মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। কুরবানির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কামাররা। উপজেলার মিঠাছরা বাজারের কামারপাড়ায় এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত থেমে নেই লোহা পেটানোর টুংটাং শব্দ। দা, বটি, ছুরি, চাপাতিসহ কুরবানিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধারালো সরঞ্জাম তৈরিতে যেন দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের। ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন কামারপল্লিতে। কেউ নতুন ছুরি কিনছেন, কেউ আবার পুরনো দা-বটি শান দিতে আসছেন। ফলে কামারদের ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েকগুণ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের ভাটিতে লোহা গলিয়ে হাতুড়ির আঘাতে তৈরি হচ্ছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশত বছর ধরে মিঠাছরা বাজারে গড়ে উঠেছে এই ঐতিহ্যবাহী কামারপল্লি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে চলে আসছে লোহার কাজ। কুরবানির ঈদ এলেই জমে ওঠে তাদের ব্যবসা। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই মৌসুমেই সবচেয়ে বেশি আয় হয় কামারদের। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশার মতো কামার শিল্পও এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, কয়লা ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়া এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে এ পেশা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন প্রবীণ কামাররা।
উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা বিমল বিহার কর্মকার বলেন, “সারাবছরই আমাদের কাজ চলে। তবে কোরবানির ঈদ আসলে ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছি। কাস্টমারদের চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
মিঠাছরা বাজারে প্রায় ৬৫ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত সুজয় কর্মকার বলেন, “এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। কিন্তু এখনকার ছেলেরা এসব কষ্টের কাজ করতে চায় না। কাঁচামালের দামও অনেক বেড়েছে। তারপরও পেশাটা ধরে রেখেছি। ভবিষ্যতে এই শিল্প টিকবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।”
কামারদের ভাষ্য, আগে স্থানীয়ভাবে সহজেই লোহা ও কয়লা পাওয়া গেলেও এখন সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই তুলনায় লাভ হচ্ছে না। তারপরও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও ক্রেতাদের আস্থার কারণে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুরবানির জন্য ছুরি-চাপাতি কিনতে আসা আব্দুল্লাহ বলেন, “বর্তমানে সবকিছুর দাম বেড়েছে। তাই লোহার জিনিসপত্রের দামও বেশি। তারপরও কুরবানির কাজে লাগবে বলে কিনতে হচ্ছে। স্থানীয় কামারদের তৈরি জিনিস ভালো ও টেকসই হওয়ায় এখান থেকেই কিনি।”
ঈদকে ঘিরে জমে ওঠা মিরসরাইয়ের এই কামারপল্লি শুধু একটি পেশার চিত্রই নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য ও শ্রমনির্ভর জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।








