মির্জা চয়ন :
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক, বয়ঃযুদ্ধে হেরে না যাওয়া আমার দেখা এক অন্যতম স্ব-প্রণোদিত ব্যক্তির নাম, দেশের অন্যতম জীবন্ত শিক্ষাবিদ, শিক্ষা উদ্যোক্তা, মিডিয়া বিশ্লেষক, ছাত্র সমাজের মোটিভেশনাল আইকোন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম। আমি ধন্য যে, আমি সরাসরি স্যারের ছাত্র, সুশাসন আইনের মৌলিক পাঠ তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি। ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়াসহ সোশ্যাল মিডিয়া জগতে সরব রয়েছেন তিনি, বিশেষ করে বর্তমান সময়ে শিক্ষা তথা আইন শিক্ষা রূপান্তরের এক যুগপোযোগী প্রচারণায় নেমেছেন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের এই প্রবাদ পুরুষ। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে,প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা সর্বস্তরে টেকনোলজি ইন্টিগ্রেটেড শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ। তাহলে কী হবে জেন জি ও নিকট ভবিষ্যতে আগত জেন আলফা প্রজন্মের? এর উত্তর অবশ্য তিনি পূর্বেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের আইন শিক্ষার ইতিহাসে ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থীরা আধুনিক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম হাতে পায়। তাছাড়া বিভাগের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে তিনি ব্যাপক অবদান রেখেছেন। তিনি বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ও বাংলাদেশে মঞ্জরি কমিশনের উচ্চ শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ মুটকোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন, প্রতিষ্ঠা করেন কম্পিউটার ল্যাব ও ডিজিটাল লাই্রব্রেরি। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশীপসহ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও আমব্রেলা ক্লিনিক ভিত্তিক গবেষণার জন্য আমেরিকার শিকাগো শহরে অবস্থিত নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ব্লম লিগ্যাল ক্লিনিকের আদলে প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি জুরিস্টিক ক্লিনিক। আর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম প্রযুক্তি সমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ তিনিই তৈরি করেন। এ নিয়ে তৎকালে বেশ কিছু ফিচার জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক যায়যায় দিন পত্রিকায় প্রকাশিত (১৭ আগস্ট ২০১৬, পৃ. ১৩) ফিচার শিরোনাম হয় “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়-বদলে যাওয়া আইন বিভাগ”। ফিচার লেখক ও সাংবাদিক শাহজাহান নবীন লিখেছেন,
“.. এছাড়া বিভাগে এখন সব থেকে নজরে পড়ার মতো বিষয় হলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো বিভাগের মধ্যে সর্বাধুনিক এই বিভাগে রয়েছে ডিজিটাল সেমিনার লাইব্রেরি। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাইব্রেরিতে রয়েছে উচ্চ গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগসহ ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব। দেশ-বিদেশ থেকে নানা ধরনের বিখ্যাত আইনি বই পুস্তক সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ করা হয়েছে লাইব্রেরিকে। এমনকি প্রত্যেক শিক্ষককের ব্যক্তিগত অফিসেও দেয়া হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার। বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ অফিস, প্রত্যেকটি শ্রেণিকক্ষ ও করিডোর এখন সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া মুট কোর্ট ট্রেনিংয়ের জন্য রয়েছে নিজস্ব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মুট কোর্ট গ্যালারি। যেখানে বিভাগের শিক্ষার্থীদেরকে বিচারক ও পেশাজীবী আইনজ্ঞদের সামনে হাতে কলমে বিচারিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান দান করা হয়।”
তিনি তাঁর ফিচারে বিভাগের এই অর্জনের মূল কারিগরের নাম উল্লেখ না থাকায় দুঃখ প্রকাশ করে ফেইসবুক প্রোফাইলে পোস্ট দিয়ে লেখেন, “কেমন হয়েছে জানি না। তবে মনে একটা কষ্ট রয়ে গেল। চেয়ারম্যান স্যারের (প্রফেসর ড. মো. জহুরুল ইসলাম) বক্তব্যটা মিস করছি। এভাবে স্যারের বক্তব্য এডিট করে আমার বুকে ছুরি চালানো হয়েছে। ক্ষমা করবেন স্যার Mohammad Johurul Islam আমি পারিনি আপনার বার্তা সবার কাছে পৌছে দিতে। ক্ষমা করে দিবেন এই অভাগাকে…………….
এর ২ মাস পরেই শাহজাহান নবীন “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ঃসফলতার স্বাক্ষরে আইন বিভাগ” শিরোনমে আরেকটি ফিচার লেখেন (দিনিক যায়যায় দিন, ২৬ অক্টোবর ২০১৬, পৃ. ১৩) যেখানে তিনি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহুরুল ইসলামের বক্তব্য উল্লেখ করে লেখেন,
“বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জহুরুল ইসলাম তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন- বিভাগের শ্রদ্ধাভাজন সকল শিক্ষকের সহযোগিতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইউজিসির উচ্চ শিক্ষা মান উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক অনুদানে ইবি আইন বিভাগ হবে একটি মডেল বিভাগ। এ বিভাগের থাকবে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি যা এখন অনেকটাই এগিয়ে। বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল লিগ্যাল এডুকেশনের পথিকৃত হতে চলেছে এই বিভাগ। ইতোমধ্যে আমেরিকার নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে আইন বিভাগ।” তিনি আরো উল্লেখ করেন, “…কোর্স কারিকুলামের ব্যাপক পরিবর্তন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অতি দ্রুত টিচিং ম্যাটেরিয়াল্সসহ আধুনিক কোর্স কারিকুলাম প্রণীত হবে যা বিভাগকে অতি দ্রুত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করবে। সেজন্য প্রশাসনসহ সকল মহলের সহযোগিতা তিনি কামনা করেন। এরপর ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে দৈনিক যায় যায় দিন পত্রিকায় ”উচ্চ শিক্ষায় পছন্দের তালিকায় আইন” (পৃ. ১২) শিরোনামে আরেকটি ফিচার লিখেন রায়হান মাহবুব। সেখানেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সামগ্রিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। তাছাড়া জুরিস্টিক ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম নিয়ে জাতীয় পত্রিকায় বহু নিউজ আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শিক্ষায় গমনের পূর্ব পর্যন্ত তিনি জুরিস্টিক ক্লিনিকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এ সময়ের মধ্যে স্থানীয় আইনজীবী সমিতির সাথে সমঝোতা স্বাক্ষরের মাধ্যমে আইন শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশীপ কার্যক্রম শুরু হয় তাঁর হাত ধরেই। গত ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি তাঁর অবদানের একজন অন্যতম সুবিধাভোগী। বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার শাইলকাটি গ্রামে ১৯৭৪ সালের পহেলা ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন দেশের প্রখ্যাত এই শিক্ষাবিদ । পাশের গ্রামের সুলতানপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের পাঠ চুকান এই গুণী ব্যক্তি। তারপর মাধ্যমিকের যাত্রা সুলতানপুর হাই স্কুলে শুরু করলেও কয়েকটি স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়। খলিলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শিবরামপুর আরডি একাডেমি এবং সর্বশেষ বসন্তপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে মাধ্যমিকের (এসএসসি) পর্ব শেষ করে ফরিদপুরের বিখ্যাত সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে বিজ্ঞান শাখায় উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি ) সম্পন্ন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষে অনার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হন এবং ১৯৯৭ সালে অনার্স ও ১৯৯৮ সালে কৃতিত্বের সাথে মাস্টার্স শেষ করেন। সমাজ এবং শিক্ষা সচেতন অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম কর্মজীবন রাজবাড়ী জেলা আদালতে কাজ শুরু করলেও ১৯৯৮ সালের দিকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেন। কিন্তু শিক্ষক হওয়া যার পণ! ডাক পেয়ে যান কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে যোগদানের। ফলে শিক্ষা খাতে বিশেষ অবদান রাখার পথ সুগম হয়। তিনি ২০০৩ সালে সহকারী অধ্যাপক, ২০০৭ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০১২ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। বলা বাহুল্য ২০০৬ সালে আইনাঙ্গনে দেশের সর্বকনিষ্ঠ রিসার্চার হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এই গুনী ব্যক্তি। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি সহকর্মীদের সাথে যেমন বন্ধুসুলভ তেমনি শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিয় শিক্ষাগুরুর মর্যাদা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজেও রেখেছেন তার পদাচারণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের আধুনিকরণ ও পাঠদান নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রমে মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন মডেল আইন বিভাগ। আধুনিক শিক্ষা পাঠক্রমে তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আজকের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে সেশনজট নিরসনে নেন সুপার ডিসিশন যা সেজনজট মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় অগ্রণী ভুমিকা রাখছে। তার প্রতিটি প্রাণবন্ত পাঠক্রম ছাত্র-ছাত্রীরা মনোমুগ্ধকর হয়ে শুনেন। তার চমৎকার ব্যাক্তিত্ব ও বাচনভঙ্গির জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগে তিনি পরিচিতি মুখ এবং সর্বমহলে প্রশংসনীয় একজন। তিনি একজন তরুণ উদ্যোক্তা এবং শিক্ষা হিতৈষী ব্যাক্তিত্ব। তার ফলশ্রতিতে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে শিক্ষার অনন্য সুযোগ তৈরি করে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্বপ্নের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম। তিনি শিক্ষা আধুনিকায়ন ও আইন শিক্ষা রূপান্তরে টেকনোলজি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। কাজ করছেন ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, এইআই সহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে। তাঁর বেশ কয়েকটি ইন্সট্রাকশনাল ভিডিওসহ ওয়েব-বেইজড ও ই-লার্নিং মডিউল প্রকাশিত হয়েছে। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আমেরিকা ভিত্তিক মেকজুলিয়ান গ্র্যাজুয়েট সুডেন্ট ২০২৪ পদকে ভূষিত হন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডেকোটায় শিক্ষা টেকনোলজি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য অবস্থান করছেন। আমার বিশ্বাস তিনি আধুনিক এবং বাস্তবমুখী আইন শিক্ষার এক আলোকবর্তিকা রূপে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ ভূমিকা রাখবেন।
Post Views: 828
Related