প্রশ্নটা তুলতেই হবে- লি-কুয়ান সিঙ্গাপুরকে বদলাতে পারলেন কিন্তু ড.
মোহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেন না কেন?
'২৪ এর ৫ই আগস্টের পরে ড. ইউনূস যে জনপ্রিয়তা নিয়ে সরকারের দায়িত্বভার
গ্রহন করেছিলেন তা এখন তলানিতে। যত দিন গড়াবে ভাটির টান আরও তীব্র
হবে। প্রশ্নোত্তরে ফিরে আসি। অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও বড়লোক হয়ে যাওয়া দেশ
সিঙ্গাপুর লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছিল কেননা সেখানে ঠিক ৬০ বছর পূর্বের
মানুষগুলো ধীবর বা জেলে ছিল। রাত-দিন মাছ শিকার করতো, বিক্রি করতো, খেতো
এবং ঘুমাতো। বাকি দায়িত্ব লি-কুয়ানের। অবশ্য আরও একটা বড় কাজ তারা
করেছিল- লি-কুয়ানের প্রতি আস্থা রেখেছিল। লি-কুয়ানকে বিশ্বাস করেছিল।
যেদিন মালয়েশিয়া বোঝা মনে করে সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে দেয় সেদিন
সিঙ্গাপুরের ফাউন্ডিং ফাদার সংবাদ সম্মেলনে মিনিট কয়েক কেঁদেছিল। সেবকের
সেদিনের চোখের পানিকে সিঙ্গাপুরের প্রত্যেকটি নাগরিক নিজের ব্যথা হিসেবে
অনুভব করেছিল।
ড. ইউনূসের বাংলাদেশের মানুষ? সংখ্যায় যদি ১৮ কোটি হয় তবে সেখানে ১৬
কোটি বুদ্ধিজীবী। ভাবছেন বাকি দুইকোটি বোকা? নাহ তারাও চতুর। পৃথিবীর মধ্যে
আর কোনো দেশে এতো ওয়াজ-মাহফিল হয় না, এতোবেশি মসজিদ-মন্দির কিংবা
মাদ্রাসা নাই অথচ বাংলাদেশ? পথে পাঁচশো টাকা পড়ে থাকলে পাঁচশো মানুষ
মালিকানা দাবি করবে। সুযোগ পেলে পাঁচ সেকেন্ডে সাগর হজম করে ফেলতে পারে।
অনিয়ম দুর্নীতিতে বিগত কয়েক বছর এখানে পুকুরচুরি নয় বরং সাগরচুরি হয়েছে।
লি-কুয়ান যে জনগণকে নিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের
জনগণ সেই ক্যাটেগরির নয়। স্বার্থে আঘাত লাগলে ড. ইউনূসকে পানি দিয়ে এক
ঢোকে গিলে ফেলতেও তারা দ্বিতীয়বার ভাববে না। ড. ইউনূস তো মানুষ, মেশিন
দিয়েও এই জাতিকে সোজা রাখা আসলে সম্ভব কি-না সেটা গবেষণার বিষয়। পচন
মস্তিষ্কের কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
তবে কী বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো আশা নাই? আমি ব্যক্তিগতভাবে
নৈরাশ্যবাদী নই। তবে বাংলাদেশকে বদলাতে অন্তত বেসিকজ্ঞান করে
দুইটি পরিবর্তন আনতেই হবে। প্রথমতঃ জিরো টলারেন্স টু এ্যানি
কাইন্ডস অব করাপশন। দ্বিতীয়তঃ জিরো টলারেন্স পলিসি এগেইনস্ট
নেপোটিসম। হ্যাঁ- এই দুইটা দিয়েই সিঙ্গাপুর প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে। হ্যাঁ- এই
দুইটাই বাংলাদেশকে পাতালে পাঠিয়েছে। দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতি বন্ধ
করতে পারলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই সিঙ্গাপুরকেও ছাড়িয়ে যাবে।
বাংলাদের সে-সকল প্রাকৃতিক রিসোর্স আছে তা সিঙ্গাপুরের ছিল না।
সিঙ্গাপুরের যা ছিল তা হচ্ছে সততা ও যোগ্যকে দায়িত্ব দেওয়ার
মানসিকতা।
আপনি জানেন কি-না, সিঙ্গাপুর একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। নিরপেক্ষতা মানে
সেখানে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে ধর্ম নাই বললেই চলে। অথচ অফিসে এক
পয়সা ঘুষ নাই, কর্মক্ষেত্রে একমিনিট ফাঁকি নাই কিংবা ব্যবসায় সিঙ্গাপুরী এক
ডলার বাড়তি মুনাফা নাই। কেউ কাউকে জিম্মি করতে জানে না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
চিকিৎসা হয় সিঙ্গাপুরে। ইমারাতগুলোর উচ্চতা দেখতে হলে ঘাড় বাঁকা করতে
হয়। আলোর ঝলকানিতে চোখে রঙ লাগে। কোথাও একটুকরো ময়লা আবর্জনা
পড়ে নাই। সর্বত্রই ঝকঝকে তকতকে। প্রাকৃতিক সম্পদের কিছুই নাই তবুও
বিশ্ব টুরিজমের অন্যতম আকর্ষন সিঙ্গাপুর। এসব এমনি এমনি হয়নি। কেউ
কোনোদিন কোনো আন্দোলনের নামে রাস্তা আটকে মানুষকে ভোগান্তিতে
ফেলেছে- তারা সেটা কল্পনাতেও ভাবতে পারে না। সিন্ডিকেট করে সবকিছু দুর্লভ
করে রাখার কুচিন্তা হয়তো সিঙ্গাপুরের শয়তানেও করে না; সেখানের মানুষ তো
দূরের কথা
বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলুন, স্বজনপ্রীতি বন্ধ করুন- ড.
ইউনূসকে লাগবে না, জহিরুদ্দি-করিমুদ্দি দায়িত্ব নিলেও এই দেশটা রাতারাতি
ধনী দেশে পরিণত হবে। এই দেশ থেকে এক বছরে যে পরিমান অর্থ পাচার হয় তা
দিয়ে আফ্রিকার পঞ্চাশটি দেশ তাদের বাৎসরিক বাজেট সামলাতে পারে। কাকে
বিশ্বাস করবেন এখানে? যে অর্থের বিনিময়ে দুর্নীতি করে না সেও সুপারিশের
দুর্নীতি করে। ম্যোরাল ভ্যালুজ চরমভাবে ডিগ্রিডেড। ওসমান হাদি খুন হতেই তার
বোনকে সেই আসনের এমপি প্রার্থী ভাবতে শুরু করেছে অনেকেই! হাদির
প্রশ্নাতীত সততা, সন্দেহাতীত দেশপ্রেম কি বোনেরও যোগ্যতা? মসজিদের
ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, শিক্ষক কিংবা অন্যান্য চাকুরিজীবী- যিনিই সততার
পরীক্ষায় বসেছে সেই অকৃতার্য হয়েছেন। যেন নৈতিকতা বলতে কিছুই নাই কেবল
সুযোগের অভাব! রাজনীতিবিদদের কথা আলাদা করে বলতেও ইচ্ছা করে না।
মেম্বর নির্বাচনে এদেশে যে টাকা খরচ করার রেওয়াজ চালু হয়েছে সিঙ্গাপুরের
মেয়র নির্বাচনেও সে অর্থ লাগে না।
দেখে যেন মনে হয়, শেষ বয়সে ড. ইউনূস দুর্নাম কুড়াতেই এসেছেন। এখানে আসলে
পরিবর্তন এতোটা সহজ নয়। যে জাতির শিক্ষা পদ্ধতি, সার্টিফিকেট অর্জনের
রীতিতেই গলদ সেখানে নৈতিকতা আশা করা বোকামি। কৃষকের উৎপাদন,
শ্রমিকের শ্রম এবং সংসদের মন্ত্রীর ভাষণ- সবকিছুতেই ভেজাল। সোনার দেশের
বাস্তবায়ন আসলে স্বপ্ন। হাদির দেখা ভুল স্বপ্নের খেসরাতে প্রাণ দিতে হলো।
সিঙ্গাপুরের বাস্তবতা আমাদের জন্য প্রযোজ্য না। যত শাসক বাংলাদেশ পেয়েছে
তাদের মধ্যে যোগ্যতায় ড. ইউনূস সবার থেকে উপরে। কিন্তু কাজ ও চিন্তা
বাস্তবায়নের স্বাধীনতা একচ্ছত্রভাবে তাঁর আছে? হাদির জনাজায় মনে হয়েছে,
অনেক কথা বলতে চেয়েও তিনি বলতে পারেননি তিনি কোনো ইচ্ছা পোষণ করলে
তার মন্ত্রীসভাতেই সেটার বিরোধিতা করার লোক আছে। যদি সিদ্ধান্ত পাশ হয়ে
বাস্তবায়নযোগ্যও হয় তবে সেটা যারা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করবে তারা
বিভিন্ন কেবলায় বিভক্ত। জনগণও নির্বাচনের সময় ভোট বিক্রি করে দিয়ে
নেতাদের কাছে বহুকিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকে! সার্কাজম চলমান।
বাংলাদেশ কি এমনই চলবে- স্বাধীনতা পরবর্তী চুয়ান্ন বছরের মতো? না। এ গতি
একসময় থামবে। যখন সবকিছু বিকল হয়ে যায় তখন পুনরায় চালু করতে হলে বড়
ধরণের ধাক্কা লাগে। আবার একদিন বিপ্লব হবে। সেটা কোনো সরকারের বিরুদ্ধে
আর নাও হতে পারে। সেটা হবে সিস্টেমের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশপন্থার বিরুদ্ধে যা
কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা চিরতরে উচ্ছেদ করতে কৃত্রিম কিংবা
প্রাকৃতিক- কোন এক শক্তি হামলে পড়বে। এইভাবে ভাগাভাগি করে খাওয়ার
বন্দোবস্ত বেশিদিন চলে না, চলতে পারে না, চলতে দেওয়া যায় না।
জুলাই বিক্রি করে চোখের সামনে কতজন শতকোটি টাকার মালিক হয়ে গেল।
চাঁদাবাজি থামেনি একমুহূর্তের জন্যেও। সবাই বাংলাদেশকে উন্নত-সম্মৃদ্ধ করার
স্বপ্ন নিয়ে দেশ গড়তে আসে অথচ নিজেদের নেতাদের ছাড়া আরও কারোরই
ভাগ্য বদলায় না। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে কর্মীরাও সুবিধামতো দলের ব্যানার
বদলায়। লি-কুয়ানের সিঙ্গাপুর থেকে আমাদের অনেক শেখার ছিল। অথচ আমরা
শিখতে চাই টকশো থেকে! বুদ্ধিজীবীদের ভাড়া করা বিদ্যা ও বুদ্ধি দিয়ে দেশ গড়া
যায় না। এদেশের শাসককে অন্ধ ও বধির হয়ে আসতে হবে যদি দেশ গড়তে হয়।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








