উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে পাকিস্তান শব্দটি যেন দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, সেনা-হস্তক্ষেপ আর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেই ঐতিহাসিক ভাঙ্গনের অর্ধশতক পর, বর্তমান ২০২৬ সালেও এসে প্রশ্ন উঠছে—পাকিস্তান কি তার অতীত ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছে? নাকি ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে দেশটি আবারও এক নতুন ভাঙ্গনের দ্বারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে? বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের বেলুচিস্তান প্রদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং উত্তর-পশ্চিমের পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের (আযাদ কাশ্মীর) অভূতপূর্ব সিভিল রাইটস আন্দোলন—এ দুটি সংকট একযোগে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির নীতিনির্ধারকদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। প্রশ্ন জেগেছে, পিন্ডির সামরিক কৌশল কি আবারও একটি দেশকে টুকরো হওয়ার মুখ থেকে বাঁচাতে পারবে, নাকি বেলুচিস্তানের সশস্ত্র বিচ্ছেদ আর কাশ্মীরের স্বাধিকারের জোয়ারে চুরমার হবে পাকিস্তানের প্রশাসনিক ভিত্তি?
বেলুচিস্তানের স্থায়ী অগ্নিকুণ্ড: স্বাধীনতার লাল শিখা
বেলুচিস্তানের সংকট কোনো নতুন ঘটনা নয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির সূচনালগ্ন থেকেই বেলুচদের মধ্যে যে বঞ্চনা ও ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল, তা কালক্রমে এক সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বেলুচ লিবারেশন আর্মি এবং বেলুচ সলিডারিটি কমিটির মতো সংগঠনগুলো এখন শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সামরিক গোষ্ঠী নয়, বরং বেলুচ জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে অবস্থিত বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষ করে সোনা, তামা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ। অথচ অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার সূচকে এই অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে পিছিয়ে। গাওদার সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর-এর মতো বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট গড়ে উঠছে বেলুচ ভূমিতে, কিন্তু সেই অর্জিত মুনাফার বড় অংশ চলে যাচ্ছে পাঞ্জাবকেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় এলিটদের পকেটে। নিজেদের ভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়ার এই অনুভূতি বেলুচ তরুণদের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানের চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিএলএ-র মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন নিয়মিতভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী (ফ্রন্টিয়ার কোর) এবং পুলিশ চৌকিগুলোতে সমন্বিত হামলা চালাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকে লুটপাট, মূল সড়কগুলো অবরোধ করে যানবাহন ধ্বংস করা এবং কৌশলগত অবকাঠামোতে হামলা এখন সেখানকার প্রতিদিনের খবর। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অতীতে এই যুদ্ধ কেবল পাহাড়ি সশস্ত্র গেরিলা যোদ্ধাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে বেলুচিস্তানের সাধারণ ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও নারীরাও এই আন্দোলনে ব্যাপকভাবে শরিক হচ্ছেন। ডক্টর মাহরং বেলুচের মতো নাগরিক অধিকার কর্মীদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের রাজপথে নেমে আসা প্রমাণ করে যে, বেলুচ জাতির মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছেদ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। কেবল সামরিক শক্তিবলে ভূখণ্ড ধরে রাখা গেলেও মানুষের হৃদয় যে ধরে রাখা যায় না, একাত্তরের ঢাকা তার বড় প্রমাণ ছিল; আজ কোয়েটা ও গাওদার সেই একই সত্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
কাশ্মীর: অন্যায্য কোটাকাঠামো ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনরোষ
বেলুচিস্তানের সংকট যখন রক্তক্ষয়ী ও সশস্ত্র, ঠিক তখনই তথাকথিত ‘আযাদ জম্মু ও কাশ্মীর’-এ সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা। কাশ্মীরিদের এই ক্ষোভ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর উসকানিতে নয়, বরং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনের মূলে রয়েছে জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার আসন বল বণ্টন ও কোটাব্যবস্থার অন্যায্য পুনর্বিন্যাস। তাই ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত তিন দফায় চলমান কাশ্মিরের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অশান্ত হয়ে উঠেছে পাকিস্তান।
পাকিস্তান সরকার কাশ্মীরিদের স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও ব্যবহারিকভাবে সেখানকার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে চেয়েছে বহু বছর ধরে। আযাদ কাশ্মীরের নির্বাচন ও আইনসভায় কোটাব্যবস্থার নামে যে প্রশাসনিক কারচুপি করা হয়েছে, তা স্থানীয় কাশ্মীরিদের অধিকারকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। মোট ৫৩টি আসনবিশিষ্ট কাশ্মীর আইনসভায় প্রায় ১২টি আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর থেকে আগত তথাকথিত ‘শরণার্থী’ কোটার জন্য, যারা মূলত পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং রাজনৈতিকভাবে ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় শাসকদলগুলোর আজ্ঞাবহ। আর ৮টি আসনের কোটা রয়েছে নারীসহ কয়েকটি গোষ্ঠীর জন্য। ফলে মোট ২০ টি আসন চলে যায় কোটায় এবং কাশ্মিরের মূলধারার জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৩৩ টি আসন বরাদ্দ থাকে সরাসরি নির্বাচনের জন্য। তাই আইনসভায় অন্যায্য কোটা ব্যবস্থা নিয়ে অশান্ত হয়ে উঠেছে কাশ্মির।
এই শরণার্থী কোটাসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কোটার হিসেব কষলে দেখা যায়, আযাদ কাশ্মীরের প্রকৃত অধিবাসীদের জন্য প্রত্যক্ষভাবে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ নেমে এসেছে মাত্র ৩৩টি আসনে। অর্থাৎ, ভূখণ্ডের প্রকৃত অধিবাসীরা নিজেদের আইনসভাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছেন। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিলের অতিরিক্ত কর এবং আযাদ কাশ্মীর যৌথ অ্যাকশন কমিটির ডাকা টানা ধর্মঘট ও বিক্ষোভে প্রকম্পিত পুরো অঞ্চল। ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পাক সামরিক বাহিনী কাশ্মীরকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি কূটনৈতিক ও ভৌগোলিক ‘দাবার গুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেও, কাশ্মীরের জনগণ এখন নিজেদের ন্যায্য অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন ফিরে পেতে রাজপথে নেমে এসেছে।
রাওয়ালপিন্ডির ভুল কৌশল: ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার মাশুল
পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি সর্বদাই ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। বেলুচিস্তান ও কাশ্মীর—উভয় সংকট সামলাতে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তা মূলত চরম দমনপীড়নমূলক। বেলুচিস্তানে বলপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এই বলপ্রয়োগ বেলুচদের ক্ষোভকে কমানোর বদলে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অস্ত্র দিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টার ফলেই আজ বেলুচিস্তানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর একের পর এক আত্মঘাতী হামলা ও ব্যাংক লুটের মতো ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে, কাশ্মীরে জনগণের যুক্তিসঙ্গত কোটা সংস্কার ও অর্থনৈতিক দাবিকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি বা রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখার ঐতিহাসিক ভুল করছে পাকিস্তান সরকার। পাঞ্জাবি-অধ্যুষিত কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও সামরিক এলিটদের আধিপত্য ধরে রাখার এই মানসিকতাই অতীতে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করেছিল। অথচ বেলুচিস্তানের সুষম উন্নয়ন, সম্পদের সমবণ্টন এবং কাশ্মীরের আসন কাঠামোর যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব ছিল।
পরিণতি ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ: ভাঙ্গন কি অনিবার্য?
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে দেউলিয়া হওয়ার কাছাকাছি। আইএমএফ-এর ঋণের ওপর নির্ভর করে চলা একটি রাষ্ট্রের পক্ষে একই সাথে দুটি বৃহৎ অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও গণঅসন্তোষ সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
১. বেলুচিস্তানের বিচ্ছেদ সম্ভাবনা: বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখান থেকে সংলাপে ফেরার পথ কঠিন। ভৌগোলিক দূরত্ব এবং ইরানের সাথে সীমান্ত সংযোগের কারণে বিএলএ কৌশলগতভাবে শক্তিশালী। চীন যদি করিডোর প্রকল্পের সুরক্ষায় পাকিস্তানের ওপর আস্থা হারায়, তবে বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থ পুরোপুরি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
২. কাশ্মীরের মোহভঙ্গ: পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের জনগণ এতদিন নিজেদের পাকিস্তানের সুহৃদ মনে করলেও, সরকারের অন্যায্য কোটানীতি ও স্বায়ত্তশাসন হরণের চেষ্টার ফলে তাদের মোহভঙ্গ ঘটেছে। এটি হয়তো সরাসরি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী রূপ নেবে না, তবে পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে অকার্যকর করে দেওয়ার জন্য এই সিভিল রাইটস আন্দোলনই যথেষ্ট।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একটি রাষ্ট্র কেবল পারমাণবিক বোমা বা শক্তিশালী সেনাবাহিনীর শক্তিতে টিকে থাকতে পারে না; রাষ্ট্রের টিকে থাকা নির্ভর করে নাগরিকদের সামাজিক চুক্তি এবং ন্যায়বিচারের ওপর। পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা যদি ভাবেন যে কেবল অস্ত্রের জোর, কোটাকারচুপি আর রাজনৈতিক দমনপীড়ন চালিয়ে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আকাক্সক্ষা এবং কাশ্মীরের জনদাবি দাবিয়ে রাখা যাবে, তবে তারা বড় ভুল করছেন।
বেলুচিস্তানের দাবানল আর কাশ্মীরের রাজপথের জোড়ালো প্রতিবাদ—উভয়ই বার্তা দিচ্ছে যে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনকাঠামো আজ চরমভাবে ব্যর্থ। দ্রুততম সময়ে কাশ্মীরের অন্যায্য কোটা প্রত্যাহার করে স্থানীয় অধিবাসীদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং বেলুচিস্তানে সামরিক অভিযান বন্ধ করে রাজনৈতিক সমঝোতায় না এলে, পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে আবারও নতুন কোনো ভূখণ্ডের বিচ্ছেদ কেবল সময়ের ব্যাপারে পরিণত হবে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা,
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।









