এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
চেকের মামলায় পুরনো চেক নিয়ে প্রশ্ন উঠলে যেমন চেকটি অনেক আগে স্বাক্ষরিত হয়েছে আর তারিখ, অংক, পেয়ীর নাম ইত্যাদি ভিন্ন সময়ে লেখা হয়েছে, তাহলে চেকের বৈধতার সময়সীমা সাধারণত ৬ মাস অতিক্রম হওয়ার ছুঁতো ধরে আসামীপক্ষ থেকে হস্তাক্ষর/ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা দাবী তুলতে পারেন।
বাংলাদেশে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ধারা ৪৫ অনুসারে হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য। আসামী যদি আদালতে আবেদন করে চেকটি বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর জন্য যাতে নির্ধারণ করা যায় যে কবে, কখন চেকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং অন্যান্য অংশ কবে, কখন লেখা হয়েছে, তাহলে আদালতের উচিত আবেদনটি বিবেচনা করে চেকটি সরকারি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো। এটি আসামীর আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করে এবং এন.আই এ্যাক্ট এর ধারা ১১৮ ও ১৩৯-এর অনুমান খ-ন করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন ও অ্যাপিলেট ডিভিশনে চেকে হস্তাক্ষরের অসংগতি নিয়ে সরাসরি কয়েকটি যুগান্তকারী রায় রয়েছে। এগুলোতে বলা হয়েছে যে, স্বাক্ষর সঠিক হলেও অন্যান্য অংশ যেমন টাকার পরিমাণ অংকে ও কথা, তারিখ, পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এবং বাদী তা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হলে চেকটি আইনের চোখে বৈধ চেক নয় এবং মামলা টিকবে না। ফরেনসিক/হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের রিপোর্ট এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য, ৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭ এ হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছেন, যদি ড্রয়ার (যিনি চেক লিখেছেন) নিজে সম্পূর্ণভাবে পূরণ না করে, অন্য কেউ পরে অংক, তারিখ, প্রাপকের নাম ইত্যাদি লিখে দেয় আর হ্যান্ডরাইটিং-এ অসঙ্গতি থাকে আর যদি ফরেনসিক রিপোর্টে স্বাক্ষরে অমিল, ঘষামাজা, কাটাকাটি, টাকা অংকে পরিবর্তন হয়, তবে মামলার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যাবে।
এন.আই এ্যাক্টের ৮৭ ধারার বিধান অনুযায়ী, যদি কোনো চেকের লেখায় বা অংকে এমন কোনো পরিবর্তন করা হয় যা চেকের মূল চরিত্র বা বাধ্যবাধকতা পরিবর্তন করে দেয় (যেমন: টাকার পরিমাণ বাড়ানো), তবে সেই চেকটি বাতিল বলে গণ্য হবে।
তবে বাদীকে (যিনি মামলা করেছেন) অবশ্যই এই অসঙ্গতির ব্যাখ্যা দিতে হবে। ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে মামলা টিকবে না! আসামী খালাস পাবেন। আদালত বলেছে, বাদীকে (পাওনাদার) আদালতে আসতে হবে এবং জবাব দিতে হবে যে, কেন চেকটি ড্রয়ার নিজে পূরণ করেননি? অন্য কে পূরণ করেছেন? অন্যের পূরণের ক্ষেত্রে ড্রয়ারের অনুমতি ছিল কি-না? হস্তাক্ষরের এই ভিন্নতা কীভাবে যৌক্তিক? যদি বাদী এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব না দিতে পারেন, তাহলে মামলার ভিত্তিই অদৃশ্য হয়ে যায়।
অনেক সময় পাওনাদার বা অন্য পক্ষ ব্ল্যাঙ্ক চেকে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় এবং পরে নিজের ইচ্ছামতো বড় অংক বসিয়ে মামলা দেয়। এই রায় এমন হয়রানি বন্ধে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
এম.এ মজিদ বনাব মোঃ আব্দুল মোতালেব, ৫৬ ডিএলআর, ৬৩৬ মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আসামীর স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এন.আই এ্যাক্ট-এর ধারা ৩(ই) অনুসারে এটাকে “ইস্যুয়েন্স অব চেক” বলা যাবে না। চেকটি আইনানুগভাবে বৈধ নয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে আসামী খালাস পেতে পারে। এটি চেকের বিভিন্ন অংশ ভিন্ন সময়ে লেখা হয়েছে বলে প্রমাণের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য।
আবার হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ এবং অন্যান্য, ৭১ ডিএলআর (এডি) মামলায় চেকের ব্যবহার ও অপব্যবহার নিয়ে মতামত দিয়েছে এ্যাপিলেট ডিভিশন। চেক যদি শুধু সিকিউরিটি হিসেবে দেওয়া হয় এবং পরে অপব্যবহার করা হয়, তাহলে মামলা টেকে না। হস্তাক্ষরের বিষয়টি এখানে পরোক্ষভাবে প্রাসঙ্গিক।
কাজেই আসামী যদি আবেদন করে এবং আবেদনটি যদি যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক হয় তাহলে আদালত চেকটি হস্তাক্ষর/ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাবে। (যদি আবেদনটি যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক হয়)। এটি কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম (২০০৭) টু এসসিসি ২৫৮ এবং টি. নাগাপ্পা বনাম ওয়াই.আর. মুরলিধর (এআইআর ২০০৮ এসসি ২০১০ = ২০০৮ (ফাইভ) এসসিসি ৬৩৩) এর নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।(বাংলাদেশের আদালতসমূহ এন.আই এ্যাক্ট এর ক্ষেত্রে ভারতীয় নজিরগুলো প্রায়ই অনুসরণ করে।
বিশেষজ্ঞের রিপোর্ট না নিলে বা আদালত আবেদন খারিজ করলে তা ফেয়ার ট্রায়াল এর লঙ্ঘন হতে পারে এবং উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে। আর বাদী যদি চেকের বিভিন্ন অংশ ভিন্ন হাতের লেখা বলে স্বীকার না করে বা ব্যাখ্যা না দেয়, তাহলে সন্দেহের সুবিধা আসামী পাবে।
টি. নাগাপ্পা বনাম ওয়াই.আর. মুরলিধর (এআইআর ২০০৮ এসসি ২০১০ = ২০০৮ (ফাইভ) এসসিসি ৬৩৩) মামলায় আসামী দাবি করেন যে, তিনি ১৯৯৯ সালে শুধু স্বাক্ষর করে খালি চেক (সাইনড ব্ল্যাঙ্ক চেক) সিকিউরিটি হিসেবে দিয়েছিলেন। পরে ২০০৪ সালে অর্থাৎ ৫ বছর পর বাদী চেকের তারিখ, অংক ইত্যাদি পূরণ করে ব্যবহার করেছে। আসামী চেকটি ফরেনসিক/হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন যে, স্বাক্ষর ও লেখাগুলো একই সময়ে লেখা হয়েছে কি না।
সুপ্রিম কোর্ট কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম মামলাকে অনুসরণ করে বলেছেন যে. এন.আই এ্যাক্টের ধারা ১১৮(এ) এবং ১৩৯ এর অনুমান থাকলেও আসামীকে প্রতিরক্ষামূলক প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। চেকের লেখা ও স্বাক্ষর কবে লেখা হয়েছে তা নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো উচিত, যদি আবেদনটি বোনাফাইড বা সত্যিকারের হয় এবং বিলম্বের উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট ও হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে চেকটি বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কাজেই চেকের বয়স, স্বাক্ষর ও অন্যান্য অংশের সমসাময়িকতা নিয়ে বিতর্ক থাকলে আসামী হস্তাক্ষর/ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত চাইতে পারে। আদালত ফৌজদারি কাংবিধির ধারা ২৪৩(২) অনুসারে আবেদন মঞ্জুর করবে যদি তা ফেয়ার ট্রায়াল-এর জন্য প্রয়োজনীয় হয়। শুধু অনুমান এর কারণে আসামীর প্রতিরক্ষার সুযোগ কেড়ে নেওয়া যাবে না। এই দুটি রায় এন.আই এ্যাক্ট এর ধারা ১৩৮ মামলায় বহুলভাবে উদ্ধৃত হয় এবং বাংলাদেশের আদালতেও এন.আই এ্যাক্ট এর ক্ষেত্রে প্রায়ই অনুসরণ করা হয়।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।
Post Views: 231
Related