মোঃমাসুদ রানা,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধিঃ
জাতিসংঘের মঞ্চ—মানবতার সর্বোচ্চ কণ্ঠস্বর, যেখানে সত্য, ন্যায়, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে বিশ্ব বিবেক একত্রিত হয়—সেই মর্যাদাপূর্ণ অঙ্গনকে কেন্দ্র করে আজ আমরা গভীর বেদনা, ক্ষোভ এবং দায়িত্ববোধ থেকে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছি।
সম্প্রতি United Nations Permanent Forum on Indigenous Issues UNPFII-এর ২৫তম অধিবেশনে আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি জেএসএস-এর প্রতিনিধি হিসেবে অগাস্টিনা চাকমা ও চঞ্চনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তা আমাদের কাছে কেবল বিভ্রান্তিমূল কই নয়, বরং সুস্পষ্টভাবে অতিরঞ্জিত, এক পাক্ষিক এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
অগাস্টিনা চাকমা রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমান্ত সড়ক নির্মাণের বিরোধিতা করা মানে এই অঞ্চলের যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করার শামিল। সীমান্ত সড়ক শুধু একটি অবকাঠামো নয়—এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন, যা সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বন্ধ করার আহ্বান সরাসরি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অস্থিতিশীলতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার নামান্তর। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কার্যক্রম অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু নিরাপত্তা নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে যেখানে সাধারণ সেবা পৌঁছানো কঠিন, সেখানে সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তাদের কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানানো প্রকৃতপক্ষে উন্নয়ন ও সম্প্রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল।
এ প্রসঙ্গে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সভাপতি থোয়াইচিং মং চাক বলেন, এ ধরনের বক্তব্য রাষ্ট্রবিরোধী ও পাহাড়ের সাধারণ জনগণের স্বার্থবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হওয়া অমূলক নয়। কারণ এটি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের চলমান প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা বলে প্রতীয়মান হয়।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—এ ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের একটি পরিকল্পিত প্রয়াস।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়; এটি বাংলাদেশের অংশ, যেখানে বহুজাতিক, বহুসাংস্কৃতিক মানুষের সহাবস্থান একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এই অঞ্চলের ইতিহাস সংগ্রামের, সহনশীলতার, এবং শান্তির পথে অগ্রযাত্রার ইতিহাস।
সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শুধুমাত্র নেতিবাচক ও আংশিক তথ্য উপস্থাপন করা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য।
আমরা আজ স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং সকল জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরে আন্তরিক, ধারাবাহিক এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, দুর্গম অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের বহুমাত্রিক উদ্যোগ আজ বাস্তবতার মাটিতে দৃশ্যমান।
যেখানে একসময় বিচ্ছিন্নতা, অনুন্নয়ন এবং অনিশ্চয়তা ছিল—সেখানে আজ উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে গেছে। পাহাড়ের দুর্গম জনপদে আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আলো জ্বলছে, স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি এসেছে অবৈধ অস্ত্রধারী বাহিনী সংগঠনগুলো পিছপা হতে শুরু হয়েছে—এসবই রাষ্ট্রের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলাফল। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই ইতিবাচক বাস্তবতাগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিকৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
আমরা মনে করি—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু সেই অধিকার কখনোই অসত্য, বিভ্রান্তিকর এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন, রাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য প্রদানের লাইসেন্স হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখতে হলে তা হতে হবে সত্যভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল।
সিএইচটি সম্প্রীতি জোট সবসময়ই বিশ্বাস করে—পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা শুধু একটি অঞ্চলের বিষয় নয়; এটি জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমরা কোনো বিভাজন, বিদ্বেষ বা অপপ্রচারের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা বিশ্বাস করি ঐক্যে, সহাবস্থানে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে। আজ আমরা আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন কোনো এক পাক্ষিক বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত বা অবস্থান গ্রহণ না করে। বরং বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপলব্ধি করে ন্যায় সঙ্গত ও ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন করে।
পরিশেষে, আমরা আবার ও দৃঢ় কণ্ঠে বলতে চাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের সবার, এই মাটি আমাদের ঐক্যের প্রতীক, আমাদের ভবিষ্যতের আশার ভিত্তি। এই অঞ্চলকে ঘিরে কোনো ধরনের অপপ্রচার, বিভ্রান্তি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার ছিলাম, আছি, এবং থাকব। সত্যের পথে আমাদের অবস্থান অটল, ন্যায়ের পক্ষে আমাদের কণ্ঠস্বর দৃঢ়, এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা সর্বদা আপসহীন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন,
সভাপতি থোয়াইচিং মং চাক-এর নেতৃত্বে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির
সদস্য থং পং ম্রো, বান্দরবান জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ,অংসিংথোয়াই মারমা, উ থোয়াই মে মারমা,এলেক্স বড়ুয়া, পাইমংথুই মারমা প্রেম
মো. শরিফুল আলম, মো. আব্দুল কুদ্দুস এবং সূর্য ত্রিপুরাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।






