পর্ব_০৩!
সেদিনের পরের কয়েকটা দিন আমার জীবনে এক অদ্ভুত নীরবতার মতো নেমে এলো, বাইরে থেকে দেখলে সবকিছুই স্বাভাবিক, অফিস, ফোনকল, মিটিং, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি আগের মানুষটার মধ্যে আর ছিলাম না।
যেন কোনো এক অদৃশ্য রেখা আমাকে দুই ভাগ করে দিয়েছে, একদিকে যে মানুষটা এত বছর ধরে শুধু দায়িত্ব পালন করেছে, আর অন্যদিকে যে মানুষটা প্রথমবার বুঝতে শিখেছে ভালোবাসা আর অপমান একসাথে চলতে পারে না।
পারমিতা তখনও চুপচাপ ছিল, কিন্তু তার চুপ থাকার মধ্যে আগের মতো সহ্য করার অভ্যাসটা আর ছিল না, বরং একটা ক্লান্তি ছিল, একটা অদ্ভুত ভা’ঙা বিশ্বাসের ভার ছিল।
সে স্বাভাবিক কাজ করছিল ঠিকই, রান্না, ঘর গোছানো, ছোট ছোট হাসি, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম তার ভেতরে একটা বড় ঝড় থেমে থেমে বইছে,
আর আমি সেই ঝড়কে এবার থামাতে চাইনি, বরং বুঝতে চাইছিলাম কোথা থেকে শুরু হয় এই অবমাননার শিকড়।
আমি অফিস থেকে ফিরেই একদিন মায়ের ব্যাংক সম্পর্কিত কাগজপত্রগুলো আবার বের করলাম, পুরোনো ফাইল, লোনের হিসাব, বাড়ির ডকুমেন্ট, সবকিছু, যেগুলো আমি এতদিন চোখ বন্ধ করে সামলেছি,
কারণ আমার মনে হয়েছিল পরিবারকে হিসাবের মধ্যে আনা মানে স’ম্পর্ককে ছোট করা,
কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছিলাম স’ম্পর্ক যদি একপাক্ষিক হয়, তাহলে সেটা সম্পর্ক না।
সেটা বোঝা হয়ে যায়। আমি প্রতিটি খরচের হিসাব আলাদা করে দেখতে লাগলাম, কত টাকা মায়ের নামে গেছে, কত টাকা সাবিহার সংসারে, কত টাকা এমন জিনিসে গেছে যেগুলোকে “প্রয়োজন” বলা হলেও আসলে সেগুলো ছিল অভ্যাস আর অধিকারবোধের ফল।
পারমিতা একদিন আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল, “তুমি এসব কেন দেখছো এত গভীরভাবে?”
আমি তার দিকে তাকিয়ে শুধু বললাম, “কারণ এখন আমি বুঝতে চাই।
আমি মানুষ ছিলাম নাকি শুধু ব্যবহার করা একটা মাধ্যম ছিলাম।” সে কিছু বলল না,
কিন্তু তার চোখে আমি প্রথমবার একটা সম্মতি দেখলাম, যেন সে ভেতরে ভেতরে বুঝতে শুরু করেছে আমি আর আগের মতো সবকিছু মেনে নেব না।
এর কয়েকদিন পর মা আমাকে ফোন করলেন, তার কণ্ঠে আগের সেই স্বাভাবিক আধিপত্য।
যেন গত রাতের অপমান কোনো ঘটনাই ছিল না, তিনি বললেন, “শাহানারার শরীর একটু খারাপ,
তুমি আজকে ওষুধের টাকা পাঠিয়ে দাও আর রাশেদের জন্য নতুন ফোনটা দেখো, পুরোনোটা নাকি সমস্যা করছে,”
আমি ফোনটা কানে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম, তারপর খুব শান্ত গলায় বললাম,
“মা, এখন থেকে সব অনুরোধ লিখে পাঠাবেন, আমি আর মুখে বলা কথা অনুযায়ী কাজ করব না।”
ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা, তারপর একটু রাগ মেশানো অবাক কণ্ঠ, “মানে কী বলছো তুমি?”
আমি বললাম, “মানে এখন থেকে খরচগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে, আবেগ অনুযায়ী না।” ফোনটা কেটে গেল।
আমি জানতাম এই এক বাক্যই অনেক কিছু বদলে দেবে।
সেই রাতেই সাবিহা বাসায় এলো, তার মুখে সেই পরিচিত আত্মবিশ্বাস, যে আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয় যখন কেউ জানে তার সব চাওয়া পূরণ হবে, সে ঢুকেই বলল,
“ভাইয়া, মা বলেছে তুমি নাকি আজকাল অদ্ভুত ব্যবহার করছো, কী হয়েছে তোমার?” আমি সোফায় বসে ছিলাম।
পারমিতা পাশের রুমে ছিল, আমি ধীরে ধীরে বললাম, “অদ্ভুত কিছু না, আমি শুধু হিসাব করছি।”
সে হেসে বলল, “হিসাব? আমাদের পরিবারে আবার হিসাব কবে থেকে শুরু হলো?” আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম।
“যেদিন থেকে সম্মান বন্ধ হয়ে গেছে, সেদিন থেকেই হিসাব শুরু হয়েছে।” তার হাসি একটু থেমে গেল, কিন্তু সে আবার বলল, “তুমি কি পারমিতার কথায় এসব করছো?”
আমি এবার একটু থামলাম, তারপর বললাম, “না সাবিহা, আমি আমার চোখ দিয়ে দেখছি।”
এই বাক্যের পর রুমে একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো, যে নীরবতা শুধু শব্দ নয়, সম্পর্ককেও থামিয়ে দেয়।
পারমিতা তখন ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলো, তার মুখে কোনো রাগ ছিল না, ছিল শুধু ক্লান্তি আর শান্ত একটা দৃঢ়তা, সে সাবিহার দিকে তাকিয়ে বলল।
“আমি কখনো কিছু চাইনি, আমি শুধু মানুষ হিসেবে থাকতে চেয়েছিলাম,” সাবিহা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি হাত তুলে থামিয়ে দিলাম, বললাম, “আজ থেকে আর কোনো আলোচনা না, শুধু সীমারেখা হবে।”
সাবিহা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলছি। এরপর যা হলো সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাতগুলোর একটা, মা ফোন করলেন, রাগ, কষ্ট, অভিযোগ সব একসাথে,
তিনি বললেন আমি নাকি পরিবর্তন হয়ে গেছি, আমি নাকি পরিবার ভে’ঙে দিচ্ছি।
আমি সব শুনছিলাম, কিন্তু আর আগের মতো ভেঙে পড়ছিলাম না, বরং প্রতিটি শব্দ আমাকে আরও পরিষ্কার করে দিচ্ছিল যে আমি সঠিক পথে আছি,
কারণ সত্যি বলতে এতদিন আমি যা করেছি সেটা ভালোবাসা ছিল না, সেটা ছিল আত্মত্যাগের এমন এক সংস্করণ যেখানে শুধু একপক্ষই হারিয়ে যায়।
পরের দিন সকালে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি আমার পরিবারের সব মাসিক ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট এক সপ্তাহের জন্য থামিয়ে দিলাম,
কোনো বড় ঘোষণা নয়, কোনো নাটক নয়, শুধু নীরব একটা বিরতি, আর তখনই আসল পরিবর্তন শুরু হলো,
প্রথম দিনেই মায়ের ফোন, দ্বিতীয় দিনেই সাবিহার মেসেজ, তৃতীয় দিনেই আত্মীয়দের চাপ, সবাই একই কথা বলছে, “তুমি এমন করছো কেন?”
কিন্তু কেউ একবারও জিজ্ঞেস করল না, “তুমি কষ্ট পাচ্ছো কি না?” লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল!
পারমিতা এক রাতে আমাকে বলল, “তুমি কি ভয় পাচ্ছো?”
আমি তার দিকে তাকালাম, সে আবার বলল, “তুমি সবকিছু বন্ধ করে দিলে তারা তোমাকে ঘৃণা করবে,” আমি একটু হেসে বললাম, “তারা আমাকে আগে থেকেই ঘৃণা করেনি, তারা শুধু আমার টাকাকে ভালোবেসেছে।”
সে চুপ করে গেল, তারপর ধীরে বলল, “তাহলে এখন?” আমি জানালার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“এখন আমি দেখি, কে মানুষ হিসেবে থাকে আর কে সুবিধা হিসেবে হারিয়ে যায়।”
সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম, এই গল্প এখন আর শুধু পারিবারিক অপমানের গল্প না, এটা এখন নিজের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার লড়াই, আর এই লড়াইয়ে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা বাইরে না, ভেতরের অভ্যাসের সাথে।
কারণ বছরের পর বছর যাকে “ভালোবাসা” বলে চালানো হয়েছে, সেটাকে “সীমা” বলা সবচেয়ে কঠিন কাজ।
আর আমি জানতাম, আসল ঝড়টা এখনো শুরুই হয়নি।
Post Views: 267
Related