প্রেস বিজ্ঞপ্তি
অধ্যাপক কবীর চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ও আলোচনা সভায়
আজ ৯ ফেব্রুয়ারি (২০২৪) বিকেল ৩টায় ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী আন্দোলনের পুরোগামী নেতা প্রয়াত অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর জন্মদিন উপলক্ষে জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি জনাব ওবায়দুল হাসান।
অনুষ্ঠানে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল এবং সঞ্চালনা করেন নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান নাট্যজন আসিফ মুনীর।
উক্ত অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট’-এর সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টে র সভাপতি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার নাদিয়া চৌধুরী।
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি জনাব ওবায়দুল হাসান প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশে নিজস্ব আইনে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার কার্যক্রমের এখতিয়ার ও বৈধতা এবং স্বচ্ছতা ও মান প্রশ্ন্নাতীত এবং যে কোন বিভ্রান্তিমুক্ত। জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধ তা বিশে^র যেখানেই সংঘটিত হোক না কেন সেটির বিচার হতেই হবে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে ১৯৭১ এ কোন অঞ্চলে কি মাত্রায় জেনোসাইড হয়েছে সেই নির্মম সত্যটিকে বের করে আনতে হবে। আমরা খুলনার চুকনগর, গল্লামারি, বটিয়াঘাটার নানা বধ্যভূমির কথা জেনেছি। আমার মনে হয় আজও আমাদের দেশের অনেক বধ্যভূমি অনাবিস্কৃত রয়ে গেছে। আমার এবং জাতির প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও বিশিষ্টজন তাঁদের সক্রিয় ও সক্ষম গবেষণায় এই সত্য তুলে আনতে পারবেন। বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণ ও সুরক্ষা নির্মম সত্যের প্রতীক হয়ে রইবে। আর এই সত্য জাতিকে ও নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি সদা শ্রদ্ধাবনত রাখবে। সেই সাথে তারা থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সদা সক্রিয় ।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে নির্মম সত্য ট্রাইব্যুনালের বিচারের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে এবং আসছে সেটি তরুণ প্রজন্মকে জানতে হবে যেন তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যায় এবং এক সুরক্ষিত মানবিক মানবগোষ্ঠি ও মানবিক এক বিশে^র জন্য এই উচ্চরাণে সদা উচ্চকিত থাকে যেÑ ‘নেভার এগেইন’। আসুন সবাই বিনম্র্র শ্রদ্ধা জানাই ৩০ লাখ শহিদদের ও ২ লাখ মা বোনদের যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ এখানে, স্বাধীন মাতৃভূমি বাংলাদেশে।’
অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জনাব ওবায়দুল হাসান আরো বলেন, ‘কবীর চৌধুরী আজীবন ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে, সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায় তারা অধ্যাপক কবির চৌধুরীকে নিয়ে গুজব ছড়াতো। তাঁকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে হুমকি দিতো। তারা ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রাজনীতি করে। সমাজে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ায়। অথচ বঙ্গবন্ধু তাঁর দল থেকে মুসলিম শব্দটি ১৯৫৫ সালে বাদ দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক দল গঠন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছেন। এখন দায়িত্ব আমাদের নতুন প্রজন্মের। মুক্তাযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মান করার জন্য তরুণদেরকে কাজ করে যেতে হবে।’
অধ্যাপক কবীর চৌধুরী স্মারক বক্তৃতায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল বলেন, ‘বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি ট্রাইব্যুনালে ৩০টি মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং একটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। এই মামলাগুলোতে আনুমানিক ২০০ জন অভিযুক্ত আসামি রয়েছেন। এই মামলাগুলোতে সাক্ষ্য প্রদান করবেন ২০০ থেকে ২৫০ সাক্ষী। তদন্ত সংস্থার কাছে আরো ৫০০ থেকে ৬০০ মামলা তদন্তের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। মামলা সমূহের আসামি এবং সাক্ষী সকলেই এখন ৭০-ঊর্ধ্ব। প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়তো আর তিন চার বছর পর এদের কাউকেই আমরা বিচারের জন্য পাবো না। অথচ ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার অধিকার তখনও অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই খুব দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘২০১৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ ও ২ চলমান ছিল। পূর্বের ন্যায় দুইটি বা প্রয়োজনে তিনটি ট্রাইব্যুনাল করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চলমান মামলাগুলো নিষ্পন্ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে যাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি বা সত্য জানার অধিকার অপূর্ণ থেকে যাবে। এই বিচারের বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে, বিচারক ও প্রসিকিউটরদের বাড়িতে হামলা হয়েছে, সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, গুম করা হয়েছে,এমনকি দুজন সাক্ষীকে হত্যাও করা হয়েছে। এতদসত্ত্বেও, ট্রাইব্যুনালের বিচারক, প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থা অত্যন্ত সাহস, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে এই বিচারকার্য পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছেন।’
‘ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট’-এর সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর মতো এত অনুবাদ বোধ হয় আমাদের দেশে কেউ করেননি। তাঁর বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক এবং ইংরেজি থেকে বাংলা গ্রন্থ ৭৫-এর কম নয়। একদিকে যেমন তিনি বাংলাদেশের সহিত্যকে অনুবাদের মাধ্যমে বিদেশে পরিচিত করিয়েছেন, অপরদিকে বিশ্বসাহিত্যকে বাঙালি পাঠকের কাছে নিয়ে এসেছেন। একই সাথে তিনি চিন্তাশীল প্রবন্ধ রচনা করে গেছেন নিরলসভাবে। বিশেষ উপলক্ষে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার অনুরোধে তিনি নিবন্ধ লিখেছেন, সারগর্ভ লিখিত বক্তৃতাও করেছেন অনেক।’
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘কবীর চৌধুরী সমাজকে দেখিয়েছেন সঠিক পথে দিশা। ব্রাত্যজনকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার সুকঠিন দায়িত্ব তাঁর আজীবনের প্রত্যয় ছিল। বাংলাদেশের চার রাষ্ট্রীয় আদর্শের পরিপন্থী সংগ্রামে রড় অপশক্তির ধর্মান্ধতা। সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গি মৌলবাদ, সন্ত্রাস ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের ঘোর বিরোধিতা করেছেন আজীবন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মৌলবাদ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে গঠিত একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে শহীদজননীর পাশে থেকেছেন প্রথম থেকে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণআদালতের অন্যতম বিচারকও ছিলেন। বিশেষ ট্রাইবুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির জন্য যত সভা, মিছিল, আন্দোলন, মানববন্ধন হয়েছে সবকিছুই ব্যানার ধরে সম্মুখসারিতে থেকেছেন। সকলের অনুপ্রেরণা ছিলেন তিনি শুধু আন্দোলনই নয় ব্যক্তিগত জীবনাচরণেও।’
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতে ইসলামীর মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে ৩২ বছর আগে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলন সূচিত হয়েছিল এর প্রধান নেতাদের অন্যতম অধ্যাপক কবীর চৌধুরী।’
তিনি আরো বলেন, ‘জঙ্গি মৌলবাদের পূর্ণগ্রহণ আজ গ্রাস করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সূর্যকে। এই সময় আমরা বার বার শুনতে চাই অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর অতি পরিচিত উচ্চারণÑ ‘অন্ধকার কখনও স্থায়ী হয় না, সত্যের জয় অনিবার্য, আমরা লড়ছি সত্য ও ন্যায়ের জন্য, আমরা অবশ্যই জয়ী হব…’। তিনি কায়িকভাবে আমাদের সঙ্গে না থাকলেও মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার পক্ষে তাঁর রচনাবলী আমাদের ঝড়ের রাতে বাতিঘরের মতো আলো জ্বেলে পথ দেখাচ্ছে। আমরা সেই আলোর পথযাত্রী। আমাদের পথ যত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ, দুর্গম হোকÑ আমরা অবশ্যই গন্তব্যে পৌঁছব।’
১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘নির্মূল কমিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর, মৌলবাদ ও ঘাতকবিরোধী আন্দোলনে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী প্রধান ভূমিকা পালন করেন। বিএনপি-জামায়াত আমলে যখন জঙ্গি মৌলবাদকে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছিল তখন অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃতে নির্মূল কমিটি জঙ্গি মৌলবাদ রোধে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছে। এখনও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি অধ্যাপক কবির চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনলাইনে অনেক বিদ্বেষমূলক ভিডিও ছড়াচ্ছে। বিটিসিএলের উচিৎ এসব ভিডিও সরিয়ে গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
‘কবীর চৌধুরী চারদশক আমাদের জেনারেশনের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক সমাজ রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে গেছেন, জঙ্গি মৌলবাদ, অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। সারাটা জীবন শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশের কয়েক জেনারেশন তাঁর ছাত্র। আমাদের প্রবন্ধ ও অনুবাদ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। আমাদের এই বিষয়টিই দেখাতে চেয়েছেন, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালিত করতে হবে।’
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার নাদিয়া চৌধুরী বলেন, ‘স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে হিজড়াদের গল্প একটি নিয়ে বিতর্ক থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে মন্দির ভাঙচুরের মাধ্যমে আমাদের এই দেশে মৌলবাদের যে একটি ক্রমবর্ধমান উত্থান ঘটছে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু আমরা এই দেশ গড়েছিলাম মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মূল নীতির ভিত্তিতে। আমাদের মধ্যে যারা এখনও এই নীতিগুলিকে ধারণ করেন তারা কবির চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বকে খুঁজে ফেরেন অনুপ্রেরণার আশায়।’








