কবি- কেএম তফাজ্জল হোসেন জুয়েল খান
নারীকে তুমি দিলে টাকা
সে চাইল সময়,
সময়ের মাঝে যত্ন, যত্নের মাঝে
একটি গভীর আত্মনিবেদন।
তুমি দিলে সময় —
সে চাইল নিশ্চিন্ত জীবন,
চাইল একখণ্ড নিরাপত্তার আবরণ,
যেখানে স্বপ্ন সজীব হয়ে হাঁটে
পায়ের নিচে নরম ঘাস হয়ে।
তুমি দিলে ভালোবাসা —
সে চাইল সম্মান,
চাইল সমাজের চোখে একটুখানি মর্যাদা,
চাইল পরিচয়ের পাশে
একটি শক্তপোক্ত ছাতা।
তুমি দিলে বিছানার উষ্ণতা —
সে চাইল মনের উষ্ণতা,
তুমি দিলে শরীর —
সে খুঁজলো আত্মা।
তুমি দিলে কবিতা —
সে চাইল একটি ঘর,
যেখানে চালের নিচে বৃষ্টি পড়লেও
ভিজবে না তার চোখের কাজল।
তুমি দিলে সোনা, হীরার কৌটা —
সে চাইল একটি ভরসা,
একটি হাত, যে হাত চেপে ধরবে
যখন ভেতরের নদী বেয়ে
বেদনার ঢল নামে।
তুমি হলে ধনী —
তার চাওয়া এলো তোমার সময়ের বিপরীতে,
তুমি হলে ফকির —
তার চাওয়া এলো সংসারের বাস্তবতায়।
তুমি ভাবলে, নারী অসন্তুষ্ট,
তার চাওয়া শুধু দোটানার খেলা —
কখনো টাকা, কখনো সময়,
কখনো স্বপ্ন, কখনো প্রমাণ।
কিন্তু নারী কি তবে
এতটাই অসঙ্গত?
তার হৃদয় কি কেবল চাওয়ার খাতা?
না কি, তার ভেতরে
আছে কাঁটার মাঝে ফুটে থাকা
একটি নরম গোলাপ?
নারী কিশে আঁটকায়?
তাকে কি বেঁধে রাখা যায় টাকা দিয়ে?
না কি সময়ের দড়িতে?
না কি প্রেমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে?
তাকে কি আটকায়
তোমার বিলাসবহুল গাড়িতে?
না কি রাতভর চলা ফোন-আলাপে?
নারী আঁটকে থাকে না দামী রেস্টুরেন্টে,
না কবিতার লাইনে,
না ইনবক্সের ভালোবাসা-ভর্তি রিপ্লাইতে।
নারী আঁটকে থাকে
যেখানে তার চোখে তুমি থাকো অদৃশ্য নয়,
যেখানে তার কণ্ঠ পায় পূর্ণতা —
ভয় নয়, সংলাপের স্বাধীনতা।
নারী আঁটকে থাকে
তোমার স্পর্শে নয়,
তোমার সম্মানে।
তোমার দেওয়া টাকা যদি তাকে
মানুষের চেয়ে জিনিস ভাবে —
সে পালিয়ে যাবে,
তোমার দেওয়া সময় যদি হয়
নিজের তুচ্ছতা ঢাকার মোড়ক —
সে চুপচাপ সরে যাবে।
সে চায় তোমার ভেতরের সত্যি মানুষটাকে,
যে তাকে দেবে ঠাঁই,
যে তার পাশে দাঁড়াবে যুদ্ধের দিনেও —
না কেবল ভালোবাসা দিবসে।
সে চায় না রাজা,
সে চায় সহযোদ্ধা।
সে চায় না চুম্বন,
সে চায় সম্মিলন।
সে চায় না শুধু কণ্ঠে “ভালোবাসি” শব্দ —
সে চায় সেটি প্রতিফলিত হোক
তোমার আচরণে।
নারী আঁটকে থাকে না বিয়ের আংটিতে,
না বিয়ের ছবির নিচের ক্যাপশনে।
সে আঁটকে থাকে তোমার প্রয়োজনে,
তোমার প্রার্থনায়,
তোমার পেছনে নয় —
তোমার পাশে।
সে জানে, ধনীর সময় কম,
ফকিরের পকেট ফাঁকা,
তবু সে চায় একটুখানি যত্ন,
একটুখানি বোঝাপড়া,
একটুখানি সত্যতা —
বাকিটা জীবন সে মেনে নিতে জানে।
নারী কখনোই পূর্ণ হয় না
কেবল বাহ্যিক কিছু পেলে,
সে পূর্ণ হয়
যখন সে নিজেকে খুঁজে পায় তোমার হৃদয়ে।
সে তখনই হাসে
যখন তুমি তার চোখের ভাষা পড়তে পারো
শব্দ না বলেও।
তাকে যদি বলো,
“তুমি কি চাও?”
সে হয়তো বলবে না কিছুই,
কিন্তু চেয়ে থাকবে,
তোমার ভেতরের জবাব খুঁজে।
নারীকে বুঝতে হলে
বাজার দরকার নেই,
চাই একটুখানি মনোযোগ,
একটি নিঃশব্দ বোঝাপড়া,
একটি “আমি আছি” বলার কণ্ঠস্বর।
নারী কিশে আঁটকায়?
আঁটকে থাকে কি চোখে?
না কি হৃদয়ে?
আঁটকে থাকে যে ভোরে
তুমি তার চুলে হাত বুলিয়ে বলো —
“আজ দিনটা কেমন যাবে তোমার?”
যে রাতে
তুমি তার মুখে বলো —
“ভয় পেয়ো না, আমি পাশে আছি।”
সে আঁটকে থাকে
সেই পুরুষে,
যে পুরুষ নিজের অহং ভাঙতে পারে
একটি ভালোবাসার জন্য।
সে আঁটকে থাকে
তাদের মাঝে
যারা কাঁদতে দিলে সে কাঁদে,
আর হাসলে প্রাণ খুলে হাসে।
নারী ভাঙে না
তোমার অভাবে —
সে ভাঙে তোমার অবহেলায়।
সে চায় না তুমি রাজা হও,
সে চায় তুমি মানুষ হও,
যার বুকের ভেতরে
তার আশ্রয়ের ঘর বানানো।
নারী কিশে আঁটকায়?
আঁটকে থাকে সে,
যেখানে তার চাওয়াগুলো
অভিযোগ নয়, আলোচনার সুযোগ পায়,
যেখানে সে প্রেমে পড়ে
ভয় ছাড়া।
সে আঁটকে থাকে সেই পুরুষে,
যে তাকে দেখে না কেবল
একটি শরীর হিসেবে,
বরং একজন সম্পূর্ণ জীব হিসেবে,
ভাবনার, অনুভবের, সম্ভাবনার অধিকারী।
তুমি যদি পারো —
তাকে বিশ্বাস করতে,
তাকে শ্রদ্ধা করতে,
তাকে শুনতে…
তবে সে নারী —
তোমারই হয়ে থাকবে।
আর যদি না পারো —
সে হবে অসন্তুষ্ট,
ঠিক যেমন নদী ব্যাকুল হয়
জলের খোঁজে।
তাকে আটকাবে না টাকা,
না সময় —
তাকে আটকাবে একটুখানি অনুভব।
তাহলে বলো —
নারী কিশে আঁটকায়?
সে আঁটে ভালোবাসায়,
ভরসায়,
শ্রদ্ধায় —
মানুষের মাঝে।








