বহু আগেই লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুযোগ হয়নি। তারেক রহমান কিংবা বিশ্বনেতারা এস্ট্রলজি, নিউমারলজি সহ আধ্যাত্মিক অনেক বিষয়কে গুরুত্বের সাথে দেখেন এবং শুধু নেতা না, অনেক দেশেও এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
তারেক রহমানেরটা শেষের দিকে লিখছি। এখন শেখ হাসিনারটা বলি। প্রথমবার ক্ষমতায় আরোহনের আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ওয়াজেদ বহু প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছিলো। তখন, একজন এস্ট্রলজারের পরামর্শে, নাম থেকে স্বামীর নাম ‘ওয়াজেদ’ বাদ দিয়ে, হয়ে গেলো ‘শেখ হাসিনা’। এরপর থেকেই তাকে আর কেউ ঠেকাতে পারেনি। যেভাবেই হোক ক্ষমতায় এসেছে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থেকেছে।
শুধু তাই না। ভারতের একজন অভিনেতা, পঙ্গজ ত্রিপাঠিও তার একটি সাক্ষাৎকারে ‘তিউয়ারি’ থেকে ‘ত্রিপাঠি’ করার ঘটনা বর্ণনা করেন। যা, হাসিনা ওয়াজেদের মতোই ঘটনা।
এবার একটু পশ্চিমে যাই। আমরা এশিয়রা ‘পশ্চাদপন্থী’, তাই আমরা এগুলো মানি, ব্যপারটা এরকম মনে হলে, একটু পশ্চিম থেকে ঘুরে আসা যাক।
আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রায় ২০০ বছর ধরে একই দিনে হয়। এর মধ্যে কত যুদ্ধবিগ্রহ গিয়েছে, বিশেষত, দুই দুইটা বিশ্বযুদ্ধ গিয়েছে! তবুও তারিখ পেছানো হয়নি। সময়টাও খুবই অদ্ভুৎ একটা তারিখে। নভেম্বরের ২ থেকে ৮ তারিখের মধ্যে, যে মঙ্গলবার পড়ে, সেই মঙ্গলবারে। এটার খুবই পুরাতন এস্ট্রলজি ও নিউমারলজির হিসাব আছে।
নভেম্বর মানে পশ্চিমা এস্ট্রোলজিতে মূলত Scorpio থেকে Sagittarius তে ট্রানজিশন। Scorpio হলো মৃত্যু, নবনির্মাণ, পুরোনো শক্তির পতন, গোপন ক্ষমতার সময়। রাজনৈতিক ভাষায় এটা পুরোনো শাসনের শেষ অধ্যায়।
এরপর Sagittarius আসে, আইন, আদর্শ, রাষ্ট্র, ভবিষ্যৎ ভিশন, এগুলো নিয়ে। নির্বাচন যদি এই দুই শক্তির মাঝামাঝি হয়, তাহলে প্রতীকীভাবে এটা বোঝায় যে, পুরোনো ক্ষমতা ছাড়ছে, নতুন ক্ষমতা ঢুকছে। পুরনো ক্ষমতা ঢুকলেও নতুন আদর্শ নিয়ে ঢুকছে।
তাছাড়াও, এক্ষেত্রে মঙ্গলবার নিজেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। Tuesday শাসিত Mars দ্বারা মূলত যুদ্ধ, সিদ্ধান্ত, অ্যাকশন, কনফ্লিক্ট বোঝানো হয়। ভোট মানে তো আসলে এক ধরনের সংঘাতহীন যুদ্ধ। Mars এর দিনে সিদ্ধান্ত নিলে শক্তির প্রকাশ হয় এবং সেটা সংগঠিত থাকে।
Monday শাসিত Moon দ্বারা, জনমত, আবেগ, গণমানুষ। Monday এর পরে Tuesday মানে, প্রথমে জনগণের আবেগ স্থির করা, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া। এটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু শক্তিশালী।
শুধু এস্ট্রলজি না। নিউমারলজিতেও দিনটা গুরুত্বপূর্ণ।
11 নিউমারোলজিতে Master Number। এটা নেতৃত্ব বদল, ‘collective awakening’ এবং জাতিগত ভাবে বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংখ্যা। নির্বাচনের দিন হলো ২-৮ তারিখের মধ্যে।
2 মানে partnership, balance, opposition।
8 মানে power, authority, state control।
মানে পুরো দিনটার নিউমারোলজিকাল স্পেকট্রাম দাঁড়ায়:
জনগণ – 2
ক্ষমতা – 8
আর এর ওপর মাস হিসেবে 11 কাজ করে, collective shift হিসেবে। আরেকটা বিষয় হলো।, এই নিয়মটা বারবার রিপিট হয়। এস্ট্রলজিতে ‘repetition’ মানে ‘ritualisation of power’।
আর, আমেরিকার এস্ট্রলজি ও নিউমারলজি বিশেষজ্ঞরা জানে, যে রাষ্ট্র, ‘সময়কে ‘ritual’ বানাতে পারে, সে রাষ্ট্র নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী করে রাখতে সক্ষম হয়।
এটা কি তাহলে অমুসলিমদের জন্য? না। ইসলামেও নিউমারলজি আছে। ‘আবজাদ অর্ডার’। শায়খুল আকবর ইবনুল আরাবীর সংখ্যাতত্ব। যারা আর্তুগ্রুল দেখেছেন, সেখানে নিশ্চয়ই শায়খুল আকবারের নাম শুনেছেন। আর, একাডেমিশিয়ান ও গবেষকরা তো জানেনই।
সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটা বিষয় কেস স্টাডি হতে পারে, হয়েছেও অনেকাংশে, সেটা হলো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর রাজনীতিতে পদার্পণ এবং পরবর্তী সাফল্য। তাছাড়াও, অতীতের অনেক মুসলিম শাসক এই ধরনের বিদ্যার উপর পারদর্শীদের সাথে নিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন, সেগুলোও সংক্ষিপ্ত আকারে লিখছি। সম্ভব হলে ভবিষ্যতে কোথাও লিখবো বা বলবো।
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট অভিযানের আগে তার দরবারে গ্রিক জ্যোতিষীরা নিয়মিত আকাশ পর্যবেক্ষণ করত। তার জন্মছক নিয়ে নিজেও আগ্রহী ছিলেন বলে প্রাচীন গ্রিক সূত্রে উল্লেখ আছে। অনেক যুদ্ধযাত্রার সময় নির্ধারিত হয়েছে গ্রহের অবস্থান দেখে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল পারস্য অভিযানের সময় নির্ধারণ। প্লুটার্ক লিখেছেন, এশিয়া অভিযানে রওনা হওয়ার আগে দরবারি জ্যোতিষীরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করে সময়কে অনুকূল ঘোষণা করে। বিশেষ করে গ্রানিকাস নদীর যুদ্ধের আগে সময় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ গ্রহগত সংকেতকে অশুভ মনে করা হচ্ছিল। পরে সময় বদলে আক্রমণ হয় এবং সেটাই তার প্রথম বড় বিজয়। আলেকজান্ডার নিজেকে ‘নক্ষত্রচিহ্নিত’ বলে বিশ্বাস করতেন।
রোমের প্রথম সম্রাট অগাস্টাস বিশ্বাস করতেন তার ক্ষমতা সময় ও নক্ষত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। রোমান ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো, রিপাবলিক থেকে এম্পায়ারে রূপান্তর। তিনি নিজের জন্মরাশি Capricorn কে ক্ষমতার প্রতীক বানানোর জন্য “Augustus” উপাধি গ্রহণ করেন। নতুন ক্যালেন্ডার সংস্কার এবং সাম্রাজ্যিক উৎসবের তারিখ, সবই এমনভাবে সাজানো হয় যাতে তার শাসনকে কসমিক অর্ডারের অংশ মনে হয়।
আব্বাসীয় দরবারে মুনাজ্জিম থাকা ছিল স্বাভাবিক। হারুনুর রশিদ সময় বাগদাদে জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষ একই কাঠামোয় কাজ করত। শহরের সম্প্রসারণ ও দরবারি সিদ্ধান্তে হিসাব করে শুভ সময় গণনা করা হতো। হারুনুর রশিদের সবচেয়ে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল বাগদাদকে বৈশ্বিক জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। শহরের সম্প্রসারণ, প্রাসাদ নির্মাণ ও দরবারি অনুষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট সময় ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা অনুযায়ী নির্ধারিত হতো। বাইতুল হিকমার কার্যক্রমও ক্যালেন্ডারভিত্তিকভাবে সাজানো ছিল।
চেঙ্গিস খান নিজে শামানিক বিশ্বাসে বড় হয়েছেন। নীল আকাশ তথা ‘Eternal Blue Sky’ ছিল তার ক্ষমতার বৈধতার প্রতীক। অভিযানের সময়, দিক ও মৌসুম নির্ধারণে আকাশের সংকেত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চেঙ্গিস খানের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত, মঙ্গোল অভিযানের সময় নির্ধারণ, নির্ভর করত আকাশ ও মৌসুমের সংকেতের ওপর। শামানরা “Eternal Blue Sky” এর ইশারা ব্যাখ্যা করত। সেই হিসেবে নির্দিষ্ট সময় বেছে নেওয়া হতো।
মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে জ্যোতিষ ছিল রাষ্ট্রীয় জ্ঞানের অংশ। রাজ্যাভিষেক, নগর নির্মাণ, বড় সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই সময় ও সংখ্যা দেখা হতো। আকবরের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো, ফতেহপুর সিক্রি নগর প্রতিষ্ঠা। শহরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, নকশা ও দিকনির্দেশে সময় ও সংখ্যার প্রতীকী ব্যবহার ছিল। দরবারি মুনাজ্জিমরা শুভ সময় নির্ধারণ করেছিল।
সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রকাশ্যে জ্যোতিষ এড়িয়ে চলতেন, কিন্তু দরবারি পর্যায়ে সময়-গণনা ও মৌসুমি হিসাব গুরুত্ব পেত। আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য অভিযান ইতিহাসের অন্যতম বড় সামরিক সিদ্ধান্ত। এখানে তিনি জ্যোতিষকে প্রদর্শনী হিসেবে ব্যবহার না করলেও, অভিযান শুরুর সময়, সেনা সরানোর মৌসুম ও চাঁদের পর্যায় গুরুত্ব পায়।
রাণী প্রথম এলিজাবেথের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন জন ডি। যিনি একাধারে জ্যোতিষী, গণিতবিদ ও কূটনীতিক। রাজ্যাভিষেকের তারিখ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি জ্যোতিষীয় পরামর্শ নিতেন। এলিজাবেথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল স্প্যানিশ আর্মাডার বিরুদ্ধে অবস্থান। তার রাজ্যাভিষেক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘোষণার সময় নির্ধারণে জন ডি জ্যোতিষীয় পরামর্শ দেন।
নেপোলিয়ন প্রকাশ্যে জ্যোতিষ নিয়ে ঠাট্টা করলেও ব্যক্তিগতভাবে শুভ সময় ও প্রতীক মানতেন। তারিখ, নাম, প্রতীক, এসব বিষয়ে তার সচেতনতা ছিল। সমসাময়িকরা এটাকে “private superstition” বলে উল্লেখ করেছেন। নেপোলিয়নের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল, নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করা। অভিষেকের তারিখ, অনুষ্ঠান ও প্রতীক নির্ধারণে সংখ্যাগত ও ঐতিহাসিক প্রতীক ব্যবহার হয়। যদিও তিনি প্রকাশ্যে জ্যোতিষকে তুচ্ছ করতেন, ব্যক্তিগতভাবে শুভ সময় ও প্রতীকে বিশ্বাস রাখতেন বলে সমসাময়িক নথিতে পাওয়া যায়।
নাৎসি শাসনে জ্যোতিষ, প্রতীক ও সংখ্যার ব্যবহার ছিল ব্যাপক। হিটলারের আশপাশে জ্যোতিষী ও occult পরামর্শদাতা ছিল বলে নথিভুক্ত আছে। প্রতীকী তারিখ ও সংখ্যার প্রতি তার আগ্রহ স্পষ্ট। হিটলারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিখ্যাত সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল, নাৎসি প্রতীক ও র্যালির সময় নির্বাচন। নাৎসি ক্যালেন্ডার, নির্দিষ্ট তারিখ ও সংখ্যার পুনরাবৃত্তি ছিল পরিকল্পিত। জ্যোতিষ ও occult পরামর্শদাতারা এই প্রতীকী রাজনীতিতে ভূমিকা রাখে।
রোনাল্ড রেগানের স্ত্রী ন্যান্সি রেগান নিয়মিত জ্যোতিষীর পরামর্শ নিতেন। হোয়াইট হাউসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ ও ভ্রমণ এই পরামর্শ অনুযায়ী-ই ঠিক করা হতো, যা পরবর্তীতে সরকারি নথিতেও স্বীকৃত হয়। রোনাল্ড রেগানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নথিভুক্ত ঘটনা হলো, হোয়াইট হাউসের বহু গুরুত্বপূর্ণ সূচি জ্যোতিষীর পরামর্শে ঠিক করা। বিশেষ করে ‘assassination attempt’ এর পর রাষ্ট্রীয় ভাষণ, ভ্রমণ ও বৈঠকের সময় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এটা প্রশাসনিক স্মৃতিকথায় স্বীকৃত।
১১. বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের সময়, মাথার ওপর কোরআন শরীফ রাখতেন। এটার ভিডিয়ো-ও আছে ইউটিউবে। এর পাশাপাশি তিনি হাতে একটি ছোট ফিতা বাঁধতেন, যার ভেতরে টাকা রাখা হতো, আর নিয়মিত সেটা সদকা দিয়ে দেওয়া হতো। শপথ, যাত্রা, গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের আগে এই কাজগুলো তিনি করতেন। তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য, প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসা।
এরদোয়ানের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব স্পষ্ট। তিনি নির্বাচনের আগে নিয়মিত ফজরের পর বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুশীলনের কথা বলেছেন। ২০০২ সালে AKP-এর উত্থান, ইস্তানবুলের মেয়র হিসেবে সাফল্য, এই সময়গুলোতে তিনি নিজেকে আধ্যাত্মিকতার চর্চা করেছেন। আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক হয়েও তিনি আধ্যাত্মিক রুটিনকে গোপন করেননি। এরদোয়ানের শায়খ তুর্কির একজন সর্বজন সম্মানিত শায়খ।
সফলতার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো যেমন আছে, অসফলতার ক্ষেত্রেও আছে। অসফলতার কয়েকটি উদাহরণ দেই।
হিটলারের শেষ অধ্যায়টাই সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। নাৎসি জার্মানিতে একাধিক জ্যোতিষী ও occult উপদেষ্টা ছিল, যারা ১৯৪১–৪২ সালের পর থেকে তাকে পূর্বমুখী যুদ্ধ (সোভিয়েত ইউনিয়ন) নিয়ে সতর্ক করেছিল। বিশেষ করে স্টালিনগ্রাদের অভিযানকে “অশুভ সময়” বলা হয়েছিল। হিটলার সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, তার ইচ্ছাই ভাগ্য। ফলাফল, স্টালিনগ্রাদে পরাজয়, তারপর একের পর এক ভাঙন, শেষ পর্যন্ত বার্লিন বাঙ্কারে আত্মহত্যা।
১৮১২ সালে, নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ ছিল তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সমসাময়িক সূত্রে পাওয়া যায়, তার আশপাশের কিছু পরামর্শদাতা, যাদের মধ্যে সময় ও মৌসুম বোঝা মানুষও ছিল, তারা এই অভিযানের সময় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। নেপোলিয়ন শুনলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন নিজের “স্টার” কখনো ডুববে না। ফলাফল হলো ভয়াবহ শীত, সেনাবাহিনীর ধ্বংস, এবং শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের পতন।
আলেকজান্ডারের শেষ বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল বাবিলনে অবস্থান করা। তার জ্যোতিষীরা ওই শহরকে তার জন্য অশুভ বলেছিল। প্লুটার্ক লিখেছেন, তাকে সেখানে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। আলেকজান্ডার সেটা উপেক্ষা করেন। বাবিলনেই তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান।
“Beware the Ides of March”, এই সতর্কবাণী ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর একটি। জ্যোতিষী স্পুরিন্না জুলিয়াস সিজারকে ১৫ মার্চ সতর্ক করেছিলেন। সিজার এটাকে উপহাস করেন। সেদিনই সিনেটে তাকে হত্যা করা হয়।
আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য অভিযান নিয়ে দরবারি মহলে মৌসুম ও সময় নিয়ে সন্দেহ ছিল। দাক্ষিণাত্য অভিযানের শুরুতে তিনি সময়, মৌসুম ও বাস্তবতার হিসাব মেনে অগ্রসর হন। এটা তাকে সামরিকভাবে সফল করে। এটা প্রথম পর্ব। কিন্তু, একই অভিযানে তিনি যখন বুঝতে পারেন যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না, তখন “শেষের সংকেত” উপেক্ষা করেন। যুদ্ধ জেতা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভেঙে পড়ে।
সাদ্দাম হুসেইনের ক্ষেত্রে তারিখ ও প্রতীকের প্রতি অদ্ভুত আসক্তি ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালের যুদ্ধের আগে অনেক পরামর্শ উপেক্ষা করা হয়। ফলাফল, ইরাক আক্রমণ, শাসনের পতন, বন্দিত্ব ও ফাঁসি।
গাদ্দাফি প্রতীক ও জ্যোতিষে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু আরব বসন্তের সময় নিজের পতনের সংকেত উপেক্ষা করেন। বহু সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতা ছাড়েননি। ফলাফল, গৃহযুদ্ধ, নির্মম মৃত্যু।
নিক্সনের হোয়াইট হাউসে জ্যোতিষ ও সময় নির্ধারণের চর্চা ছিল, কিন্তু ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময় রাজনৈতিক ও নৈতিক সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়। ফলাফল, প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পদত্যাগ।
বেনজির ভুট্টো সফরে যাওয়া না যাওয়ার ব্যাপারে আধ্যাত্মিক সতর্কতা মানতেন। কিন্তু ২০০৭ সালে পাকিস্তানে ফেরার সিদ্ধান্তে তার ঘনিষ্ঠ মহল ও কিছু আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা তাকে সতর্ক করেছিলেন, তিনি নিজেই আত্মজীবনীতে “foreboding” অনুভূতির কথা লেখেন। তিনি সেই ভয় অগ্রাহ্য করেন। ফলাফল, রাওয়ালপিন্ডিতে হত্যাকাণ্ড।
সাদ্দাম নিয়মিত কোরআনিক তাবিজ রাখতেন এবং কিছু নির্দিষ্ট দিন এড়িয়ে চলতেন। ২০০৩ সালের আগ্রাসনের আগে তার ঘনিষ্ঠরা লিখেছিলন, তিনি নিজেই বলেছিলেন “স্বপ্নগুলো ভালো না”। তবুও তিনি পথ বদলাননি।
আরাফাত সবসময় কোরআন সঙ্গে রাখতেন এবং স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতেন। অসলো চুক্তির আগে তার নিকটজনরা উল্লেখ করেছেন, তিনি স্বপ্ন ও অন্তর্দ্বন্দ্বে ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভেতরের সতর্কতা অগ্রাহ্য করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি নিজেই বলেছিলেন, “আমি কিছু সংকেত বুঝেও অগ্রাহ্য করেছি।”
ইমরান খান নিজে স্বপ্ন ও ইলহামের কথা বলেন। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে তিনি বারবার বলেছেন, “আমি সংকেত পাচ্ছি।” কিন্তু বিভিন্ন বাস্তবতায় তিনি সেই সংকেত অনুযায়ী পিছু হটেননি।
এস্ট্রলজি আর নিউমারলজির হিসেবে, ফেব্রুয়ারি এবং আগস্ট মাস সারা বছরের অন্যান্য মাস থেকে আলাদা। কেন আলাদা?
বড় রাজনৈতিক ঘটনা, নির্বাচন, প্রত্যাবর্তন, শপথ, ক্ষমতা হস্তান্তর, এসব প্রায় কখনোই ফেব্রুয়ারি বা আগস্টে রাখা হয় না। কেউ কেউ কাকতালীয় মনে করতে পারেন, তাতে কোনও অসুবিধা নাই। কিন্ত, কাকতালের বাইরেও একটা জগৎ আছে।
ফেব্রুয়ারি হলো বছরের সবচেয়ে অসম্পূর্ণ মাস। দিন কম, সচরাচর ছন্দের গতিতেতে না চলা ভাঙা একটা মাস। শীত পুরোপুরি শেষ হয়নি, আবার বসন্তও আসে এবং উষ্ণতারও প্রত্যাবর্তন ঘটে।
এস্ট্রোলজির ভাষায় এটা ‘ট্রানজিশন উইদাউট ক্লোজার’। সরল বাঙলায়, এস্ট্রলজির হিসেবে, রাজনীতিতে ফেব্রুয়ারি মানে ‘ঝুলে থাকা শক্তি’।
নিউমারোলজিতে ২ এর শক্তি প্রবল। এর দ্বারা বোঝায়, দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও টানাপোড়েন। স্বাভাবিক সময়ে, বড় ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘোষণা এই মাসে দিলে সেটার বিরুদ্ধে পাল্টা শক্তি তৈরি হয় খুব দ্রুত। তাই ফেব্রুয়ারি রাজনীতিতে বড় কোনও ঘোষণার জন্য আদর্শিক কোনও মাস না।
আগস্ট আরও আলাদা। এটা এস্ট্রোলজিতে সবচেয়ে অস্থির মাসগুলোর একটি। Leo season মূলত অহং, ক্ষমতার প্রতীক। রাজনীতিতে এটা বিপজ্জনক সময়, কারণ Ego clash বাড়ে। সিদ্ধান্ত নিলে সেটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়, সম্মিলিত হয়না। দক্ষিণ এশিয়ায় আগস্ট হলো স্মৃতির মাস। ট্রমা, শোক, রক্ত, ইতিহাস। আগস্ট স্থিতিশীলতার না, বরং, জাগরণের মাস।
সব দিন সমান নয়। মানুষের মনে যেমন সবদিন সমান নয়, ক্যালেন্ডারের ক্ষেত্রেও তাও। কিছু দিন আছে যেগুলোকে ‘Dead days’ বলা হয়। এগুলোকে বলা যায় ‘Neutralised time’। এস্ট্রোলজিতে এগুলো void-of-course এর মতো। আর, কিছু তারিখ বারবার ফিরে আসে। এটা নিউমারোলজিতে বলা হয় anchoring। আর, এস্ট্রোলজিতে ‘Repetition of charge’।
আগস্টের ব্যপারে একটু বলি। ২০২৪ সালের শুরুতে যখন শেখ হাসিনার জন্য বছরটা কেমন যাবে, এই নিয়ে একটা লেখা পড়ছিলাম এবং পরবর্তীতে আলাপ করছিলাম একজনের সাথে, তখন আগস্ট মাস নিয়ে একটা ঝটকা লাগে। কিন্তু তখনও বুঝিনি কিছুই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে, হাসিনার পতনের পর, একজন ‘বঙ্গবন্ধু প্রেমিক’ প্রবীণ ব্যক্তি আমাকে বললেন, কোনও মতে যদি আগস্ট মাসটা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো, তাহলে এরকমটা হতো না৷ শেখ পরিবারের কাছে আগস্ট মাসটা একেবারেই ‘শুভ’ না।
বাঙলাদেশের শেখ পরিবারের জন্য আগস্ট মাসটা একদম শুভ না। কথাটা সত্য।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট।
২০২৪ সালের ০৫ আগস্ট।
আরেকটা কথা মনে পড়লো এই প্রসঙ্গে। গত কয়েক বছর আগে একজন সুফি শায়খের কাছে কিছু লোকজন আসলেন। তাদেরকে কোনও একটি রাজনৈতিক দল থেকে পাঠানো হয়েছে, হাসিনার পতন কবে হবে, এটার আভাস পাওয়ার জন্য। তারা জানিয়েছিলো, তারা এবং আরও অনেকেই, আজমীরে, সাইপ্রাস সহ একেক দেশের আধ্যাত্মিক গুরু ও বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ করছেন, তারাও চেষ্টা করছেন। কিন্তু শীঘ্রই কোনও আলামত নেই।
এখনও দেশ বিদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এই কাজগুলো করে থাকেন।
লেখার শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। সামনে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। বাঙলাদেশের ইতিহাসে এটা নিয়ে চতুর্থবারের মতো ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হচ্ছে। এর আগে যে ৩ বার হয়েছে, সেগুলো স্বাভাবিক নির্বাচন ছিল না।
১৯৭৯ – সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক বৈধতায় যাওয়ার ট্রানজিশন।
১৯৯১ – স্বৈরাচার পতনের পর পুনর্গঠন।
১৯৯৬ – বিতর্কিত, অসম্পূর্ণ এবং পরবর্তীতে বাতিলপ্রায় হয়ে জুনে আবার নির্বাচন।
এবারের ঘটনাও একই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নির্বাচন হচ্ছে। অভ্যুত্থান স্বাভাবিক কোনও ঘটনা নয়। ফলে, এই নির্বাচনও অতীতের স্বাভাবিক নির্বাচনগুলোর মতো নয়।
ক্ষমতাধর কোনো দেশ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দেয়না। ব্যাতিক্রম হয় জরুরি অবস্থা হলে। যেমন, ভারতে ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচন ফেব্রুয়ারি- মার্চে হয়েছিল। এই নির্বাচন হয়েছিল জরুরি অবস্থা পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কারণে। যেটাকে বলা হয় ‘Reset election’।
ইজরায়েলেও কয়েকটি ‘Snap election’ ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের বিশেষ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন এই নির্বাচনগুলো ছিল সরকার ভেঙে যাওয়ার পর জরুরি প্রয়োজনে। এমন না যে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেব্রুয়ারি বেছে নেওয়া হয়েছে।
ইরানে সংসদীয় নির্বাচন প্রায় সবসময় ফেব্রুয়ারিতে হয়। ১৯৯৬, ২০০০, ২০০৪, ২০০৮, ২০১২, ২০১৬, ২০২০ পর্যন্ত। কেন? এক্ষেত্রে ইরান আলাদা। ইরান নিয়ে যারা জানাশোনা আছে, তারা জানেন যে, ইরানের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো আলাদা। কারণ, ইরানি রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার Gregorian astrology নয়, বরং, Persian solar calendar. এখানে ফেব্রুয়ারি তাদের জন্য “অসম্পূর্ণ মাস” না। তাদের নিজেদের ক্যালেন্ডার আছে, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পরিসরেও যেগুলো অধিকাংশ মানুষ মেনে চলে।
আর এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র ২৫ বছরেই ৩ বার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের কোনও নির্দিষ্ট দিনও নেই, না শপথগ্রহণের কোনও নির্দিষ্ট দিন।
সামনে নির্বাচন, কী হবে? দেখা যাক। তবে, পূর্ণ মেয়াদে থাকার সম্ভাবনা কম।
তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান। নিশ্চয়ই তিনি সেসব মেনে চলেন। শাহজালাল রহ. এর মাজার থেকে জেয়ারত শুরু করা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চার ধারাবাহিকতা তো অবশ্যই। তার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক অনেক ব্যপার আছে, যা আমরা বুঝিনা।
এতো দীর্ঘ লেখা যারা পড়তে পড়তে এসেছেন, তাদের জন্য একটা কথা। এস্ট্রলজি ও নিউমারলজি শুধু রাজনীতিবিদদের জন্য না, যারা সফল ধনী হতে চায়, তাদের জন্যও। একটা উক্তি দিয়ে শেষ করি।
To become a millionaire, you need hard work.
To become a billionaire, you need an astrologer.
আচ্ছা, আরেকটা কথা। এটা বলেই শেষ করবো। কসম।
আমাদের দেশে যেমন, অনেকগুলো নিউজ চ্যানেল। খবরের পর খবর চলতেই থাকে। মিশরে তার চেয়েও বেশি হলো তাবিজে, রুকাইয়াহর চ্যানেল। এখানে যেমন শায়খ আহমাদুল্লাহ সহ বক্তারা বসে থাকেন উত্তর দেওয়ার জন্য, সেখানেও হোজা’রা বসে থাকে সমাধানের জন্য। অনেক জানার ইচ্ছা, মিশরের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো কেমন?
(বি দ্রঃ এগুলো আমার হিসেবে একটা বিদ্যা। ধর্মের সাথে সংঘাতপূর্ণ নয়। ফলে, ধর্মের বিরোধী ভাবার কোনও কারণ নেই। গঠনমূলক সমালোচনার জন্য ইনবক্স ও কমেন্টবক্স খোলা রইলো।)