সাজিদ বিন বশির, স্টাফ রিপোর্টার (ঢাকা)
সপ্তদশ শতকে যখন ওলন্দাজ পর্যটকরা এ দেশে এসেছিলেন, তারা ঢাকাকে তুলনা করেছিলেন ভেনিসের সাথে। কারণ, চারপাশের নদী আর ভেতরের জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালই ছিল এ শহরের প্রাণ। কিন্তু আজ ২০২৬ সালের আধুনিক ঢাকায় দাঁড়িয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই যখন বুক সমান পানিতে আমাদের হাবুডুবু খেতে হয়, তখন প্রশ্ন জাগে— ভুলটা আসলে কোথায় ছিল?
ভুলটা ছিল আমাদের ভাবনায়। আমরা ভুলে গেছি, ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে বাংলাদেশ আসলে “বৃষ্টির দান”।
বাংলাদেশ কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়। টেকটনিক প্লেটের খেলায় আর হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা কোটি কোটি টন পলির চাদরে ঢাকা এক জাদুকরী বদ্বীপ। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় যাকে আমরা বলি ‘বেঙ্গল বেসিন’।
সহজ কথায়, বাংলাদেশ আসলে চরের মাঝে নদী নয়, বরং একটি বিশাল নদীর বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য চরের সমষ্টি। আজ আমরা যাকে শত শত ভিন্ন নদী নামে ডাকি, অতীতে তারা সবাই ছিল এক ও অভিন্ন এক জলধারা। সুন্দরবনে গেলে আজও এই আদিম রূপটি চাক্ষুষ করা যায়। বৃষ্টি আর হিমালয় না থাকলে এই পলি আসতো না, আর পলি না আসলে আজকের বাংলাদেশের জন্মই হতো না।
প্রকৃতির এই সহজ সত্যটাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমরা যখন উন্নয়নের নামে নদী-নালা, খাল-বিল দখল করতে শুরু করলাম, তখন থেকেই মূলত আমাদের আত্মহননের যাত্রা শুরু হলো।
ঐতিহাসিক সত্য: অতীতে একটানা ১৫ দিন অবিরাম বৃষ্টি হলেও ঢাকায় জলাবদ্ধতা হতো না। কারণ পানি নেমে যাওয়ার জন্য চারপাশের খাল ও নদীগুলো ছিল উন্মুক্ত।
আজকের ঢাকা এবং তার আশেপাশের মানচিত্রের দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। একসময়ের প্রাকৃতির জলাধারগুলোকে আমরা কীভাবে কংক্রিটের জঙ্গল বানিয়েছি, তার কিছু নমুনা দেখে নেওয়া যাক:
উত্তরা থার্ড ফেজ ও পূর্বাচল: উত্তরা, আশুলিয়া, আমিনবাজার কিংবা গাজীপুরের কাশিমপুর ছিল মূলত হাওরের মতো নিম্নাঞ্চল। বর্ষায় এগুলো অথৈ পানিতে ভেসে থাকতো। উত্তরা থার্ড ফেজ কিংবা পূর্বাচলের মতো নিচু জমি ভরাট করা প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক প্রকার অপরাধ।
বসুন্ধরা, আফতাবনগর ও আমুলিয়া: বনশ্রীর পরের আমুলিয়া বা আফতাবনগর ছিল ঢাকার পূর্বদিকের পানি নিষ্কাশনের মূল পথ। আজ সেখানে একের পর এক আবাসন প্রকল্প। পানি জমলে তা সরার আর কোনো রাস্তাই অবশিষ্ট নেই।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যেন আজ ‘রাজধানী অধঃপতন কর্তৃপক্ষ’-এ পরিণত হয়েছে। পরিবেশের তোয়াক্কা না করে, স্থানীয়দের ভূমিহীন করে শুধু প্লট বাণিজ্যের খাতিরে ঢাকার ফুসফুস ও জলাশয়গুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে।
সরকার এখন আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া রুটে সড়ক তুলে দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করছে যাতে নিচে পানি প্রবাহিত হতে পারে। কিন্তু একদিকে যখন এই শুভবুদ্ধির উদয় হচ্ছে, অন্যদিকে তখন আমিনবাজারে মধুমতী মডেল টাউন বা নিম্নাঞ্চলে মেগা প্রজেক্টের কাজ ঠিকই চলছে। এই দ্বিচারিতা ঢাকাকে বাঁচাতে পারবে না।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সাভারের বাস্তবতা
অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এত ড্রেন ও বক্স কালভার্ট করার পরও কেন পানি জমে? উত্তরটা খুব সহজ— অঙ্কের হিসাব।
একটি বিশাল নিম্নাঞ্চল বা হাওর কোটি কোটি গ্যালন পানি ধারণ করতে পারে। কিন্তু কংক্রিটের তৈরি কয়েক ফিটের ড্রেন কখনোই সেই বিপুল জলরাশি বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে না। ড্রেন কখনো নদীর বিকল্প হতে পারে না।
সাভারের কথাই ধরা যাক। যে সাভারে মানুষ একসময় বর্ষাকালে নৌকা বা ভেলা নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, সেখানে আজ কলকারখানা আর অপরিকল্পিত আবাসন। অথচ মাত্র ৪০০ মিটার দূরেই বংশী নদী আর ১০০ মিটার দূরেই কর্ণতলী নদী। নদী এত কাছে থাকার পরও সাভারের রাস্তাগুলোতে এখন সারা বছর নোংরা পানি জমে থাকে, যেখানে মশা-মাছি সাঁতার কাটে।
বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রাকৃতিকভাবেই সেরা ছিল, কারণ এ দেশের প্রতিটি গ্রামই কোনো না কোনো নদীর সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু আমরা সেই নৌপথকে আধুনিকায়ন না করে তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ দেখানোর জন্য শুরু করলাম যত্রতত্র ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ।
নদীকে শাসন না করে, নদীকে মেরেই তৈরি হলো এই ব্রিজগুলো। এর পেছনে যেমন ছিল আমলা ও নেতাদের পকেট ভরার রাজনীতি, তেমনি ছিল জনগণের সস্তা ভোটের হিসাব। ফলাফল? নদীগুলো একে একে মরে গেল। আর খালের ওপর গড়ে উঠল বহুতল ভবন, যা আদতে এক একটি আধুনিক বস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
পৃথিবীর অন্যতম উর্বর আর চিরসবুজ এই বদ্বীপকে আমরা মাত্র ৩০-৪০ বছরের লোভের আগুনে পুড়িয়ে এক কংক্রিটের ভাগাড়ে রূপান্তর করেছি। আজ হাহাকার শুধু ঢাকা আর চট্টগ্রাম নিয়ে। কিন্তু যেভাবে প্রতিটি উপজেলা স্তরেও খাল ও নদী ভরাট চলছে, খুব দ্রুতই এই হাহাকার সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।
আগে বন্যার পানি আসতো এবং দ্রুত নেমে যেতো। কিন্তু সামনের দিনগুলোতে অতিবৃষ্টির ফলে যে জলাবদ্ধতা হবে, তা নামতে ৭ থেকে ৮ মাস সময় লেগে যাবে। প্রকৃতিকে তার পথ না দিলে, প্রকৃতি ঠিকই তার পথ করে নেবে— আর সেই পথটি হবে আমাদের বিনাশের পথ। প্রকৃতির দান এই দেশকে যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে ইতিহাসের পাতায় আমরা কেবলই এক ‘আত্মঘাতী জাতি’ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকব।
Post Views: 110
Related