সংরক্ষিত বনভূমি দখল অব্যাহত থাকলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি
মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাতও বাড়বে। অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি স্থানীয় সচেতন মহল অবৈধ বসতি উচ্ছেদ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পুরো মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
এলাকাবাসীর মতে, বিতর্কিত রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান দায়িত্বে থাকার কারণে বনকর্মী, দখলদার ও মধ্যস্বত্বভোগী দালাল সিন্ডিকেটের যোগসাজশে বনাঞ্চল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এসব বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের দাবি- জবরদখলকারী ও বন ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে, মামলা দেওয়া হচ্ছে এবং শিগগিরই উচ্ছেদে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তবে স্থানীয়দের ভাষ্য- আগে বনভূমি দখল ও গাছ কাটা হলেও মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান কখনো এত ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
Post Views: 94
Related