জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল মৌজার দলিত সম্প্রদায়ের সুকিয়া রবিদাস ও শিব রানী দাসের পরিবারকে নিজ ভূমি থেকে জোরপূর্বক অবৈধ উচ্ছেদের প্রতিবাদ, ভূমি বেদখলকারী তায়েজ উদ্দীনকে অনতিবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, ভূক্তভোগী পরিবারের বেদখলকৃত জমি উদ্ধারপূর্বক পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবীতে মানববন্ধন, সমাবেশ ও বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদান করেছে বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)। অদ্য (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫) বৃহস্পতিবার সকাল ১০.৩০ টায় জয়পুরহাট শহরের পাচুর মোড়ে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন বিডিইআরএম- জয়পুরহাট জেলা শাখার আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট বাবুল রবিদাস।
মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)’-কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিপন কুমার রবিদাস, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন- জয়পুরহাট জেলা শাখার সমন্বয়ক ওবায়দুল্লাহ্ মুসা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)- জয়পুরহাট জেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মো: বদিউজ্জামান, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ- কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ সুধীর তির্কি, বাংলাদেশ আদিবাসী সংঘ- কেন্দ্রীয় কমিটির আইন উপদেষ্টা এ.এইচ আল মুরাদ (দোয়েল), বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম (বিআরএফ)- জয়পুরহাট জেলা শাখার সভাপতি মনিলাল রবিদাস, সাধারণ সম্পাদক অরুন রবিদাস শিল্পা, ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্য শিব রানী দাস, সাবিত্রী রানী, ঘটনাস্থলের স্বাক্ষী আশরাফ হোসেন, দলিত মানবাধিকার সুরক্ষাকর্মী রূপালী রবিদাস প্রমুখ। কর্মসূচি শেষে জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্যগণ।
বক্তাগণ জানান, সম্প্রতি জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল মৌজায় সুকিয়া রবিদাস ও শিব রানী দাসের পরিবারকে নিজ ভূমি থেকে জোরপূর্বক অবৈধ উচ্ছেদ ও ভূমি বেদখল করার ঘটনা ঘটেছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে জানাচ্ছি যে, সমাজের অত্যন্ত পিছিয়েপড়া রবিদাস জনগোষ্ঠীর ভূমি বেদখল ও অবৈধ উচ্ছেদের এহেন ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, ফেলবে। আমরা মনে করি, এই উচ্ছেদ কার্যক্রম একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল। যা বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এ ঘটনার বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি ভূক্তভোগীদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
ঘটনার তথ্যানুসন্ধান করতে বিডিইআরএম ও নাগরিক উদ্যোগ এর এক প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যেই সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং ভূক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। ভূক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাট থানাধীন পুরানাপৈল মৌজার নালিশি তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি জনৈক ভিক্ষু মাঝির ভাতিজি শ্রীমতি বালিমন মার্ডির স্বত্ব দখলীয় সম্পত্তি ছিল। বালিমন মার্ডি আদিবাসী (সাঁওতাল) জনজাতির বিধায় গত ৩০/১০/১৯৯৫ ইং তারিখে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে ৩৫/এ/৯৫ নং কেস মূলে অনুমতি প্রাপ্ত হয়। বালিমন মার্ডি সাংসারিক জরুরী অর্থের প্রয়োজনে গত ০২/১১/১৯৯৫ ইং তারিখে লিখিত (০৫/১১/১৯৯৫ ইং তারিখে রেজিস্ট্রিকৃত) ৮৭২৫ কবলা দলিল মূলে স্থানীয় মৃত: মালুরাম রবিদাসের দুই কন্যা শ্রীমতি সুকিয়া রানী রবিদাস (৭০) ও শিব রানী দাস (৪৫) এর নিকট ০৬ (ছয়) শতক সম্পত্তি বিক্রি করে দখল হস্তান্তর করেন। এরপর থেকে তারা নালিশি সম্পত্তির উপর বসতবাড়ি নির্মান করে বসবাস করতে থাকেন। ২১/১০/২০১২ ইং তারিখে প্রতিবেশি দছিমদ্দিনের পুত্র মোঃ তায়েজ উদ্দীন সুকিয়া ও শিব রানীকে ত্রাণের কথা বলে প্রথমে জয়পুরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এবং পরে খঞ্জনপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যায়। দলিল লেখক, মোহরার ও স্বাক্ষীগণ এবং সনাক্তকারীর সাথে যোগসাজশে ত্রাণের সাহায্যের নাম করে তাদের নিকট থেকে সাদা স্ট্যাম্প ও ডেমিতে টিপ সই নিয়ে রাখে। একইসাথে তায়েজ উদ্দীন ভূক্তভোগীদের অজ্ঞাতে ও গোপনে ২১/১০/২০১২ ইং তারিখে ৭০৬৪ নং বিক্রি কবলা দলিল সৃষ্টি করে রাখেন। ভূক্তভোগী পরিবার নিরক্ষর ও সহজ-সরল দলিত সম্প্রদায়ের হওয়ায় খুব সহজেই তাদের বোকা বানিয়ে ফেলে অভিযুক্ত তায়েজ উদ্দীন।
ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্যগণ সমাজের প্রান্তিক/দলিত (চর্মকার) সম্প্রদায়ের হওয়ায় ১৪৮/২০১৯ মামলায় কাগজপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে না পারায় বিজ্ঞ ক্ষেতলাল সহকারী জজ আদালত ০৩ (তিন) শতক সম্পত্তির রায় তায়েজ উদ্দীনের পক্ষে প্রদান করেন। ফলে ভিটার সম্পত্তিতে ভূক্তভোগী পরিবারের আপত্তি অকার্যকর হলেও বাড়ি নির্মিত জায়গার অবশিষ্ট ০৩ (তিন) শতক জায়গার উপর আইনানুগভাবেই মালিকানা বহাল রয়েছে। অভিযুক্ত তায়েজ উদ্দীন ০৩ (তিন) শতক সম্পত্তির রায় ও ডিক্রিপ্রাপ্ত হয়ে বিজ্ঞ কোর্ট থেকে দখল নেওয়ার জন্য আবেদন করলে আদালতের কর্মচারীরা ০৩ শতকের স্থলে ভিটা দখল দিয়ে তার সাথে অবৈধভাবে বসতবাড়ির অবশিষ্ট ০৩ শতক, মোট ০৬ (ছয়) শতক জায়গার দখল দেন। বিজ্ঞ আদালতের এহেন আদেশ অমান্য করা একেবারেই অনৈতিক। উচ্ছেদের সময় বাধা দিলে ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্য সুমনকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে অভিযুক্তরা।
মানবন্ধন ও সমাবেশ থেকে নিম্নোক্ত দাবিনামা উত্থাপন করা হয়:
১. অনতিবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ভূক্তভোগীদের বেহাত হওয়া জমি উদ্ধার করে তাদের নিকট হস্তান্তর করতে হবে।
২. ভূক্তভোগী রবিদাস পরিবার উচ্ছেদের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. মানবিক দৃষ্টিকোণ ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের পাশাপাশি বসতবাড়ি পুনরায় নির্মাণে রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্ব নিয়ে সম্পন্ন করে দিতে হবে।
৪. ভূক্তভোগীদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।







