রংপুর ব্যুরো: রংপুর মহানগরীর নাচনিয়া এলাকায় দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সবুজ পাহাড়। কিন্তু কাছে গেলেই পাল্টে যায় সেই ধারণা। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে সবুজ লতাপাতার আড়ালে জমে আছে ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তূপ। এর পাশেই সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জৈব সার কারখানাটি উৎপাদনহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বছরের পর বছর। রংপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পরও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠার বাস্তব চিত্র নাচনিয়ার এই ভাগাড় ও অচল কারখানাটি। এক দশক ধরে জৈব সার কারখানাটি চালু না হওয়া মহানগরীর বর্জ্য খোলা আকাশের নিচে স্তূপ হয়ে জমে আছে। প্রতিদিন ১০০ টনেরও বেশি বর্জ্য তৈরি হয় রংপুর মহানগরীতে। এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকির সঙ্গে নগরীজুড়ে বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও দূষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য থেকেই জৈব সার উৎপাদনে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল নগরীর পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদন করা হবে। এতে একদিকে নগরীর বর্জ্য কমবে, অন্যদিকে কৃষকরা পাবেন জৈব সার। কিন্তু প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্যের অভাব, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পরিকল্পনার ঘাটতিতে সেই স্বপ্ন এখন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে নগরীর নাচনিয়া এলাকায় প্রায় এক একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্ট। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। পরিবেশ অধিদপ্তরের অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রথমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেনি। পরে ২০২১ সালের শেষ দিকে ছিন্নমূল মহিলা সমিতির সঙ্গে নতুন চুক্তি করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্য সরবরাহ করতে না পারায় সেই উদ্যোগও ভেস্তে যায়। এরপর ২০২৪ সালে ‘রি-গ্রিন নামে একটি প্রতিষ্ঠান মৌখিক অনুমতি নিয়ে সার উৎপাদনের উদ্যোগ নিলেও সেটিও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে তিন দফা চেষ্টা করেও প্রকল্পটি এখন পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। নগরীর নাচনিয়া এলাকায় দেখা যায়, জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্টে সুনসান নীরবতা। নেই কোলাহল কিংবা শ্রমিকের কর্ম ব্যস্ততা। এই প্ল্যান্টের ২১টি প্রকোষ্ঠই প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে প্রায় ১৫ টন পচনশীল বর্জ্য ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৩৩ দিন বর্জ্য রেখে পচিয়ে পরে তা ছেঁকে জৈব সার তৈরির কথা। ১০ কেজি বর্জ্য থেকে ৩ থেকে ৪ কেজি সার উৎপাদনের সক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো সার উৎপাদন হচ্ছে না। কেবল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কার্যক্রম সীমিত আকারে চালু রয়েছে। জৈব সার উৎপাদন বন্ধ থাকায় রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের বর্জ্য এখন ফেলা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী কলাবাড়ি-রথবাড়ি এলাকার ডাম্পিং স্টেশনে। ২০১৯ সালে নতুন ডাম্পিং স্টেশন তৈরি হলেও সেখানে আধুনিক বা পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। প্রতিদিন ট্রাকের পর ট্রাক বর্জ্য এনে খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। একমাত্র ডাম্পিং ব্যবস্থাটিতেও রয়েছে অব্যবস্থাপনা। নেই সীমানা প্রাচীর, ফলে ময়লা নিয়ে নগরীর রাস্তাঘাট প্রতিদিনই নোংরা হচ্ছে। বিশেষ করে নাচনিয়া, কলাবাড়ি ও রথবাড়িসহ এর আশেপাশের এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠছে দিন দিন। রোদ-বৃষ্টি আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বর্জ্য পচে চারপাশে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দূষিত তরল বর্জ্য আশপাশের মাটি, খাল ও জলাশয়ে মিশে পরিবেশের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে। স্থানীয়রা বলেন, ২০১২ সালের ২৮ জুন ২০৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর সিটি কর্পোরেশন। আয়তনে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিটি। অথচ বিভাগীয় নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে এখন আছে কেবল একটি ডাম্পিং স্টেশন। এটিকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। রথবাড়ি এলাকার রাশেদ ইসলাম বলেন, আগে যেখানে খেলার মাঠ, ফসলি জমি ও পুকুর ছিল। এখন সেই কলাবাড়ি-রথবাড়ি এলাকায় ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। ডাম্পিং স্টেশন শুরুর পর খেলাধুলা তো দূরের কথা এখন এদিকে হাঁটাচলা করাও দায়। রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন রথবাড়ি এলাকার মিন্টু বলেন, এখানে খোলা জায়গায় ময়লা ফেলার কারণে বৃষ্টি হলে বিষাক্ত পানি আশপাশের ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ে। এতে মাছচাষ ও কৃষকের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় শিয়াল-কুকুর, কাক স্তূপ থেকে হাড়গোড় নিয়ে এসে অন্য জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যদি জায়গাটার চারপাশ সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং পাশের খালটি সংস্কার করা যায়, তাহলে কিছুটা উপকার হতো। এদিকে সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্র জানা যায়, জৈব সার তৈরির জন্য দৈনিক পচনশীল বর্জ্য লাগে ২০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে মাত্র দুই থেকে তিন মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। তবে মাঝেমধ্যে এটিও সম্ভব হয়ে ওঠে না। সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০০ মেট্রিক টন। এর মধ্য থেকে ট্রাক ও ভ্যানে করে ৬০ থেকে ৬৫ মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব বর্জ্য নগরীর কলাবড়ি স্থানে খোলা জায়গায় ফেলা হয়। এই কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ৮৬০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। কিন্তু সংগ্রহ করা এসব বর্জ্য হলো মিশ্র বর্জ্য। এসব বর্জ্য থেকে পচনশীল বর্জ্য তারা পৃথক করেন না। এ কারণে জৈব সার উৎপাদনের জন্য শুধু পচনশীল বর্জ্য দেওয়া সম্ভব হয় না। রংপুর নগরীর সচেতন মহল ও পরিবেশ সংগঠকদের দাবি, দ্রæততম সময়ের মধ্যে নাচনিয়া এলাকার বর্জ্য শোধন কেন্দ্রটি সংস্কার করে পুরোদমে চালু করা হোক। এটি সম্ভব হলে আবর্জনামুক্ত ও পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখবে। একই সাথে কৃষকরাও সুলভ মূল্যে জৈব সার পাবেন। একজন সংবাদকর্মী বলেন, রংপুর নগরীর ভেতরে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম মোটামুটি সন্তোষজনক হলেও এর বাইরে এখনও সেভাবে ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা উচিত। তা না হলে নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে। রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাকিব হাসান বলেন, আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, আশা করছি দ্রæত বাস্তবায়ন হবে। জৈব সার উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে সরকারি দুটি কনসালটেশন ফার্মের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, এটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া কলাবাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান
জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ...








