নতুন পে-স্কেল কোন স্বপ্ন নয়: চাই নতুন বাজেটেই বাস্তবায়ন
বিগত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক মহামারি ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের দোহাই দিয়ে এবং দেশের
অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা বলে প্রথাগত নিয়ম থাকার পরও নতুন পে-স্কেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ,
বিগত কয়েক বছর ধরে চলা সেই বৈশ্বিক মহামারি ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণেই সৃষ্ট
অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন
মূল্যবৃদ্ধি ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ায় সরকারি চাকুরিজীবীদের নাভিশ্বাস
উঠেছে। এই চরম মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের সরকারি
চাকরিজীবীরা। অথচ এক দশক ছোঁয়ার উপক্রম হলেও সরকারি খাতে নতুন কোনো পে-স্কেল বা বেতন
কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি, যা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত অমানবিক ও অনভিপ্রেত।
প্রথাভাবেই বাংলাদেশে প্রতি ৫ বছর পর পর নতুন পে-স্কেল বা জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার একটি
সুদীর্ঘ রীতি রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। সেই নিয়ম মেনে
২০২০ সালে নবম পে-স্কেল দেওয়ার কথা থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলশ্রুতিতে, দীর্ঘ ১১
বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। এই দীর্ঘ
সময়ে মুদ্রাস্ফীতির সূচক কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা বাজারের থলে হাতে নিলেই টের পাওয়া যায়। অথচ
বেতন বাড়েনি এক টাকাও।
পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের অন্যান্য প্রায় প্রতিটি খাতেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন-ভাতা
বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেসরকারি খাতের দিকে তাকালে এই বৈষম্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ২০২২
সালের জুন মাসে সরকারের নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সর্বনিম্ন বেতন
কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে একজন প্রবেশনারি অফিসারের সর্বনিম্ন বেতন ৩৯,০০০ টাকা
এবং একজন সাধারণ কর্মচারী বা নিরাপত্তাকর্মীর সর্বনিম্ন বেতন ২৪,০০০ টাকা নির্ধারণ করা
হয়। অথচ দেশের সবচেয়ে মেধাবী সন্তানরা যখন তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি
প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন, তখন ২০১৫ সালের স্কেল অনুযায়ী তাদের মূল
বেতন হয় মাত্র ২২,০০০ টাকা! বেসরকারি ব্যাংকের একজন পিয়নের বেতনের চেয়েও দেশের প্রথম
শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার মূল বেতন কম—এটি একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্য কোনো গৌরবের
কথা হতে পারে না।
শুধু ব্যাংকিং খাতই নয়, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পেও (আরএমজি) শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়
বিবেচনা করে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অথচ
রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, তাদের বেলায় রাষ্ট্র গত
১১ বছর ধরে নীরব ভূমিকা পালন করছে। একমাত্র সরকারি খাতেই ২০১৫ সালের পর কোনো
বাস্তবসম্মত বেতন বৃদ্ধি ঘটেনি। মহামারি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ইত্যাদি অজুহাতে সরকারি পে-
স্কেল বন্ধ রাখা হয়েছে।
বেতন না বাড়ার কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্তের
কাতারে নেমে যাচ্ছে। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা পরিবারের সাথে থেকে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে
হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে সৎভাবে জীবনযাপন করা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর মানসিক
চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে সরকারি সেবার মান ও সততাকে প্রভাবিত করতে পারে। দুর্নীতিমুক্ত
ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে
হবে।
১১ বছরের দীর্ঘ স্থবিরতা ভেঙে অবিলম্বে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন
করা এখন আর কোনো বিলাসী দাবি নয়, বরং এটি সময়ের চরম দাবি। বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও
বাজারদরের কথা বিবেচনা করে নতুন বাজেট থেকেই বেতন কাঠামো ঘোষণা করে সরকার সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অবমূল্যায়ন থেকে মুক্তি দেবে—এটাই আমাদের
প্রত্যাশা।
মো: মহিউদ্দিন
শিক্ষক (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা),
আমতলী সরকারি কলেজ, বরগুনা।








