দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যুগপৎ আন্দোলনের পাশাপাশি ভোটের মাঠ গোছাচ্ছে বিরোধী মিত্ররা। সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ভিতরে ভিতরে চলছে প্রস্তুতি। নির্বাচনে বিএনপির কাছে ৫০টি আসন চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে বিএনপি এবার তাদের পুরোনো মিত্রকে এত সংখ্যক আসন ছাড়তে রাজি নয়। ২০-২৫টি আসন দিয়ে জামায়াতকে সঙ্গে রাখতে চায়।
দীর্ঘ ২২ বছরের মিত্রদের সঙ্গে এ নিয়ে চলছে দরকষাকষি। এ কারণেই যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি থেকে পিছুটান দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আসন সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলবে এবং আন্দোলন থেকেও বিরত থাকবে দলটি। আপাতত বিএনপির মনোভাব পর্যবেক্ষণ করছেন। জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।
সূত্রমতে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ৫৩ আসনের তালিকা দিলেও শেষ পর্যন্ত ২৪টির মতো আসন পায়। ওই সময় বিএনপি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে। তাদের দেয়া হয় ১৯টি আসন। জামায়াত শক্তিশালী শরিক হিসেবে এতে নাখোশ হয়। ভোট ব্যাংক ও সাংগঠনিক দক্ষতা বিবেচনায় বিএনপির পর জোটে জামায়াত সবচেয়ে শক্তিশালী। এ নিয়ে দলটির মধ্যম সারির অনেক নেতাই বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ।
এবারও জামায়াতকে আন্দোলনের কৌশলে আড়ালে রাখতে চাচ্ছে বিএনপি, যা জামায়াতের মধ্যম সারির নেতাদের তিক্ততার কারণও। তাই আন্দোলনে নামার আগেই আসন টিকিট নিশ্চিত করতে চায় দলটি। তারা মনে করে, ঐক্যফ্রন্টের মতো এবারও নির্বাচন সামনে এলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের অগ্রাধিকার দেবে বিএনপি।
শেষ মুহূর্তে আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে কদর কমে যাবে জামায়াতের। তাই আগেভাগেই আসন নিয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা করে নিতে চায় দলটি। সংসদ নির্বাচনের আসন ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা হলে ‘নির্বাচনকালীন জোটে’ শরিক হবে দলটি। তার আগে নিজেদের মতো করেই দলের কর্মসূচি পালন করে যাবে।
দলটির ঢাকা মহানগরীর শীর্ষ এক নেতা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে আমাদের মাত্র দুই ডজনের মতো আসন দেয়া হয়েছিল। তা মোটেও সন্তোষজনক ছিল না। এবার আমরা ৫০টির কম আসনে রাজি হব না। সমঝোতা না হলে জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করবে। তবে আমাদের মূল প্রতিবন্ধকতা-নিবন্ধন না থাকা। নিবন্ধনের বিষয়টি আসলে ঝুলে আছে আদালতের রায়ের ওপর।
তিনি আরও জানান, নিবন্ধন ফিরে পেতে জামায়াত নানাভাবে কাজ করছে। নিবন্ধন পেলে জামায়াত নিজস্ব প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচন করবে। নিবন্ধন না থাকায় চাপে আছে জামায়াত।
যুগপৎ আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে জামায়াতের ওই নেতা আরও জানান, মূলত আসন নিয়ে দরকষাকষি। এ নিয়ে সমঝোতা হলে আন্দোলনসহ নির্বাচনকালীন জোটে ফিরবে জামায়াত। এর আগ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলবে তারা-এটাই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত।
জামায়াতের আরেকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, বিএনপি এখন পর্যন্ত ২৫ আসন দিতে রাজি হয়েছে। তবে এবার জামায়াত তাদের টার্গেট পূরণে চেষ্টা করছে। সামনে কতগুলো আসনে নির্বাচন করবে জামায়াত, এটা আরও পরে জানা যাবে। তবে নিবন্ধন পেলে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে। তখন জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।
আপাতত বিএনপি কী করে, তা দেখতে চায় জামায়াত। তার ভাষ্যমতে, জামায়াত নিবন্ধন হারিয়ে উভয় সংকটে ভুগছে। তারা নিজস্ব প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। নিবন্ধনহীন বলে জামায়াতকে অন্য শরিকদের মতো কদর করছে না বিএনপি। অথচ সবার চেয়ে সবদিক দিয়ে যোজন যোজন এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে রাজপথে কর্মসূচি পালন ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে জামায়াতের জন্য। তৃণমূলের নেতারাও মাঠে কাজ করতে পারছেন না। কারণ নিবন্ধন নেই। এ জন্য জামায়াত নিবন্ধন ফিরে পেতে সর্বোচ্চ আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।
সূত্র বলছে, আসছে জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার পরিকল্পনা আছে জামায়াতের। নির্বাচন কমিশনে দলের নিবন্ধনের বিষয়টি আদালতে ঝুলে থাকায় আপাতত স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি রয়েছে। এ জন্য প্রার্থী ঠিক করা ও নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে দলটি। ইতিমধ্যে নেতাদের বিভাগভিত্তিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১৫০টি আসনে নিজেদের প্রার্থী ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এদিকে বিএনপির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ৩০ ডিসেম্বর রাজপথে নামলেও গণঅবস্থান, গণবিক্ষোভ সমাবেশ, পদযাত্রা কর্মসূচিতে ছিল না জামায়াতে ইসলামী। নতুন কর্মসূচি মানববন্ধনে থাকছে না দলটি। এ নিয়ে বিএনপির প্রতি ক্ষোভ ও অভিমানের কথা জানায়। আন্দোলনের মাঝপথে জামায়াতের এমন মৌন অবস্থানে যুগপৎ শরিকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
তারা বলছে, আন্দোলনে থাকা সব দল ও জোট মিলিয়েও জামায়াতের মতো শক্তি হবে না- এটা বাস্তব সত্য। বিএনপি এমন শক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, বিএনপির নেতারা গত এক মাস ধরে কোনো ফরমাল কিংবা ইনফরমাল আলোচনা করেনি আমাদের সঙ্গে। অথচ ছোট ছোট দলের অফিসে গিয়েও বিএনপি নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। আমাদের নিয়ে এমন লুকোচুরি কৌশল নেতাকর্মীরা মানতে পারেননি। তিনি কারাগারে যাওয়ার আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা ছিল। কিন্তু এখন আর সেই উদ্যোগ নেই।
দলের প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, জামায়াত শুরু থেকে নির্বাচনমুখী দল হওয়ার কারণে নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতা সারা বছরই চলমান। সামনে কতগুলো আসনে নির্বাচন করবে জামায়াত, এটা আরও পরে জানানো হবে। বিএনপির সঙ্গে আসন ভাগাভাগির প্রশ্ন এখনও আসেনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াত তার নিজের স্টাইলে চলছে। যদিও যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা রোহিত করা হয়নি। কর্মসূচি নিয়ে বিএনপিও আলোচনা করছে না। জামায়াতও উদ্যোগ নিচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, ভোটের অঙ্কের বিবেচনায় বিএনপির প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শরিক জামায়াতে ইসলামী। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না, কিন্তু জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভোটারদের ভিতর বিভ্রান্তি এড়াতে বিএনপি চাইছে এবারও তাদের শরিকরা সবাই ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করুক। তবে জামায়াতে ইসলামীর ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা নিয়ে বিএনপির মধ্যে মতভেদ আছে।
যুগপৎ আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশি সমর্থন আদায়ে কৌশলে আপাতত আন্দোলন থেকে জামায়াতকে দূরে রাখার চিন্তা আছে। তবে সময়ই সব বলে দেবে। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাকে কেন জামায়াত নিয়ে প্রশ্ন করছেন-আমাকে দল থেকে জামায়াতের দায়িত্ব দেয়া হয়নি।







