দুমকি(পটুয়াখালী) প্রতিনিধিঃ অপরের দোষ ত্রুটি খোঁচাতে গিয়ে নিজেই চাকুরি অবৈধতার জালে আটকে গেছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের অধ্যাপক মো. মেহেদী হাসান। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-রেজিস্ট্রারসহ কয়েকজন শিক্ষকের নাম ও ছবি সম্বলিত মানহানিকর পোষ্টার ছাপনোর দায়ে তাকে চাকুরী থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তির নিয়ম ভেঙে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক মেহেদী হাসান বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী চক্রান্তে জড়ানোয় তার নিয়োগের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মেহেদী হাসানের চাকুরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নূন্যতম সিজিপিএ ৩দশমিক ৭৫ এর স্থলে সিজিপিএ ২দশমিক ৯৫এর নিয়োগ কেন অবৈধ নয়?
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১০ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক (নন টেকনিক্যাল) পদে চাকরি নেন মেহেদী হাসান। ওই সময়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট অনুষদে স্নাতক ডিগ্রি, শিক্ষা জীবনের সকল স্তরে প্রথম বিভাগের পাশাপাশি জিপিএ/সিজিপিএ ৪ এর জন্য কমপক্ষে ৩ দশমিক ৭৫ থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্ত সিজিপিএ ২ দশমিক ৯৫ থাকা মেহেদী হাসান অদৃশ্য কারণে শর্ত শিথিল সাপেক্ষে নিয়োগ পেয়ে বহাল তবিয়তে চাকুরি করে আসছেন।
২০১৮সালে শিক্ষক পদের নিয়োগ বঞ্চিত হয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী দেবাশিষ আত্মহত্যা করে। তৎকালীন নিয়োগ বোর্ড সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের দাবিকৃত টাকা দিতে না পেরে আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে অভিযুক্ত করে তাদের ছবি দিয়ে ফাঁসি চেয়ে বেশ কিছু বেনামী পোষ্টার ছাপানো হয়। ওই পোষ্টারে বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. স্বদেশ চন্দ্র, রেজিষ্ট্রার ড. সন্তোষ কুমার বসুসহ অধ্যাপক ড. মো. শনিরুজ্জামান, অধ্যাপক ড. নওরোজ জাহান লিপির ছবি সম্বলিত পোস্টার ক্যাম্পাসে আসলে নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে চলতি বছরের ১৩মে জব্ধ হয়। জব্দকৃত আপত্তিকর পোস্টারে বর্তমান ভিসি ও রেজিস্ট্রারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপে ফেলতে গোপনে ছাপানো এসব পোষ্টার ক্যাম্পাসে ছড়ানোর পরিকল্পনা করছিলেন অধ্যাপক মেহেদী হাসান। এজন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. মুকিতকে আগে থেকেই বলেছিলেন তার (মেহেদী হাসান) কিছু পোস্টার আসবে সেগুলো যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে লাগিয়ে দেয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. মুকিত বলেন, ‘সেদিন রাতে মেহেদী স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে একটি প্যাকেট আসবে বলে জানিয়েছিলেন। আমি ব্যস্ততার কারনে নিরাপত্তাকর্মীকে দিয়ে প্যাকেটটি গেটে নামিয়ে রাখি। সকালে প্যাকেটটি খুলে ভিসি ও রেজিস্ট্রারসহ তিন শিক্ষকের ছবিতে ফাঁসির রশি দেয়া পোস্টার দেখে হতভম্ব হয়ে যাই। তাৎক্ষণিক ঘটনাটি রেজিস্ট্রার স্যারকে জানাই। পোষ্টার জব্দের বিষয়ে নিরাপত্তাকর্মী, সংশ্লিষ্ট গাড়িচালক এবং বরিশালের যে প্রেস থেকে পোস্টার ছাপানো হয়েছে সবার সঙ্গে কথা বলে প্রশাসন নিশ্চিৎ হন যে, মহেদী স্যারই পোস্টারগুলোর নেপত্থের নায়ক।’
অভিযোগের বিষয়ে পবিপ্রবি‘র অভিযুক্ত শিক্ষক (সাময়িক বরখাস্ত) অধ্যাপক মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি পোস্টার ছাপানোর সঙ্গে জড়িত নই। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে সাময়িক বরখাস্তের যে চিঠি দিয়েছে তাতে পোস্টার ছাপানোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত সিজিপিএর মানদন্ডের কম সিজিপিএ দিয়ে কীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, এমন প্রশ্নে মেহেদী হাসান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে যোগ্য মনে করেছে বিধায় নিয়োগ দিয়েছে। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. সন্তোষ কুমার বসু বলেন, ‘২০১৮ সালে যখন দেবাষিশ আত্মহত্যা করে সেসময় আমি কোনো দায়িত্বে ছিলাম না এবং আমি দেশের বাইরে অবস্থান করছিলাম। কী কারণে আমার ছবি ব্যবহার করে পোস্টার ছাপানো হয়েছে তা হয়তো (মেহেদী হাসান) সে বলতে পারবে। এছাড়া অধ্যাপক মেহেদী যে পোস্টারগুলো ছাপিয়েছে, তা নিয়ে আসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রাইভারকে নির্দেশনা দেয় এবং পোস্টার নামানো ও লাগানোর জন্য নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছে, এ বিষয়গুলো প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত। এ কারণে গত ২৮ মে ভিসি স্যারের নির্দেশ মোতাবেক মেহেদী হাসানকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক মেহেদী হাসানের নিয়োগের বৈধতা প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার বলেন, ‘তাকে যখন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তখন যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা এ বিষয়ে বলতে পারবেন। তবে অভিযোগ পেলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত বলেন, ‘দেবাষিশ আত্মহত্যার বিষয়ে কারও কোনো অভিযোগ নেই। আমি সেসময় (২০১৮ সালে) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সঙ্গে রেজিস্ট্রার কোনোভাবেই জড়িত থাকে না।’
Post Views: 240
Related