উত্তর কলকাতার হেদোর মোড়, পুরনো স্কুলবাড়ি আর টিফিনের সেই ভাগ করে নেওয়া ফুচকা— শ্রাবন্তীর জীবনটা ঘিরে ছিল এই চারটে নাম: ঋভু, অর্ক, নীল আর সৌম্য। ওরা পাঁচজন ছিল প্রাণের বন্ধু। ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে শুরু করে বিকেলের গড়ের মাঠ, ওদের আড্ডা ছিল অবিচ্ছেদ্য। ক্লাস এইটে পড়ার সময় একদিন বাগবাজার ঘাটে বসে ওরা চারজন হুট করে বলে বসেছিল, “জানিস শ্রাবন্তী, আমরা কেউই তোকে ছাড়া থাকতে পারব না। বড় হয়ে আমরা চারজন মিলেই তোকে বিয়ে করব!” শ্রাবন্তী সেদিন খিলখিল করে হেসেছিল, ভেবেছিল এ স্রেফ ছেলেমানুষি।
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। স্কুল শেষ হলো, কলেজ পেরিয়ে যে যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শ্রাবন্তীর বাবা-মা রক্ষণশীল। তারা শ্রাবন্তীর জন্য এক সচ্ছল পাত্র দেখে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে দিলেন। ঋভুরা চারজন সেদিন বিয়ের প্যান্ডেলের এক কোণে দাঁড়িয়ে ম্লান মুখে হবু কনের হাসি দেখেছিল। মনে মনে তারা মেনে নিয়েছিল যে শৈশবের সেই পাগলামি কেবল স্মৃতি হয়েই থেকে যাবে।
কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম। বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় এক ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় শ্রাবন্তীর স্বামী মারা যায়। তেইশ বছর বয়সী একটা মেয়ের সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল এক লহমায়। কলকাতার বুকে এক তরুণী বিধবার জীবন কতটা নরক হতে পারে, শ্রাবন্তী তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল। শ্বশুরবাড়ির লাঞ্ছনা আর সমাজের বাঁকা চোখ তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল।
খবরটা চার বন্ধুর কানে পৌঁছাতে দেরি হয়নি। তারা তখন নিজেদের একটি টেক-স্টার্টআপ নিয়ে লড়াই করছে। তারা দেখল তাদের সেই স্বপ্নের ‘শ্রাবন্তী’ আজ এক জ্যান্ত লাশ। চারজন এক রাতে গঙ্গার ঘাটে বসল। ঋভু বলল, “আমরা ওকে এভাবে মরতে দিতে পারি না। মনে আছে আমাদের সেই প্রতিজ্ঞা?”
শুরু হলো আসল লড়াই। সমাজ, পরিবার আর আইনের পাহাড় সমান বাধা। চারটে শিক্ষিত ছেলে একটা বিধবা মেয়েকে একসাথে বিয়ে করবে—একথা শুনে কলকাতার অভিজাত পাড়ায় ছি ছি পড়ে গেল। ঋভুর মা গলায় দড়ি দেওয়ার হুমকি দিলেন, অর্কর বাবা তাকে ত্যাজ্যপুত্র করলেন। সমাজ বলল, “এ তো অসভ্যতা, এ তো পাপ!” কিন্তু ওরা চারজন ছিল অটল। তারা জানত, শ্রাবন্তীকে এই সমাজ ছিঁড়ে খাবে যদি না তারা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
পরের দুটো বছর ছিল চরম সংগ্রামের। ব্যবসা দাঁড় করানো, পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া আর সমাজের ঘৃণা সওয়া। কিন্তু তাদের মাথার ওপর ছিল শ্রাবন্তীর সেই ম্লান মুখটা। তারা কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের বিজনেসকে কলকাতার অন্যতম সফল এজেন্সিতে পরিণত করল। টাকা আর সাফল্য যখন হাতে এল, তখন তারা আর কারোর অনুমতির তোয়াক্কা করল না।
দক্ষিণ কলকাতার এক ছোট্ট মন্দিরে কোনো আড়ম্বর ছাড়াই বিয়েটা হলো। শ্রাবন্তীর সাদা শাড়ি বদলে লাল বেনারসি পরিয়ে দিল ওরা চারজন। সমাজের নিয়ম ভাঙার এক চরম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ঋভু, অর্ক, নীল আর সৌম্য—চারজনেই শ্রাবন্তীর সিঁথিতে রাঙিয়ে দিল পরম মমতায়। বিয়ের পর ওরা পাঁচজন মিলে কলকাতার বাইরে নিজেদের এক আলাদা জগত তৈরি করল।
এখন শ্রাবন্তীর ড্রয়িংরুমে যখন হাসি ফোটে, তখন সেখানে কোনো একাকীত্ব নেই। কেউ ওর কান্না মোছায়, কেউ ওকে হাসানোর গান গায়, কেউ ওর প্রিয় খাবার রান্না করে, আর কেউ ওর স্বপ্নের খেয়াল রাখে। সমাজ এখনো বাঁকা চোখে তাকায়, আত্মীয়রা হয়তো এখনো আড়ালে সমালোচনা করে। কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন ওরা পাঁচজন বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখে, তখন সব ঘৃণা ফিকে হয়ে যায়।
শ্রাবন্তী এখন আর ম্লান নয়; সে এখন এক পূর্ণিমা, যাকে ঘিরে আছে চারটে উজ্জ্বল নক্ষত্র। সে জানে, এই পৃথিবীতে সমাজ হয়তো অনেক নিয়ম শেখায়, কিন্তু চারটি হৃদয়ের নিঃস্বার্থ আগলে রাখার কাছে পৃথিবীর সব নিয়মই বড় তুচ্ছ। বিয়ের সেই এক বছর আগের অন্ধকারের চেয়ে আজ এই চারটে মানুষের ভালোবাসার আলো তার কাছে অনেক বেশি পবিত্র।
সংগৃহীত








