রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি: জলবায়ুর প্রভাবের কারণে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের অনেক মানুষ জীবন জীবিকায় পরিবর্তন করেছে। নদ-নদীর পানি শুকিয়ে দিন দিন মরুকরণ হওয়ায় চরবাসী কৃষির চেয়ে গবাদি পশু পালনের উপর জোর দিচ্ছে। তিস্তা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বেষ্টিত কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চরশাখাহাতি গ্রামের রফিকুল ইসলাম গাড়লের খামার করেছে। এক বছর আগে তিনি ভারতের রাজস্থান থেকে ৫০টি গাড়ল নিয়ে এসে শুরু করেন খামার। রংপুর বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং কুড়িগ্রামে একমাত্র এ গাড়লের খামারটি। বর্তমানে খামারে রয়েছে একশত এর বেশী গাড়ল। ইতোমধ্যে তিনি কয়েক লক্ষ টাকার গাড়ল বিক্রয় করেছেন। একটি গাড়লের বাচ্চার মূল্য ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। খাবার উপযোগী একটি গাড়ল ৪০ থেকে ১২০ কেজি ওজনের হয়ে থাকে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে চরাঞ্চলে প্রাকৃতিক ঘাস,লতা-পাতা গাড়ল ও অন্যান্য গবাদি পশু পালনের জন্য বেশ উপযোগী। জলবায়ুর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দেশের বৃহৎ নদনদী বেষ্টিত চরাঞ্চলে এখন ব্যাপক হারে গবাদিপশু পালন হচ্ছে। রফিকুল ইসলামের মতো অনেক চরবাসী সম্মিলিত উদ্যোগে গরু,মহিষ,ছাগল, ভেড়া এবং গাড়ল পালন করছে। কুড়িগ্রামে কয়েক বছর আগেও এসব চরাঞ্চলে মানুষ কৃষি নির্ভরশীল জীবন নির্বাহ করতো। অসময়ের বন্যা বৃষ্টি আর মরুকরণের কারণে ফসল ভাল না হওয়ায় চরবাসী তাদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং পুষ্টি নিশ্চিত করণে মানুষ গবাদি পশু পালনের দিকে ব্যাপক ভাবে ঝুঁকেছে। সাধারণত আগে প্রত্যন্ত এসব অঞ্চলে বাড়িতে মুরগী, হাঁস পালন করতো। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি এবং জলবায়ুর বৈরি প্রভাবে রোগব্যধি বেড়ে গেছে। এতে করে অতি গরম এবং শীতে নানা ধরণের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগিরও রোগ বেড়েছে। এসব চরাঞ্চলে অল্প খরচে বেশি লাভবান হওয়ায় মহিষ পালনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে চরবাসীর। এতে করে তাদের কৃষি কাজে ধান মাড়াই, হাল চাষ, খড় বহনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে থাকে। গাড়ল খামারী রফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর তিনি খামারটি শুরু করেন। মেহেরপুরের এক খামারির মাধ্যমে তিনি ভারত থেকে নিয়ে আসেন ৫২টি গাড়ল। প্রায় এক বছরের কয়েক লক্ষ টাকার গাড়ল বিক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে খামারে ১০২টি গাড়ল রয়েছে। তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৮০টি গাড়লের খামার পরিদর্শন। অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেই তিনি নিজেই গাড়লের খামার করেছেন। তিনি আরও বলেন, একটি বাচ্চা ভেড়ার দাম ১২ শত থেকে ১৫ শত টাকা। কিন্তু একটি গাড়লের বাচ্চার দাম ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। একটি ভেড়া সর্বোচ্চ ৩০ কেজি ওজনের হয়ে থাকে। খাবার উপযোগী গাড়ল ৪০ কেজি থেকে ১২০ কেজি ওজনের হয়। খামারটি রংপুর বিভাগের সর্ববৃহৎ। এটি কুড়িগ্রাম জেলার একমাত্র গাড়ল খামার। এর মাংস পুষ্টিগুণ অনেক। উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের আলোর চরের বিজলী বেগম বলেন, আগে তো চরের মধ্যে শুধু হাঁস-মুরগি পালন করা হতো। দু’একটি করে গরু-ছাগল বাড়ীতে ছিল। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে চরের মানুষের জীবন জীবিকায় পরিবর্তন ঘটেছে। এখন চরের অধিকাংশ চরের মানুষের ঘরে গরু, ছাগল,ভেড়া,মহিষ পালন করে। কেননা নদী ভাঙ্গন কিংবা দুর্যোগে যে ক্ষতি হয় গবাদি পশু বিক্রয় কওে সেই ক্ষতি পুরণ করতে হয়। একই এলাকার সাইফুর রহমান বলেন, আবহাওয়ার বিরুপ প্রভাবের কারণে চরে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। অসময়ে বন্যা, খরার কারণে জমিতে কৃষি তেমন ফসল ফলে না। চরের মানুষ গবাদী পশু পালনে আগ্রহ বেড়েছে। একটি গরু পালন করে ৬ মাস হতে এক বছর পর বিক্রয় করলে খরচের তুলনায় লাভ কম হয়। কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা ডা. মোনাক্কা আলী বলেন, জেলায় ১৬টি নদ-নদী রয়েছে। এখানে চরাঞ্চলের সংখ্যাও অনেক বেশি। জলবায়ুর প্রভাবে চরাঞ্চলের মানুষ জীবন জীবিকায় পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। দুর্যোগ মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গবাদী পশু পালনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। চরাঞ্চল জমি গুলো গবাদি পশু পালনে বেশ উপযোগি। গত কয়েক বছরের তুলনায় বেড়েছে মহিষ, গরু ,ছাগল, ভেড়া এবং গাড়ল পালন। চরাঞ্চলের মানুষকে প্রাণি স¤পদ বিভাগের ভ্যাকসিনেশন, চিকিৎসা সেবা মানুষের দৌঁড় গোড়ায় পৌঁছে দেবার কারণে মানুষ গবাদি পশু পালনে আগ্রহী হচ্ছে।








