সম্প্রতি নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার জালশুকা বাজারে ৫টি রবিদাস পরিবারকে উচ্ছেদের অপচেষ্টা, বসতবাড়ি ভাংচুর, নগদ অর্থ ও অলংকার লুটপাট, দেশীয় অস্ত্র দিয়ে জখম ও মারাত্মকভাবে আহত করার ঘটনার বিচার, স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে বিডিইআরএম ও নাগরিক উদ্যোগ। অদ্য (২৬ জুন ২০২৫) বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)’-কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিপন কুমার রবিদাস।
বিডিইআরএম-নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি নন্দলাল রবিদাস (মাস্টার) এর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্য সুনীল রবিদাস। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম (বিআরএফ)-কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক রবিন রবিদাস, বাংলাদেশ রবিদাস ছাত্র ফোরাম (বিআরএসএফ)-কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এস. স্বাধীন চন্দ্র রবিদাস, ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্য সুনীল রবিদাস, অনিল রবিদাস, জয়ন্তী রবিদাস, রিপন রবিদাস ও কাজল রবিদাস প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তাগণ জানান, সম্প্রতি নেত্রকোনার পূর্বধলায় চিহ্নিত দূর্বৃত্ত কর্তৃক রবিদাস সম্প্রদায়ের ৫টি পরিবারের উপর হামলা চালিয়ে তাদের ৫টি ঘর গুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও লুটপাট, প্রাননাশের হুমকি এবং ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের মারধর করে উচ্ছেদ করায় নারী, শিশুসহ ২২ জন সদস্য এখন আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। যা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মারফত সারাদেশ তথা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছেন এবং নিন্দা জানিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ৮নং বিশকাকুনী ইউনিয়নের রামপুর কাছিয়াকান্দা মৌজার জালশুকা বাজার এলাকায়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠকালে শিপন কুমার রবিদাস বলেন, ঘটনার তথ্যানুসন্ধান করতে বিডিইআরএম ও নাগরিক উদ্যোগ এর এক প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যেই সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং ভূক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। সমাজের অত্যন্ত পিছিয়েপড়া দলিত (রবিদাস) জনগোষ্ঠীর উপর হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও প্রাননাশের হুমকির এহেন ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, ফেলবে। আমরা মনে করি, এই উচ্ছেদ কার্যক্রম একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল, যা বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এ ঘটনার বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি ভূক্তভোগীদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্য সুনীল রবিদাস বলেন, ভুক্তভোগী ৫টি পরিবারের ২২ জন সদস্য উত্তরাধিকার সূত্রে প্রায় ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে বিশকাকুনী ইউনিয়নের জালশুকা বাজার সংলগ্ন রেললাইনের পাশে সরকারি খাসজমিতে বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। বসবাসকৃত জমিটি (১২ শতক) রামপুর কাছিয়াকান্দা মৌজার ১ নং খতিয়ানের। জমিটি অভিযুক্ত পক্ষ পৈতৃকসূত্রে নিজেদের দাবী করলেও ভূমি অফিসসূত্রে এর যথাযথ কোনও প্রমান মিলেনি। চলতি বছরের ঈদ-উল-আযহা’র আগের দিন (৬ জুন) প্রতিপক্ষগণ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এলোপাথারিভাবে ভূক্তভোগী সুনীল রবিদাস, স্ত্রী জয়ন্তী রানী রবিদাস এবং পুত্র রিপন রবিদাসকে আঘাত করে মারাত্মকভাবে জখম করে। পরে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন এবং শরীরে একাধিক সেলাই দিতে হয়েছে। ২য় দফায় ঈদের পরদিন (৮ জুন) বিকেলে হামলা করে ৩টি ঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয় অভিযুক্ত পক্ষ। সেদিন কোরবানীর পশুর চামড়া কেনার জন্য ধার করা ও গচ্ছিত অর্থ এবং স্বর্ণালঙ্কার লুটপাট করে চিহ্নিত দূর্বৃত্তরা। প্রতিকার পেতে থানায় মামলা দায়ের করেন ভূক্তভোগী অনিল রবিদাস। মামলা করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ৩য় দফায় ১০ জুন দুপুরে অভিযুক্তরা পুনরায় হামলা করে অবশিষ্ট ২টি ঘর ভেঙ্গে ভূক্তভোগীদের প্রাননাশের হুমকি দিয়ে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তাগণ বলেন, ভূক্তভোগী রবিদাস সম্প্রদায়ের ৫টি পরিবারের ২২জন সদস্য এ দেশেরই নাগরিক, এবং তাদের বাসস্থানের অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। তাদের জীবন, অস্তিত্ব এবং সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সংবাদমাধ্যমের সহায়তা কামনা করছি। যাতে এই মানুষগুলির কণ্ঠ রোধ না হয় এবং তাঁদের ন্যায্য অধিকার রক্ষিত হয়। আমরা সরকারের কাছে সংবেদনশীল, মানবিক ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছি।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিসমূহ:
১. ভূক্তভোগী ৫টি রবিদাস পরিবার উচ্ছেদের অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যত্র নয়, বরং সেখানেই স্থায়ীভাবে আবাসন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত) এর ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. বিবাদীদের মধ্যে প্রথম ৩জনই জামিন পেয়েছে। এটা কিভাবে সম্ভব? অভিযুক্ত প্রত্যেককে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. এই পরিবারগুলির শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা প্রদান করতে হবে।
৫. পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।







