“মতামত”
(মোহাম্মদ সোহেল)
সোহাগকে পাথর দিয়ে পিটিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড সমাজের গভীরে পাথুরে হয়ে যাওয়া নৈতিকতার স্তরের কথাই যেন চিৎকার করে বলছে। প্রকাশ্য দিবালোকে যুবকের হাতে পাথরের আঘাতে এক তরুণের মৃত্যু। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজের কঙ্কালসার চিত্র, যেখানে মূল্যবোধের ভিত্তি যেন পাথরের নিচে চাপা পড়ে গেছে। এই ঘটনার নিষ্ঠুরতা শিউরে ওঠার মতো। পাথর দিয়ে মাথা ভাঙা এটি আদিম সহিংসতার প্রতীক। চাঁদাবাজির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত হওয়া, টাকা না পেলে নির্দ্বিধায় হত্যা করার পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন এইসব কাজে যে যুবকেরা জড়িত, তারা আমাদেরই সন্তান, প্রতিবেশী। প্রশ্ন জাগে, কীভাবে মানুষের জীবন নেওয়াকে এত তুচ্ছ মনে করে? কোন বিকৃত মূল্যবোধ, কোন অন্ধকার পথে হাঁটছে আমাদের একটি অংশ? মঈন ও তার সহযোগীদের এই নৃশংসতা শুধু তাদের ব্যক্তিগত পতন নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং যুবসমাজের দিকনির্দেশনার মারাত্মক ব্যর্থতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। ১২ জুলাই পুরান ঢাকার হৃৎপিণ্ডে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে, ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয়নি; এটি আমাদের সম্মিলিত বিবেক, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর এক করুণ আঘাত হেনেছে। দিনদুপুরে পাথর দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসতা হত্যা, এটি একটি অপরাধই নয়, এটি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ভিত নাড়া দিয়েছে। সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রথম ও প্রধান বার্তা হলো নাগরিক নিরাপত্তার চরম সংকট। যখন একটি ব্যস্ত হাসপাতালের গেটে, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে, একজন সাধারণ ব্যবসায়ী এত নিষ্ঠুরভাবে খুন হতে পারেন, তখন প্রশ্ন ওঠে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ?।
ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার কৃতদের মধ্যে প্রধান সন্দেহভাজন মাহমুদুল হাসান মহিন (৪১) এবং তারেক রহমান রবিন (২২) কে কোতোয়ালী থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলা ও অস্ত্র আইনের দুটি পৃথক মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এই গ্রেপ্তারগুলি কি শুধু প্রতিক্রিয়া, নাকি দীর্ঘমেয়াদী অপরাধ দমনের কৌশলের অংশ?
অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়েরের খবর স্বস্তিদায়ক, কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, শুধু গ্রেপ্তার ও মামলা দিয়ে এই ধরনের সুপরিকল্পিত হত্যার মূল উৎপাটন সম্ভব নয়। প্রয়োজন গভীর তদন্ত, অপরাধের পেছনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংযোগ উন্মোচন, এবং দ্রুততম সময়ে রায় নিশ্চিত করা। এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো বিএনপি কর্তৃক সংশ্লিষ্ট দুই যুবদল নেতাকে বহিষ্কারের খবর। এই জঘন্য ঘটনার সাথে জড়িতদের বিষয়ে প্রশ্ন তোলে বহিষ্কারই কি যথেষ্ট? রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে যুব সংগঠনগুলোর, দায়বদ্ধতা কোথায়? দলীয় কর্মীরা যখন এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন দলের জন্য শুধু বহিষ্কারের চেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা এবং দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সাহায্য করা। দলের ভেতর অপরাধীর প্রবণতা, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। “বহিষ্কার” প্রায়শই দায় এড়ানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল। জনগণ প্রত্যাশা করে তার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ বিএনপি একটি জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল।
সোহাগ দীর্ঘদিন ধরে ভাঙারি ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। এই পেশা, যাকে প্রায়ই ‘নিম্নস্তরের’ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু এটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ চাকার অংশ। সোহাগের মতো অসংখ্য মানুষ এই খাতে নিরাপত্তাহীনতা ও চাঁদাবাজির শিকার। তাদের জীবনের মূল্য কি সমাজে কম? তাদের রক্ষায় রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা কি যথেষ্ট? সোহাগ হত্যা শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি একটি পুরো প্রান্তিক শ্রেণির নিরাপত্তাহীনতারও প্রতীক।
সোহাগ হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে, আইনের শাসন কি শুধু কাগজে-কলমে, নাকি রাস্তায়-গলিতেও সমানভাবে বলবৎ? রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত, নাকি দুষ্কৃতীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেই দায়িত্ব শেষ মনে করে? নাগরিকের মৌলিক অধিকার ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সক্ষম ও আন্তরিক?
সোহাগের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যায় না। পাঁচজন গ্রেপ্তার এবং দুই রাজনৈতিক কর্মীর বহিষ্কার প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। এখন প্রয়োজন, দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া, যাতে প্রকৃত হোতারা এবং হত্যার কারণ উদঘাটিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সক্রিয় সহযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার কঠোর অঙ্গীকার।
ভাঙারি ব্যবসায়ীসহ সকল প্রান্তিক পেশাজীবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ। পুরান ঢাকাসহ সারা দেশে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সোহাগের মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় একটি সভ্য সমাজ তখনই গড়ে ওঠে যখন তার প্রতিটি নাগরিক নিরাপদে, মর্যাদার সাথে বাঁচার নিশ্চয়তা পায়। আইনের শাসন কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য নয়, সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এই প্রত্যয়ই হবে সোহাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন। নইলে, প্রতিটি সোহাগ হত্যা আমাদের সভ্যতার মৃত্যুপথযাত্রাকেই ত্বরান্বিত করবে। যারা সহিংসতার পথে পা বাড়িয়েছে, তাদের শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে পরিবার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানবিকতা, সহনশীলতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অহিংস সমাধানের মূল্যবোধ জাগ্রত করতে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। যে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি চলছে, সেখানে স্থানীয় থানা/পুলিশের ভূমিকা কি ছিল? তাদের দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সোহাগের রক্তে রঞ্জিত পাথরগুলো শুধু তার জীবন কেড়ে নেয়নি; তা আমাদের সমাজের বিবেককেও আঘাত করেছে। এই পাথরগুলো যেন আমাদের ঘুম ভাঙানোর অ্যালার্ম। যদি এখনই আমরা জাগ্রত না হই, যদি এখনই কঠোর হস্তে অপরাধ দমন না করি, যদি এখনই তরুণ প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা না করি, তাহলে এই পাথুরে আঘাতে ভেঙে পড়বে সমাজের শেষ অবশিষ্ট নৈতিক কাঠামো।এর সঠিক জবাবদিহিতা এবং পুনরুজ্জীবিত নৈতিকতার সুদৃঢ় প্রসারিত বাস্তবতায় পাথুরে হৃদয় ভেঙে মানবিকতার সূর্যোদয় ঘটাতে হবে।