রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি: বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে দুগ্ধশিল্প। বাংলাদেশেও এ খাতটি ব্যাপক সম্ভাবনাময়। তবে এ শিল্পে সফলতা অর্জনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশে দুধের উৎপাদন বাড়লেও মাথাপিছু প্রাপ্যতা এখনো অনেক কম। নিশ্চিত হয়নি খামারিদের উৎপাদিত দুধের নায্য মূল্যও। বাজারে নিম্নমানের আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধের আধিক্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশি উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি রয়েছে বিদেশি বৃহৎ কো¤পানিগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগের প্রভাব। খামারিদের দুধে ভ্যালুচেইন সমস্যা ও গো-খাদ্যের চড়া দামের মতো সংকটও ঘিরে আছে দুগ্ধ শিল্পের আষ্টেপৃষ্ঠে। একটি নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, দেশে দিন দিনই তরল দুধের চেয়ে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। মানুষের তরল দুধ পানের অভ্যাস সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। তারপরও যেটুকু বাড়তি চাহিদা তা মেটাতে দুধের উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। উৎপাদন বাড়াতে হলে এ শিল্পের সংকট মোকাবিলা করাও প্রয়োজন। সরকারি তথ্য মোতাবেক, দেশে গত এক যুগে দুধের উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। তারপরও চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। মাথাপিছু দুধ পানও কাক্সিক্ষত মাত্রার চেয়ে কম। আবার দিন দিন বাড়ছে দুধের দাম। মানুষের তরল দুধ পানের অভ্যাস সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। প্রাণিস¤পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুয়ারী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লক্ষ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। পরের তিন অর্থবছরে তা বেড়ে ৭২ লক্ষ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যায়। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন এক লাফে ২০ লক্ষ মেট্রিক টন বেড়ে পৌঁছে যায় ৯২ লক্ষ মেট্রিক টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৪০ লক্ষ ৬৮ হাজার টন। তবে রেকর্ড উৎপাদনেও দুধের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। কারণ, দেশে বছরে ১ কোটি ৫৬ লক্ষ ৬৮ হাজার টন দুধের চাহিদা রয়েছে। দেশের মানুষ এখন মাথাপিছু দৈনিক গড়ে ২২২ মিলিলিটার দুধ পান করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা উচিত। তবে বাংলাদেশের মানুষ তার চেয়ে কম দুধ পান করে। পুষ্টিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও ডেইরি খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম দুধ পান করে। দুধের অপ্রাপ্যতা, আর্থসামাজিক নাজুক অবস্থা, দুধের চড়া দাম এবং নিয়মিত দুধ খাওয়ার অভ্যাস না থাকায় এ হার অনেক কম। দুধের উৎপাদন নিয়ে প্রাণিস¤পদ অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে একমত নন তারা। তাদের দাবি, দেশে দুধের উৎপাদন আরও কম। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ডিম, দুধ ও মাংসের মাথাপিছু প্রাপ্যতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। দুধের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দামও। ঢাকা শহরে বাসাবাড়িতে গরুর দুধ প্রতি লিটার দুধ এলাকাভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রয় হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে তা ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এসব তরল দুধের দাম গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দেশে ২০১৮ সালে এক লিটার তরল দুধের দাম ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০-৮০ টাকা। প্যাকেটজাত প্রতি লিটার গ্রামাঞ্চলে বাজারে বিক্রি ৯০ টাকা থেকে ১০০ টাকা করে। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সাধারণ স¤পাদক শাহ ইমরান বলেন, এক লিটার দুধ উৎপাদনে যে ব্যয় হয়, তার ৭০ শতাংশই যায় পশুর খাদ্য কেনায়। এর বাইরে শ্রমমূল্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ও রয়েছে। সরকারের উচিত বিনা মূল্যে ঘাসের বীজ ও চিকিৎসা খরচসহ খামার পর্যায়ে প্রণোদনা দেওয়া। গো-খাদ্যের দাম নিয়ে খামারিগণ বলেন, মাত্র চার বছর আগেও গো-খাদ্যের দাম বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় অর্ধেক ছিল। এখন মাসে মাসে গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় সরবরাহকারী কো¤পানিগুলো। এমনকি গো-খাদ্যের দাম দফায় দফায় বাড়ায় অনেকে খামার গুটিয়ে নিয়েছেন। খামারি রুবেল হোসেন বলেন, খড় ও ঘাসের পাশাপাশি গরু ছাগলকে ভুসি, চালের খুদ, ধানের কুঁড়া ও বিভিন্ন কো¤পানির তৈরি কৃত্রিম ফিড (দানাদার খাদ্য) খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হারুন অর রশীদ গরুর খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটি চিত্র তুলে ধরে বলেন, বছরখানেক আগেও ৩৭ কেজির এক বস্তা ভুসির দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। এখন তা বেড়ে দুই হাজার টাকায় উঠেছে। দেশে দুধের উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে গাভির কম উৎপাদন ক্ষমতা একটি বড় কারণ। দেশে একটি গাভি গড়ে বছরের ৩০৫ দিনে দৈনিক ৮ থেকে ১০ লিটার দুধ দেয়। অথচ শীতপ্রধান দেশে একটি গাভির দৈনিক দুধ দেওয়ার পরিমাণ ২২ থেকে ৩০ লিটার পর্যন্ত। ভালো মানের একটি গাভি দৈনিক গড়ে ৬২ লিটার পর্যন্ত দুধ দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি গরু দৈনিক গড়ে ৫২ লিটার দুধ দেয়। বাংলাদেশের খামারগুলোতে প্রতিটি গরু দিনে ৮ থেকে ৯ লিটার দুধ দেয়। এর বাইরে যেসব গরু আছে, সেগুলো দৈনিক গড়ে ২-৩ লিটার দুধ দেয়। দেশের গাভিগুলোর দুধ কম দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দেশের গাভিগুলো অনেক সময় মানসম্মত খাবার পায় না। এজন্য এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও কম। দেশীয় ঘাসে প্রোটিনের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। উন্নত ঘাসের জন্য বিকল্প চাষাবাদে অনেক খামারি আগ্রহী নন। দেশে দুগ্ধবতী পশুর সংখ্যার অনুপাতে দুধ উৎপাদন অনেক কম বলে মনে করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) দুগ্ধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডসে দুগ্ধবতী পশুর সংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক কম, মাত্র ১৬ লক্ষ। অথচ দুই দেশে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ একই। এর কারণ, আমাদের দেশীয় গাভি দিনে ১-২ লিটার দুধ দিলেও উন্নত জাতের গাভি দেয় ২০-৩০ লিটার। দেশে দুধ উৎপাদন বাড়াতে কম দুধ দেওয়া গাভি কমিয়ে বেশি দুধ দেওয়া গাভির সংখ্যা বাড়াতে হবে। দুধের সঠিক বাজারজাতকরণ প্রতিবন্ধকতায় হোঁচট খাচ্ছেন খামারিরা। প্রান্তিক পর্যায়ে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত বা সংরক্ষণের অপর্যাপ্ত সুবিধা ও পণ্য বহুমুখীকরণের সক্ষমতা না থাকা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে খামারিদের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবহন সমস্যা। এসব কারণে অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক খামারিরা। ডেইরি ফার্মের মালিক আমিরুল ইসলাম বলেন, সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা উৎপাদন একটু বেশি হলেই দুধের দাম পাই না। একসময় বেশিরভাগ দুধই মিল্ক ভিটায় বিক্রি করতাম। কিন্তু তাদের চাহিদার চেয়ে আমাদের উৎপাদন বেশি, এ কারণে উৎপাদিত দুধ থেকে যায়। তখন আমাদের বাইরে বিক্রি করতে হয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুধ বিক্রির বিকল্প নেই। এটি খামারিদের জন্য নিরাপদ। গুঁড়ো দুধ আমদানির ক্ষেত্রেও সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। অবাধে গুঁড়ো দুধ আসছে। এর ফলে দেশের খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তরল দুধের বিকল্প ব্যবহার বাড়ছে দুগ্ধজাত পণ্যে। দেশে তরল দুধের পাশাপাশি বাড়ছে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক জরিপে দেখা যায়, বয়স্কদের মধ্যে দুধ পানের অভ্যাস আছে। তবে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যে দুগ্ধজাত নানা পণ্য যেমন দই, মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা বেশি। মিল্ক ভিটা প্রতিদিন খামারিদের কাছ থেকে দুই লক্ষ ৩০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ১ লক্ষ ৩০ হাজার লিটার দুধ ব্যবহার হয় গুঁড়ো দুধ তৈরিতে। বাকি এক লক্ষ লিটারের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার তরল দুধ করা হয়। বাকিটা দিয়ে তৈরি হয় নানা পণ্য। বিডিএফএ সাধারণ স¤পাদক শাহ ইমরান বলেন দুগ্ধশিল্প খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে প্রাণ, ব্র্যাক, আকিজ, ইগলু, ফার্ম ফ্রেশ, আফতাব, আড়ংসহ বেশকিছু কো¤পানি। যদিও চাহিদার বড় অংশই পূরণ হয় আমদানি করা গুঁড়ো দুধ দিয়ে। দেশির চেয়ে বিদেশি গুঁড়ো দুধের বাজার তিনগুণ বড়। যেটি এ শিল্পের বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করা হয়। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে গাভিপ্রতি দুধের উৎপাদন অনেক বেশি। দুগ্ধ খাতে সেসব দেশ প্রচুর ভর্তুকি দেয়। এ কারণে তারা কম দামে দুধ বিক্রি করতে পারে। বাংলাদেশে দুগ্ধশিল্পের বিকাশের জন্য গাভির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য চাই ভালো জাতের গরু। একই সঙ্গে এ খাতকে সুরক্ষা দিতে সরকারের উদ্যোগও বিশেষভাবে প্রয়োজন। ডেইরি খাতের সহায়তা এবং মানসম্মত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য তৈরিতে বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০২৩ এর খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। এই আইন কার্যকর করা হলে খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়বে। তখন খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাবে।
অপ্রতিমের হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
কুমিল্লা: অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার...








