রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি: জারোতে জমিত কাম করতে কষ্ট হওছে। সার, বীজ, সেচ সোগেরে দাম বাড়ছে। এ্যালা কামলাও পাওয়া যায় না। কিছু দিন ধরি যেভাবে শীত পড়োছে তাতেও হামার আলু নিয়্যা চিন্তিত। ধারদেনা করি আলু চাষ করছি, আলু তুলি টাকা দিমো। কিন্তু শীতের কারণে যদি আলুর পচারি রোগ হয় তাইলে হামরা শ্যাষ। মাঘের হাড় কাঁপানো শীতের সকালে আলু ক্ষেতে পরিচর্যা করতে করতে কথাগুলো বলেন কৃষক আব্দুল আজিজ। তিনি রংপুর মহানগরীর মাহিগঞ্জ সরেয়ারতল এলাকার বাসিন্দা। প্রতিবছর আলুসহ শীতকালীন রবি শস্যের চাষাবাদ করেন এ কৃষক। তবে এবার প্রচন্ড শীতে আলু নিয়ে শঙ্কার মধ্যে দিন কাটছে তার। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে উত্তরাঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ চলছে। ঘন কুয়াশার সঙ্গে হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কাজকর্ম। ঠান্ডায় নাকাল হয়ে পড়ছে চরাঞ্চলসহ ছিন্নমূলের অসহায় মানুষ। শীতের তীব্রতা প্রথম ধাপে জানুয়ারি মধ্যবর্তী পর্যন্ত অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীত জেঁকে বসেছে তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী ও করতোয়া নদী বেষ্টিত রংপুরে। ভোরের আকাশে হাড় কাঁপানো কুয়াশার আবরণে ঢাকা, আর দুপুর নাগাদ মিলছে সূর্যের দেখা। তবে শীতের তীব্রতার কাছে মিলছে না সূর্যের তেমন উষ্ণতা। এতে জনজীবনে দেখা দিয়েছে ছন্দপতন। শীতে চরম বিপাকে পড়েছে কৃষি নির্ভর পরিবারগুলো। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে চরাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। শীতের হানায় কৃষকের ধানের বীজতলা থেকে শুরু করে প্রভাব পড়েছে আলুসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষেতে। বিশেষ করে আলু চাষিরা শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শীত আর ঠান্ডা বাতাস এবং সূর্যের তাপ না থাকায় চলতি মৌসুমে আলুর ঢগায় পচারি রোগের দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা চাষিদের। রংপুর মহানগরীর আমতলা মাহিগঞ্জ, সরেয়ারতল, পীরগাছার তাম্বুলপুর, কৈকুড়ি, পারুল, গঙ্গাচড়ার গজঘণ্টা, মহিপুর, লক্ষীটারী, মধ্য বিনবিনা, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম,গাইবান্ধার, দিনাজপুর,পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার এলাকার চাষিরা আলুর ক্ষেত আর বোরো ধানের বীজতলা পরিচর্যায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছে। রংপুর সদর উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ব্রাক্ষ্মণীকুন্ডা বগুড়াপাড়া এলাকার আলু চাষি আব্দুর হামিদ বলেন, বেশি শীত এবং ঠান্ডা বাতাসে আলুর ক্ষতি হয়। এখন যেভাবে শীত ও হিম বাতাস রয়েছে, তাতে আলুর পচারি রোগের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এ আবহাওয়া বেশিদিন থাকে তাহলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবার আলুর বীজ, সারসহ আনুসাঙ্গিক খরচ বেড়েছে। তার উপরও যদি এই আবহাওয়ায় আলুর পচারি রোগ দেখা দেয় আর্থিকভাবে আমার আরও ক্ষতি হবে। পীরগাছা উপজেলার হাউদারপাড় গ্রামের কবির হোসেন বলেন, তিনি প্রতি বছরই আলু চাষ করেন। এবার আলুর মৌসুমের শুরুতে বীজ আলু ও সার সংকটের কারণে কিছুটা সমস্যা হয়। তবে আলুর ফলন ভালো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আলু নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে না। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ক্ষতির আশঙ্কাও করছে তিনি। শুধু তিনি নন, তাদের মতো আরও অনেকেই এমন আশঙ্কার কথা জানান। মাহিগঞ্জ সরেয়ারতলা এলাকার হযরত আলী বলেন, দেশে যে কয়েকটি জেলায় সর্বাধিক আলু উৎপাদন হয় তার মধ্যে অন্যতম রংপুর। কয়েক বছর আগেও এখানে স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য আলু চাষ করতেন কৃষকরা। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত আলু নিয়ে বিপাকে পড়তেন তারা। সে জন্য লোকসানের মুখে লাভের আশায় দীর্ঘদিন থেকে বিদেশে রপ্তানির দাবি জানিয়ে আসছিলেন কৃষকরা। তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দিয়েছে। পীরগাছা এবারও গত বছরের তুলনায় বেশি আলু রপ্তানি করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গত বছর এ উপজেলা সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন আলু বিদেশে পাঠানো হয়েছে। উপজেলার বেশির কৃষকই রপ্তানিযোগ্য আলু উৎপাদন করছে। সান্তা, ডায়মন্ড, গ্রানুলা, কুমারিকা, কুম্ভিকাসহ বিভিন্ন জাতের আলু বীজ কৃষকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে কৃষি বিভাগ। রংপুর বিভাগ থেকে বিদেশে আলু রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে পীরগাছা উপজেলা। গত বছর প্রথমবারের মতো রংপুর থেকে রাশিয়াতে আলু রপ্তানি করা হয়েছে। এছাড়া কয়েক বছর ধরে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আবর, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রংপুরের আলু পাঠানো হচ্ছে। এ বছর কৃষি বিভাগের পরামর্শে রপ্তানি উপযোগী আলু চাষে আগ্রহ আরও বেড়েছে বলে জানান কৃষকগণ। রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা গতবারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার হেক্টর বেশি। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লক্ষ ৯২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু রোপণ করা হয়েছে। বিদেশে আলু রপ্তানির জন্য উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। এরই মধ্যে ৪০০ কৃষককে রপ্তানি উপযোগী আলু চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরও ৮০০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেবে কৃষি বিভাগ। এছাড়া চলতি মৌসুমে শাক সবজি ১১ হাজার ৩৩৫ হেক্টর, সরিষা ১১ হাজার ৫৮০ হেক্টর, বোরো ধানের বীজতলা আছে ৫ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমি। কৃষি বিভাগ বলেন, আবহাওয়া আলুর জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। এটি কাটিয়ে উঠতে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চাষিদের উদ্বিগ্ন না হয়ে নিয়মিত ক্ষেত পরিচর্যা করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে আলুর চাষাবাদ এখন মধ্যবর্তী সময়ে। শীতে আলুর তেমন কোন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। শীতের সঙ্গে দিনের সূর্যের আলো যদি না থাকে এবং ঠান্ডা বাতাস বিরাজমান থাকে তবে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে। এবার রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলু চাষ করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমান যে আবহাওয়া বিরাজ করছে তাতে আলুর ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা কম রয়েছে। এবছরও বিদেশে আলু রপ্তানির লক্ষ্যে কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।







