আওরঙ্গজেব কামাল :
বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু এক আতঙ্কের নাম। আর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যূর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ডেঙ্গু জ্বর একটি মশাবাহিত ভাইরাল সংক্রমণ। এডিস মশার কামড়ে মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই রোগে কেউ তখনই আক্রান্ত হন, যখন মশা সংক্রমিত কোনো ব্যক্তিকে কামড়ে তারপর ভাইরাস বহন করার সময় একজন অ-সংক্রমিত ব্যক্তিকে কামড় দেয়।
আগে এই রোগ ঢাকাভিত্তিক হলেও এখন সারাদেশে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু। যেন এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেন এখন মরন ব্যধিতে পরিনত হয়েছে।এখন মশার কামড় মানেই আতঙ্ক।মশার কামড়ে জনজীবন হয়ে ওঠে অতিষ্ঠ। তবে এবার শুধু অতিষ্ঠ নয়, আশঙ্কা রয়েছে নতুন রোগে আক্রান্তের। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আর এই রোগের ভাইরাস আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার পরেও সেদিকে নজর না দেয়ায় এই বছরে ডেঙ্গু মারাত্মক হয়ে উঠেছে বলে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন
তারা বলছেন, এক সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগটি মৌসুমি রোগ বলে মনে করা হলেও, গত কয়েক বছর ধরে সারা বছর জুড়ে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে।এর ফলে এই রোগের চার ধরনের ভাইরাস আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং রোগটি দেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই বছরের সাড়ে ছয় মাসেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ১৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে আর আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৫ হাজার ৭৯২ জন। বর্তমানে দেশজুড়ে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত রোগটিতে সারাদেশে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে মশাবাহী রোগটিতে এ বছর এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে।
একই সময়ে রেকর্ড ২ হাজার ৪১৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৬৮৮ জনে। মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ডেঙ্গুবিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে আরও ২ হাজার ৪১৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ১ হাজার ১৬২ জন ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
বাকি ১ হাজার ২৫৬ জন রাজধানীর বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর এই সময়ে নতুন করে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সর্বমোট ৭ হাজার ৯২৭ জন ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৫৩টি ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৪ হাজার ৬৪৬ জন। এছাড়া ঢাকার বাইরে ৩ হাজার ২৮১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম দিন (১ জানুয়ারি) থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৩৭ হাজার ৬৮৮ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ২৯ হাজার ৫৬০ জন। আর চলতি বছর এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২০১ জন।
প্রতিবছর বর্ষাকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। ওই সময়ে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০২২ সালে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ৬২ হাজার ৩৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এরমধ্যে গত বছর মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জন মারা গেছেন। এদিকে ডেনভি-৩ নামের এই ধরনে ঢাকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ধরনের কারণে রক্তের কণিকা প্লাটিলেট দ্রুত কমে যায়। কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলছেন, দেশে এই ডেনভি-৩ ধরনের ডেঙ্গু ধরন আমরা প্রথম দেখতে পাই ২০১৭ সালের দিকে। তার আগে ডেঙ্গুর আরও দুইটি ধরন, ডেনভি-১ ও ২) শনাক্ত হয়েছিল। ডেনভি-১ ও ২ এর বিরুদ্ধে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু নতুন এই ধরনটি আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। আগে কেউ ডেঙ্গুর কোন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার পর, আবার যদি এই ডেনভি-৩ ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে যান, তাহলে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার আশঙ্কা বেশি হয়। এবারের ডেঙ্গুতে এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত রোগীর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ রোগীর মধ্যেই রোগের উপসর্গ স্পষ্ট দেখা যায়।
বাকি ৮০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই এ রোগটি থাকে উপসর্গবিহীন।তাই রোগটি প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো মশার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ। ঘরে ও বাড়ির আশপাশে মশার বংশবিস্তার করতে পারে এমন আবাসস্থল নষ্ট করার পাশাপাশি ঘরের পরিবেশ রাখতে হবে মশামুক্ত।নিয়মিত ঘরের আশপাশ ও কর্নার পরিষ্কার রাখতে হবে। অন্ধকার ঘরে মশার আনাগোনা বেশি থাকে। তাই ঘর সবসময় আলোকিত রাখতে চেষ্টা করুন। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস থেকে নিজে ও পরিবারের সদস্যরা সুরক্ষিত থাকতে যতটা সম্ভব মশার কামড় থেকে দূরে থাকুন।
দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা। তারা আরও জানিয়েছেন, বাড়ির বিভিন্ন ঘরে হলুদ রঙের বাতির ব্যবহার নিশ্চিত করুন। এ রঙের আলোতে বাড়িতে মশাসহ পোকামাকড়ের আনাগোনা কম হয়। যদি কোনো কারণে বাড়ির কোনো সদস্য ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে ভাইরাসজনিত এ জ্বরে কী করবেন অনেকেই ভেবে পান না।
এ সময় আতঙ্কিত না হয়ে বরং পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখুন। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে করণীয় ১। বাড়িতে ডেঙ্গু রোগীকে পরিপূর্ণ বিশ্রামে রাখুন। ২। বেশি বেশি তরলজাতীয় খাবার যেমন ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন খেতে দিন। ৩। ডেঙ্গু জ্বরে প্যারাসিটামল খাওয়ান। তবে লিভার, হার্ট এবং কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিলে প্যারাসিটামল ওষুধ খাওয়ানোর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ৪। ডেঙ্গু জ্বরে শরীরে ব্যথা অনুভব হলে সেক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন, ক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ খাওয়াবেন না। চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বরে এমন ওষুধ গ্রহণে রক্তক্ষরণের শঙ্কা থাকে। বাড়িতে ডেঙ্গু মশা নিধনের উপায় ১। বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন। ২। ছাদ ও টবের জমে থাকা পানি ফেলে দিন। ৩। ফ্রিজ কিংবা এসি থেকে পানি ঝরলে তা দ্রুত পরিষ্কার করুন। ৪। বাথরুমের বালতিতে ধরে রাখা পরিষ্কার পানিতে ঢাকনা ব্যবহার করুন। ৫। অপরিচ্ছন্ন ও ডেঙ্গু থাকতে পারে এমন স্থানে কেরাসিন তেল ছিটিয়ে মশার আবাসস্থল ধ্বংস করুন। মনে রাখবেন, ডেঙ্গু হলে ইলেকট্রোলাইট ও প্লাটিলেটের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
এ ছাড়া প্লাটিলেট বৃদ্ধি পায় এমন খাবার বেশি বেশি খাওয়া উচিত। তাই চলুন জেনে নিই কোন কোন খাবার খেলে প্লাটিলেট বৃদ্ধি পায়। ভিটামিন কে এর দারুণ উৎস ব্রোকলি, যা রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। প্লাটিলেট বাড়াতে প্রতিদিনকার খাবারে অবশ্যই ব্রোকলি রাখবেন। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও নানা উপকারী খনিজ রয়েছে। আয়রন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অন্যতম উৎস পালংশাক অবশ্যই এই শাক সকলে খাবেন। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া শরীরে প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া মিষ্টি কুমড়া খেতে পারেন। ভিটামিন এ সমৃদ্ধ মিষ্টি কুমড়া রক্তের প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া মিষ্টি কুমড়ার জুসও খেতে পারেন। যদি পাওয়া যায় শিম খেতে পারেন,এতে ভিটামিন বি নাইন সমৃদ্ধ শিম প্লাটিলেট উন্নত করতে পারে গাজর খেতে পারেন তাহলে রক্তের প্লাটিলেট বাড়বে। গাজরের জুস খেতে পারেন নিয়মিত। এছাড়া সালাদ বা স্যুপ হিসেবেও খেতে পারেন গাজর।ডেঙ্গু জ্বরে খুবই দরকারি ডাবের পানি। এতে খনিজ বা ইলেকট্রোলাইটস ।এছাড়া খাওয়ার প্রয়োজন কারন পেঁপে প্লাটিলেট বাড়াতে পেঁপের জুস খেতে পারেন। এ ছাড়া পেঁপেপাতা অণুচক্রিকা বাড়াতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া এটি আয়রনের উৎস বলে রক্তের জন্য উপকারী। প্লাটিলেটের সংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে এবং ডেঙ্গু সারাতে এটি উপকারী বেদানা। উপকারী এই মসলা রক্ত পরিশুদ্ধ করে ও প্লাটিলেট বাড়ায় রসুন। গবেষণায় দেখা গেছে, রসুনে থাকা থ্রম্বোক্সেন এ টু প্লাটিলেট বাড়ায়। প্রতিদিনের খাবারে তাই রসুন যুক্ত করুন। দুই তিন কোষ রসুন আলাদা করেও খেতে পারেন। কিসমিসে আছে প্রচুর আয়রন।
শরীরে শক্তি যোগায় ও ব্লাড প্লাটিলেট স্বাভাবিক রাখে এটি। ওটমিল বা টক দইয়ের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন কিসমিস। এবং পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ভিটামিন ই থাকে তিলের তেলে। এটি ব্লাড প্লাটিলেট বৃদ্ধির দারুণ এক ওষুধ হিসেবেও বিবেচিত। মুরগীর মাংস, মাছ এসব খাবার থেকে প্রোটিন পাওয়া যায় বেশি। এসব খাবারে জিংক ও ভিটামিন বি টুয়েলভও থাকে প্রচুর। এধরনের খাবার অবশ্যই সকলকে খেতে হবে। লেখক ও গভেষকঃ আওরঙ্গজেব কামাল সভাপতি ঢাকা প্রেস ক্লাব








